ওই রকম মিলিয়ে-মিলিয়ে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে ল্যাজামুড়ো এক করে কথা বলা খারাপ। ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক। বুঝলেন মশাই?
তুমি কি–ঐ কি নাম বললে–সেই ভদ্রলোককে কখনো দেখে?
না দেখিনি, দেখবার আমার বাসনাও নেই। ঐ ভদ্রলোক আমাকে যা বিপদে ফেলেছিলেন একবার।
অ্যাঁ, বলো কি? তোমাকে তিনি বিপদে ফেলেছিলেন? আমি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ওকে পর্যবেক্ষণ করি কই, আমার তো তা মনে পড়ছে না।
উনি কি আর ফেলেছিলেন? ওঁর মতো কথা বলতে গিয়ে আমি নিজেই ভীষণ বিপদে পড়েছিলাম। ছেলেটি বললঃ হাড় কখানা আস্ত নিয়ে যে নিজের আস্তানায় ফিরতে পেরেছি এই ঢের।
ও বুঝেচি। সেই তারা, সেই সব বিচ্ছিরি লোক, শিব্রাম চকরবরতির লেখা যারা একদম পছন্দ করে না, তারাই বুঝি? তারা তোমার কথা শুনে, তোমাকেই শিব্রাম চকরবরতি ভেবে, সবাই মিলে, ধরে বেঁধে এক চোট বেধড়ক
উঁহুহু। ছেলেটি বাধা দেয়। তারা কেন মারবে? তারা কারা? তারা কোথাথেকে এল? না, তারা নয়। সেই জন্যেই তো বারন করচি, শিব্রাম চকরবরতির মতো কথা কক্ষনো বলবেন না। ওই ধরনের কথা বলার বদভ্যাস ছাড়ুন, জন্মেম মতো ছেড়ে দিন তা নাহলে আপনাকেও হয়তো কোনদিন আমার মতো বিপদে পড়তে হবে।
বন্ধুর উদ্দেশ্যে বললাম–তাহলে চা থাক। খোকার গল্পটাই শোনা যাক। বলো তো ভাই, কান্ডটা। ওই বিষয়ে বলতে কি, সব চেয়ে বেশি আমারই আগে সাবধান হওয়া দরকার।
এবং আমার বন্ধু যিনি এতক্ষণ চায়ের বিপক্ষে ছিলেন চাউর করলেন?
না, চা আসুক। এবং তুমিও এসো এই টেবিলে। ওহে, তিন কাপ চা, আর আর তিন ডজন, বিস্কুট। চা খাই আর না খাই, তোমাদের তো কি বলে গিয়ে চা পান করাতে দোষ নেই?
খুব সামলে নিয়েছেন। ছেলেটি আমাদের টেবিলে এসে বসল : বলতে পারতেন যে ঐটেই দস্তুর। সঙ্গে বলতে পারতেন আরো। কিন্তু খুব বাঁচিয়ে নিয়েছেন। শিব্রাম চকরবরতি এখানে থাকলে, ঐ দোষের জন্যে, দস্যুকেও নিয়াসতেন বিনা দোষেই। ঐটেই ওঁর মস্ত দোষ। টেনে হিঁচড়ে কেমন করে যে তিনি এনে ফেলেন।
কি করে যে এত পারেন ভদ্রলোক, আমি আশ্চর্য হই। আশ্চর্য হয়ে আমি বলি।
যেমন করে মুর্গিতে পাড়ে, তেমনি আর কি। বন্ধুবরের অনুযোগ? এমন কি শক্ত?
