ছেলেটি তার মুখ বাড়িয়ে দিল। আমার, হাত সুড় সুড় করলেও আত্মসম্বরণ করে বললাম : আচ্ছা, পরে পরীক্ষা করে দেখবখন। এখন তোমার গল্প তো শেষ কর।
আরম্ভ করল ছেলেটি?
গেছি তো কাকার বাড়ি। নিরাপদে পৌঁছেচি। কাকা তখন বেদানা খাচ্ছিলেন; কোন জ্বরজারি হয়নি, এমনই সুস্থ শরীরে বেদনা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করছেন, দেখেই বুঝতে পারলাম।
আমি যেতেই বলেন, এইযে, এইযে। মন্টু যে। খবর কি? আছিস কেমন?
খবর ভাল। সামার ভেকেশন আমার কিনা। ভাবলুব, আসানসোল এসে সোলে একটু
কাকাবাবু বাধা দিয়ে বলেন : বেশ বেশ। এসেছিস, বেশ করেছিস। যখন পারবি তখনই আসবি। কাকা-কাকীর বাড়ি সবাই আসে। আসে না কে?
ডাকাডাকি না করেই তো আসে। ঐ সঙ্গে এইটুকুও যদি যোগ করতেন কাকাবাবু, ভারী খুশি হতাম। কিন্তু কাকাবাবু ওর বেশি আর এগুলেন না অধিক ভলা বাহুল্য মাত্র ভেবে চেপে গেলেন। একেবারে। বোধহয় শিব্রাম চকরবরতির বই ওঁর তেমন পড়াটড়া ছিল না।
পায়ের ধূলো নিতে না নিতেই তিনি গলে পড়লেন : এই নে। বেদানা খা।
বেদানার অনুরোধে বেশ দমে গেলাম। ও-জিনিষ অসুখবিসুখে খেতেই যা বিচ্ছিরি, তার ওপর সুস্থ শরীরে খেতেহলেই তো গেছি। বেদানাটা হাতে নিয়ে বললাম : কাকাবাবু। বেদানা দিলেন বটে, কিন্তু বলতে কি, একটু বেদনাও দিলেন।
কাকা আমার কথাটায় কানই দিলেন না।
নে নে, খেয়ে ফ্যাল। খেলে গায়ে জোর হয়। ভাল শরীরে খেলেই আরো জোর বাড়ে। নে, ছাড়িয়ে খা। কাকা বেদানা দিলে খেতে হয়।
মনে মনে আমি বলি, কাকস্য পরিবেদনা। এবং প্রাণপনে বেদনা দূর করি, এক একটাকে পাকড়ে, গলা ধরে দূর করে দিই একেবারে গালের ভেতরে। তারপর আমার গলার তলায়।
তুমি গলাধঃকরণ করে। বুঝতে পেরেছি। আমি বলি।
ঠিক বলেচেন! চমৎকার বলেছেন, কিন্তু ছেলেটি উসকে উঠেই তক্ষুনি আবার নিবু নিবু হয়ে আসে, কেমন যেন মুষড়ে পড়ে। তারপরে শুনুন।
এমন সময়ে কাকীমা এসে পড়লেন। এসেই কাকার কবল থেকে আমাকে উদ্ধার করলেন।
কী, সকাল বেলায় ছেলেটাকে ধরে ধরে বেদানা খাওয়াচ্ছ? ওসব ওদের কখনো ভাল লাগে? রোচে কখনো? মন্টু, আয় চপ খাওয়াব তোকে, ভাল এঁচোড়ের চপ, আমার নিজের তৈরি রান্নাঘরে আয়।
পিতৃব্যস্নেহ থেকে পরিত্রাণ পেয়ে হাঁফ রান্নাঘরে গিয়ে উঠলাম। কাকীমা ছোট্ট একটু পিড়ি দিলেন বসতে : বোস।
না, এই ভূঁয়েই বসি। আমি বললাম : পিড়ি দিয়ে কেন আর পীড়িত করছেন কাকীমা?
