বাবা রে! মা রে! ধরলে রে! গেছি রে! কি ভূত রে বাবা! খেয়ে ফেললে রে! ভারী হৈ চৈ পড়ে গেল হঠাৎ।
আমি বিরক্ত হই। ভারী অসভ্য তো এরা! খেয়ে ফেললাম কখন? ও-চপ তো খেয়েই আমি ফেলেচি, এঁটো, তো নয়, তবে কেন?
অবশেষে কাকীমা এলেন। সঙ্গে সঙ্গে এল সনাতন। সনাতন এ-বাড়ির পুরাতন চাকর। সনাতন–কাল থেকে ওকে দেখছি।
দুজনেই সসঙ্কোচে ঢুকল।
সনাতন একেবারে আমার অদূরে এসে দাঁড়াল। কীরকম চোখ পাকিয়ে কটমট করে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে, যেন চিনতেই পারছে না আমায়।
পুরানো চাল যেমন ভাতে বাড়ে, পুরানো চাকর তেমনি চালে বাড়বে, এ আর আর বিচিত্র কি? তবু আমি একটু অবাক হলাম।
কাকীমা একি! আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম।
কাকীমা কি রকম একটা সন্ত্রস্ত ভাবে দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলেন, বেশি আর এগোননি। তিনি কোন জবাব দিলেন না। তার পেছনে, চোখ বড়ো বড়ো করে বাড়ির যত ছেলেমেয়েরা, ঝি চাকর যত!
সনাতন বিড়বিড় করে কী সব বকে, আর সরষে ছুঁড়ে ছুঁড়ে আমায় লাগায়। আমার সারা গায়ে।
আমার ভারি বিচ্ছিরি লাগে। এবং লাগেও মন্দ না বলি : সনাতন, এসব কি হচ্ছে? তোমাদের সব মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? কী বিড়বিড় করচ? তোমার ঐ কটাক্ষ আমার একেবারেই ভাল লাগছে না।
সনাতন তবুও বিড় বিড় করে।
কথং বিড়বিড়য়সি সনাতনং? আমি সংস্কৃত করে বলি : সনাতন, তোমার এ বিড়ম্বনা কেন?
আপনি কে? সনাতন এতক্ষণ পরে একটা কথা বলে।
আমি–আমি তোমাদের মন্টু। আমাকে চিনতে পারছ না, সনাতন? আমি অবাক হয়ে যাই।
মন্টু না হাতি! সনাতন বলে? বলুন আপনি কে? আপনি কি আমাদের বেলগাছের বাবা? দয়া করে এসেছেন পায়ের ধূলো দিতে, আজ্ঞে?
ওসব রসিকতা রাখো। কারো বাবা-টাবা আমি নই, তা বেলগাছেরই কি আর তালগাছেরই কি! ওসব গেছো ছেলেদের আমি ধার ধারিনে।
তবে কে তুমি? তুমি কি তাহলে আমাদের গোরস্থানের মামদো? সনাতন একটু সভয়েই এবার বলে।
বলছি না, আমি মন্টু? ন্যাকামি হচ্ছে কিনা? কদ্দিন কতো চকোলেট খাইয়ে তোমায় মানুষ করলাম! আমার রাগ হয়ে যায়।
মন্টু না ঘন্টা। আমাকে আর শেখাতে হবে না। আমার কাছে চালাকি? ভুত চরিয়ে চরিয়ে আমার জীবন গেল। হাড় ভেঙ্গে সুরকি বানিয়ে দেব। বল, কোন ভূত আমাদের মন্টুর ঘাড়ে চেপেছিস? বল আগে?
