সামনেই বাঁ-ধারে কপালী দিঘি। চারধারে গাছগাছালি। দিঘির কোল ঘেঁসে রাস্তাটা পেরোনোর সময় হঠাৎ নটবরের মনে হল সামনের ঘাটে কে যেন চান করছে। এই শীতের রাতে ঠাণ্ডা জলে চান করে কে?
ঘাটের কাছে পৌঁছে দেখল চান করে একটা মোটাসোটা লোক উঠে এল। গামছা নিংড়োতে নিংড়োতে বলল, হাটে গিয়েছিলেন বুঝি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। তা আপনি এই শীতে রাতে চান করছিলেন যে?
চান না-করলে শরীরটা বড়ো ম্যাজম্যাজ করে। সারাদিনে আমি বার পঁচিশেক চান করি কি না!
বলেন কী? ঠাণ্ডা লেগে নিউমোনিয়া হবে যে?
লোকটা একটু হেসে বলে, আরে না, নিউমোনিয়া কি আর সকলের হয়! তা হাটে কী কী। পেলেন?
এই একটু শীতের শাকপাতা।
শুধু শাকপাতা?
আর এই টুকিটাকি।
শুধু টুকিটাকি।
এই সামান্য জিনিসপত্তর।
লোকটি গা মুছতে মুছতে বলল, তা বলে ভাববেন না যে নেই।
কী ভাবব না?
এখনও আছে, অনেক আছে। যাই আর একবার ডুব দিয়ে আসি।
লোকটা ফের জলে নেমে গেল। হ্যাঁ! আচ্ছা পাগল তো!
গাঁয়ের কাছ বরাবর চলে এসেছে নটবর। জটেশ্বরের খালের সাঁকোটা পেরোলেই গাঁয়ের সীমানায় ঢুকে পড়বে।
সাঁকোতে পা দিতেই নটবর দেখতে পেল সাঁকোর মাঝ বরাবর বাঁশের রেলিং-এর হাতে ভর রেখে একটা লোক ঝুঁকে জলের দিকে চেয়ে আছে। নটবর সাঁকোতে উঠতেই মচাৎ করে শব্দ হওয়ায় লোকটা ফিরে তাকাল। চেনা মানুষ নয়।
নটবরবাবু নাকি?
হ্যাঁ।
হাট করে ফিরলেন?
হ্যাঁ। কিন্তু আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কী করছেন?
মাছ ধরছি।
মাছ ধরছেন!
মাছ ধরছেন! বলে নটবর হাঁ হয়ে গেল! সাঁকোর ওপর থেকে এই রাত্তিরে মাছ ধরা যায় বলে সে জন্মে শোনেনি। হেসে বলল, কীভাবে ধরছেন? মন্তর দিয়ে নাকি?
না ছিপ দিয়ে। দেখবেন? লোকটার হাতে যে ছিপ রয়েছে সেটা এতক্ষণ লক্ষ করেনি নটবর। এবার করল। লোকটা ডান হাতের ছিপটা হঠাৎ করে ছপাৎ করে ওপরে তুলতেই দেখা গেল বঁড়শিতে বেশ বড়োসড়ো একটা মাছ লাফঝাঁপ করছে। তাজ্জব ব্যাপার।
দেখলেন তো নটবরবাবু?
দেখলাম। খুবই বিস্ময়ের ব্যাপার।
না, না, এ আর বিস্ময়ের কী? তা হাটে যা খুঁজতে গিয়েছিলেন তা পেলেন?
তা পেলাম, শীতের শাকসবজি আর কি!
উঁহু, ওসব নয়। আর যা খুঁজতে গিয়েছিলেন।
এই টুকিটাকি সব জিনিসপত্র। ঘরগেরস্থালিতে তো কত কিছুই লাগে।
সে আমি জানি। কিন্তু সে-সব ছাড়া আর কিছু?
না, আর বিশেষ কী?
কী যে বলেন নটবরবাবু। যাকগে, কথাটা হল–ওসব নিয়ে বেশি মাথা না-ঘামানোই ভালো।
কী সব নিয়ে! কীসের কথা বলছেন?