শক্ত? কিছু না। ছেলেটি বলে আমরা সবাই পারি। আমাদের ক্লাসের পেত্যেক ছেলে। আমাদের বাড়িতে দাদারা, দিদিরা, এমন কি বৌদি পর্যন্ত। ওতো এনতার পারা যায়, ঐ উনি যা বললেন একেবারে মুর্গির মতোন। আস্ত ঘোড়ার ডিম। পেড়ে দিলেই হলো–পারতে কি। তবে লেখকের মধ্যে ঐ একজনই শুধু পারেন কিন্তু পাঠকের হাজার হাজার। পাঠকের মধ্যে এক আমিই যা ঠেকে শিখেচি, আমি আর পারব না। ছেলেটি নিজের অক্ষমতা জ্ঞাপন করে।
এরপর, আসল গল্পটা যতদূর সম্ভব ছেলেটির নিজের ভাষায় বলার চেষ্টা করা যাক ।
গরমের ছুটিটা কোথায় কাটানো যায়! ভাবলুম, অনেক দিন তো যাইনি, কাকার ওখানেই যাই ছেলেটি শুরু করল বলতেঃ আসানসোলে গিয়ে সোলে শান দিয়ে আসি। কলকাতার বাইরে ফাঁকাও হবে, আর আরাম করে থাকাও হবে। একেবারে আমের আশা যে ছিল না তাও না, তবে না মশাই, আমার আমাশা ছিল না। তবে, কাকার বাগানে ঢুকে আম জাম যে বাগানো যাবো সে আশা খুবই ছিল।
ছেলেটি অম্লানবদনে অকাতরে বলে যাচ্ছিল, আর আমার চোখ ক্রমশই বড়ো থেকে আরো হতে হতে, ছানাবড়া কি, লেডিকেনি পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেল। অবশেষে আমি আর থাকতে পারলাম না।
থামো, থামো। তুমি বলছ কি? তুমি কি বলছ, তুমি শিব্রাম চকরবরতি নও? তুমি নিজেই নও? ঠিক বলছ? ঠিক জানো? আমার গুরুতর সন্দেহ হচ্ছে, তুমিই শিব্রাম চকরবরতি?
আমি? না, আমি না ছেলেটি ম্লান একটুখানি হাসল।
বলো, নির্ভয়ে বলো, কোন ভয় নেই। লোকটার ওপর রাগ আছে, কিন্তু আমরা তোমাকে ধরে ঠ্যাঙাব না। আমার বন্ধুটি অভয় দিয়ে বলেন:–না, এমন সামনে পেয়ে বাগে পেলেও না।
কী যে বলেন। শিব্রাম চকরবরতি লোকটি কি এতই ছোট হবে? এই বলে ছেলেটি আত্মরক্ষার খাতিরেই কিনা বলা যায় না, অদূরবর্তী আয়নায় প্রতিফলিত নিজের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল : চেয়ে দেখুন তো। আর শিব্রাম চকরবরতির নাকি গোঁফ-দাড়ি একদম থাকবে না?
সে একটা কথা বটে। আমি ঘাড় নাড়ি ও শিব্রাম চকরবরতি লোকটা এত ছোট না হওয়াই উচিত। এতদিনে তো সাবালক হবার কথা। তবে কিনা, ছোট লোকের পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। তা ছাড়া–আমি সন্দিগ্ধ হয়ে উঠিঃ তুমি ঠিক ছদ্মবেশে আসো নি তো? মানে কিনা–ভদ্র ভাষার বলতে হলে আপনি ছদ্মবেশে আসেন নি তো শিব্রাম বাবু?
ছেলেটি মুখ ভার করে ভাবতে লাগল, বোধহয় তারা ধরা পড়ে যাওয়া ছদ্মবেশের কথাই সে ভাবতে লাগল। আমিও ভাবতে থাকি, ঐ শিব্রাম হতভাগাটাকে অনুকরণীয় বলেই আমার ধারণা ছিল। একটু অহঙ্কারও না ছিল তা নয়। অনুকরণীয় মানে, অনুকরণের অযোগ্য। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ওর সম্বন্ধে আমার, অনেকের মতো আমারও একটা ভুল ধারণাই এতদিন থেকে গেছে। অত্যন্ত সহজেই যে-কেউ ওকে-মানে, ঐ শিব্রামটাকে টেক্কার পর টেক্কা মেরে বেটর যেতে পারে। তবে আর কষ্ট করে ওর লেখাপড়া কেন? ছছাঃ। অন্ততঃ আমি তো আর পড়ছিনে; ওর আজে-বাজে যতো বই, আজ থেকে সব তালা দিলাম, তালাবন্ধ থাকল বাক্সে।
আপনি বলছেন আমিই সেই? ছেলেটি আরো একটু ম্লান হাসল। ছদ্মবেশে এসেছি বলে আপনাদের মনে হচ্ছে? বেশ, তাহলে আমার নাক কান টেনে টেনে দেখুন। দেখতে পারেন টানাটানি করে। মুখোস হলে তো খুলে আসবে?