বোধ হয় কোন রামভূত! আমি আর না বলে পারি না। আধাগল্পের মাঝখানেই বাধা দিয়ে। বলি। স্বনামধন্য আমার নিজের প্রতিই কেমন যেন একটু কটাক্ষ হয়, কিন্তু না পারা যায় না।
সনাতনও ঠিক ঐ কথাই বলল। বলল, গিন্নীমা, এ হচ্ছে কোন রামভূত! সহজে এ ছাড়বে না। রাম নামেও না। সরষে-পোড়া নয়, এর অন্য ওষুধ আছে।
এই বলে–
ছেলেটি আরো বিস্তরিত করেঃ সনাতন করল কি, জলভর্তি বড় একটা পেতলের ঘড়া এনে হাজির করল আমার সামনে। বলল বুঝেছি, তুই কে? অ্যাশশ্যাওড়ার শাকচুন্নী। টের পেয়েছি ঢের আগেই তোল তোল এই ঘড়া দাঁতে করে।
ভাবুন দিকি, কী ব্যাপার! ঘড়া দেখেই তো আমার চোখ ছানাবড়া। আমাকে ওরা যে কী ঠাউরেছে তাও আর আমার বুঝতে বাকী নেই। ওদের কাছে আমি এখন কিম্ভুতকিমাকার! আমার প্রতি ওদের কারু যে মায়া দয়া হবে না তাও বেশ বুঝতে পেরেছি। আমার ভূত না ছাড়িয়ে ওরা ছাড়বে না।
তবু একবার কাকীমাকে ডাকি শেষ ডাকা ডেকে দেখি : কাকীমা, এসব তোমাদের কি হচ্ছে? আমাকে তোমরা পেয়েছ কি? এসব কি বাড়াবাড়ি? আমার একদম ভাল লাগছে না।
কাকীমা চোখের জল মুছে চুপ করে থাকেন।
তখন সনাতনকে নিয়েই শেষ চেষ্টা করতে হয়। তাকেই বলি : বাপু, তোমার এই সনাতনপদ্ধতি অতিশয় খারাপ। কি চাও বলো তো? চকোলেট না চারটে পয়সা? তাই দেব, ছেড়ে দাও আমায়।
শাকচুন্নী ঠাকুরন, আর নাকে কান্না কেঁদনি! ভাল চান তো যা বলি তাই করুন দিকি এখন। এই বলে সতাতন ঘড়াটাকে মন্ত্র পড়ায়।
আমার মাথা ঘুরে যায়! জলভরা ঐ বড় ঘড়া-এক মণের কম হবে না। দুহাতেই কোনদিন তুলতে পারিনি, আর তাই কিনা, মুষ্টিমেয় এই কটা দাঁতে আমায় তুলতে হবে?
জাতও গেল, দাঁতও গেল, প্রাণও যায় যায়!
ধমক লাগায় সনাতন :–ভাল চাস তো ন্যাকাপনা রাখ! তোল দাঁতে করে। নইলে দেখেছিস—
বলতে না বলতে সনাতন—
ছেলেটি থেমে যায়। মুখ চোখ তার লাল হয়ে ওঠে। চকচকে চোখ ছলছল করতে থাকে।
আমার বন্ধুটি উৎসাহ দেয় ও বলো বলো–জমেছে বেশ।
আমি কিছু বলতে পারি না। মুখ কাঁচুমাচু করে বসে থাকি। সব দায়, সমস্ত অপরাধ যেন আমার আমারই কেবল! এই কেবলি আমার মনে হতে থাকে।
বলতে না বলতে সনাতন ঘা কতক আমাকে লীগয়ে দেয়! এই সনাতন, যাকে আমি চকোলেট খাইয়েছি, ছোটবেলায় কত না ওর পিঠে চেপেছি, কতই না ওকে পিটেছি, আর সেই কিনা….
ছেলেটির কণ্ঠ রুদ্ধ হয়। আমার এক চোখ দিয়ে জল গড়ায়। আমার বন্ধু রুমালে নাক মোছেন।
জগতের এই নিয়ম। বর্ষণমুখর চোখটা মুছে ফেলে আমি দার্শনিক হবার চেষ্টা করি। তুমি কেঁদ না, কেঁদ না তোমরা সনাতন রীতিই এই! আজ তুমি যার পিঠে চাপছ, কাল তোমার পৃষ্ঠপোষক! উপায় কি? এই বলে আমার যথাসাধ্য ওদের সান্ত্বনা দিই।
ছেলেটি ম্লান একটুখানি হেসে আবার শুরু করে : বেশ বোঝা যায়, সনাতন আমার হাতে যত না মার খেয়েছে এর আগে, এখন বাগে পেয়ে সে সবের শোধ তুলে নিচ্ছে। এই সুযোগে এক ছুতো করে বেশ একচোট হাতের সুখ করে নিচ্ছে। সুদে আসলে পুষিয়ে নিচ্ছে, বেশ বুঝতে পারি।