বলছিলাম কী, দু-তরফা নিজের নিজের মতো করে আছে। কাজ কী বলুন অন্য তরফের তল্লাশ নিতে যাওয়ার। ওতে অন্য তরফের বড্ড অসুবিধে হয় কিনা।
দুই তরফা! নটবর হঠাৎ একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে। কোন তরফের কথা বলতে চাইছে লোকটা?
আচ্ছা আসি নটবরবাবু। বলে লোকটা হনহন করে তার পাশ কাটিয়ে উলটো দিকে চলে গেল। তাকে ভেদ করেই গেল যেন! কিন্তু নটবরের গায়ে একটু ছোঁয়াও লাগল না। হঠাৎ নটবরের গা শিউরে উঠল।
বাপরে! বলে বাজারের থলি ফেলে নটবর প্রাণপণে ছুটতে লাগল। পড়ি কি মরি অবস্থা।
পরদিন সে ভজহরিকে গিয়ে বইখানা দান করে বলল, আছেরে ভাই আছে।
ভজহরি একগাল হেসে বলল, বলেছিলাম কি না।
টেলিফোনে
টেলিফোন তুললেই একটা গম্ভীর গলা শোনা যাচ্ছে, সিক্স ফোর নাইন ওয়ান…সিক্স ফোর নাইন ওয়ান… সিক্স ফোর নাইন ওয়ান…।
সকাল থেকে ডায়াল-টোন নেই। টেলিফোনের হরেক গন্ডগোল থাকে বটে, কিন্তু এ-অভিজ্ঞতা নতুন। গলাটা খুবই যান্ত্রিক এবং গম্ভীর। খুব উদাসীনও।
প্রদীপের কয়েকটা জরুরি টেলিফোন করার ছিল। করতে পারল না।
কিন্তু কথা হল, একটা অদ্ভুত কণ্ঠস্বর কেবল বারবার চারটে সংখ্যা উচ্চারণ করে যাচ্ছে কেন? এর কারণ কী? ঘড়ির সময় জানার জন্য বিশেষ নম্বর ডায়াল করলে একটা যান্ত্রিক কণ্ঠে সময়ের ঘোষণা শোনা যায় বটে, কিন্তু এ তো তা নয়। মিনিটে-মিনিটে সময়ের ঘোষণা বদলে যায়, কিন্তু এই ঘোষণা বদলাচ্ছে না।
অফিসে এসে সে তার স্টেনোগ্রাফারকে ডেকে টেলিফোনের ত্রুটিটা এক্সচেঞ্জে জানাতে বলেছিল। তারপর কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বড়ো অফিসার। বহুবছর দিল্লিতে ছিল, সম্প্রতি কলকাতায় বদলি হয়ে এসেছে। কোম্পানিই তাকে বাড়ি, গাড়ি ও টেলিফোন দিয়েছে। তার আগে এই পদে ছিলেন কুরুষ্টু নামে দক্ষিণ ভারতের একজন লোক। তিনি রিটায়ার করে দেশে ফিরে গিয়ে ফুলের চাষ করছেন বলে শুনেছে প্রদীপ। খুবই দক্ষ ও অভিজ্ঞ মানুষ ছিলেন তিনি। রিটায়ার করার বয়স হলেও কোম্পানি তাঁকে ছাড়তে চায়নি। বরং আরও বড়ো পোস্ট দিয়ে ধরে রাখতে চেয়েছিল। কুরুঙ্গু কিছুতেই রাজি হননি।
দুপুরের লাঞ্চের আগে সে একটি পার্টিকে একটা বকেয়া বিলের জন্য তাগাদা করতে টেলিফোন তুলে ডায়ালের প্রথম নম্বরটার বোতাম টিপতেই আচমকা সেই উদাসীন, গম্ভীর, যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, সিক্স ফোর নাইন ওয়ান… তারপরই অবশ্য কণ্ঠস্বর থেমে গেল।
প্রদীপ খুবই অবাক হয়েছিল। সামলে নিয়ে বাকি নম্বর ডায়াল করতে রিং বাজল এবং ওপাশে একজন ফোনও ধরল। প্রয়োজনীয় কথা সেরে নিয়ে প্রদীপ খুব চিন্তিতভাবে অফিসের ইলেকট্রনিক টেলিফোনটার দিকে চেয়ে রইল। এই ফোনেও কণ্ঠস্বরটা এল কী করে? এসব হচ্ছেটা কী?