অ্যাঁ, কি বললি? কাকীমা কান খাড়া করলেন।
পিঁড়ি তো নয়, পীড়ানের যন্ত্র। আমার পুনরুক্তি হলোর যন্ত্রণাও বলতে পারেন। আরো ভাল করে বললাম আবার : না, কাকীমা, আমি প্রপীড়িত হতে চাইনে।
কাকীমা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেন না।
এসব আবার কেমন কথা? কাকীমা হাঁ করে রইলেন : যন্ত্র আবার যন্ত্রণা কীসব যা তা বকচিস আবোল তাবোল? কাকীমার দুই চোখ বিস্ময়ে চোখা হয়ে উঠল।
চপ দিন, তাহলে চুপ করব। বললাম আমি। কাকীমা একটু ইতস্ততঃ করে চপের প্লেটটা এগিয়ে দিলেন।
কামড়াতে গিয়ে দেখি দাঁত বসে না। চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়র বাইরে এ আবার কি জিনিস রে বাবা?
কাকীমা, এ কি বানিয়েছেন? এ কি চপ? এর চাপ তো আমি সইতে পারছি না। আমি জানাইঃ এচোড়গুলো আগে কিমা করে নেন নি কেন কাকীমা? এ যে চোরেরাও অখাদ্য হয়েছে। এই চাপের আঘাত না করে আমাকে চপেটাঘাত করলেও পারতেন। আমি হাসিমুখে খেতাম।
ফাকীমার চোখ কপালে উঠে যায়, বহুক্ষণ তার মুখে কথা সরে না। তারপর তাঁর সমস্ত মুখ কেমন একটা আশঙ্কার আবছায়ায় ভরে ওঠে। তিনি ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করেন : ঢোকবার আগে তুই এ-বাড়ির ছাঁচতলাটায় দাঁড়িয়ে ছিলি না? তুই-ই তো? আমি ওপর থেকে দেখলুম যেন?
হ্যাঁ, ভাবছিলুম, আপনাদের নতুন দারোয়ান বাড়িতে ঢুকতে দেবে কিনা! আমাকে দ্যাখেনি তো আগে। আমি কৈফিয়ত দিই : নাম লিখে পাঠাতে হবে ভেবে কাগজ পেনসিল খুঁজছিলাম, কিন্তু দরকার হলো না। সে একটু কাত হতেই আমি তার পেছন দিক দিয়ে সাঁত করে গলে পড়েছি।
ছাঁচতলাতে তুইই দাঁড়িয়েছিলি! কাকীমার সমস্ত মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আসে; তাই তো বলি! কেন আমার এমন সর্বনাশ হলো।
কাকীমা পা টিপে টিপে পেছোতে থাকেন : চুপ করে বসে থাকো। নড়ড়া না যেন। আমি আসচি এক্ষুনি।
কাকীমার এই অদ্ভুত বিহেভিয়ার আমি যতই ভাবছি ততই মনে মনে হেভিয়ার হচ্ছি। ওরকম ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার মানে? আমিও কি একটা এঁচোড়ের চপ না কি?
একটু পরে কে যেন দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারে। আবার কে একজন, একটু গলা বাড়িয়েই সরে যায়। আমার কাকতুত ভাইবোন সব, বুঝতে পারি। কাকার আর সব পরিবেদনা, কাকীমার অন্যান্য অনাসৃষ্টি। ইকোয়ালি অখাদ্য। এক একটি পাকা এঁচোড়ের চপ! কেন বাপু, অমন উঁকিঝুঁকি মরামারি কেন? আমি যদি এমনই দ্রষ্টব্য, সামনাসামনি এসে কি আমাকে দেখা যায় না?
ওদের সবার হাবভাব আমার ভারী খারাপ লাগে। কেমন কেমন ঠেকে যেন। আশপাশ থেকে চাপা গলা কানে আসে, চারধার থেকে ফিস ফিস গুজ গুজ শুনি, আর আমার দু-হাত নিসপিস করতে থাকে। ইচ্ছে করে, হাতের নাগাল না পাই, কসে এক ঘা–এই চপ ছুঁড়েই লাগাই না কেন এক একটাকে?
ভাবতে ভাবতে যেমন না দরজা তাক করে একটা চপ নিক্ষেপ করেছি ওই নেপথ্যের দিকেই–অমনি হুটপাট বেধে গেছে। হুড়মুড়, দুড়দুড়, হৈ-হৈ, দুদ্দাড়–রৈ রৈ কাণ্ড!
