না। কপালকুন্ডলা।
কপালকুন্ডলা বলেছিলো এ-কথা?
তাহলে বিষবৃক্ষ। বিষবৃক্ষই বলেছিলো বোধ হচ্ছে।
বিষবৃক্ষ। বৃক্ষ আবার কথা বলে নাকি?
তবে বঙ্কিমচন্দ্রর।
যা বলেছিস। বঙ্কিমচন্দ্রই বলেছিলো এ-কথা। কথাটা একবার ভেবে দ্যাখ তুই। এখানে তো শুধুই বাঙালী নয়। বাঙালীর চেয়েও সে আপনার তার জীবনমরণের প্রশ্ন।…মাসতুতো বাঙালীকে মাসতুতো বাঙালী না রাখিলে কে রাখিবে?
অগত্যা গোবর্ধনকে বুড়ো বয়সে পড়ুয়া হতে হয়। ক্লাস সিক্স যে পেয়নি সে প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল দিতে বসে। মাস্টারের কাছে পাটীগণিত নিয়েই পড়ে প্রথমে।
একেবারে সাঁইত্রিশের উদাহরণ মালা নিয়ে। এই অংকটা আমায় বুঝিয়ে দিন সার। বুঝিয়েই দেন মাস্টার।
এইবার এই আটত্রিশ উদাহরণ মালার অংকগুলো বোঝন।
সাঁইত্রিশের গুলো কষো আগে। কষে দেখাও।
ও আর কষবো কি সার? ওতো বুঝে নিয়েছি।
বুঝেছ কিনা কষে দেখাও।
আপনি বলছেন বুঝিনি আমি? বলছেন কি আপনি। তাহলে এতক্ষণ ধরে আপনি কি বোঝালেন আমায়।
এই রকম দিনের–পর দিন উদাহরণের পর উদাহরণ এগুতে থাকে। অঙ্কের বোঝা বাড়ে। অবশেষে গোবরা আর পারে না, দাদার কাছে এসে কেঁদে পড়ে–আর তো পড়তে পারি না দাদা? অঙ্ক কষতে বলছে কেবল। এবার রক্ষা করো আমায়। তখন দাদা নিজেই ভাইয়ের বোঝা ঘাড় পেতে নেন।
বোঝার ওপর শাকের আঁটি নিয়ে এগোন। একশোখানা একশো টাকার নোট। তার অর্ধেক মাস্টারের হাতে তুলে দিয়ে বলেন-এই বাকিগুলোও আপনার। পরে দেব আপনাকে। বলে মাস্টারকেই একটা নতুন অঙ্ক বোঝাতে লাগেন।
আপনাকে আর এর বেশি করতে হবে না। কেবল বাকি পাঁচজন জুরিকে নিজের মতে আনতে হবে। তা আপনি পারবেন। মাস্টারদের সবাই খাতির করে ভক্তি করে যেমন ভয়ও করে তেমনি। আপনার পক্ষে এ-কাজ কিছুই নয়। ক্লাসে যেমন ছেলেদের পড়ান তেমনি এখানে এই বুড়ো খোকাদের একটু পড়াবেন এই আর কি?
আপনি বলেছেন যেমন করে হোক ওর জেলের ব্যবস্থা করে দিতে হবে এই তো? জেল ছাড়া আর কিছু যেন না হয় এই তো? বেশ, আমার সাধ্যমত আমি চেষ্টা করবো। দেখি কদুর কী পারা যায়।
তা মাস্টারমশাই ভালোই পেরেছেন দেখা যাচ্ছে। হর্ষবর্ধন বলেন গোবর্ধনকে ও ফাঁসিকাঠ থেকে যে করেই হোক বাঁচিয়ে দিয়েছেন ভজুকে। আর এজন্য তোকেও বাহাদুরি দিতে হয় গোবরা। তুই কষ্ট করে এতো ত্যাগ স্বীকার করে পড়েছিলি বলেই তো।
বলতে না বলতে মাস্টারমশাই এসে হাজির–সাফল্যের হাসি মুখে নিয়ে।
আসুন আসুন মাস্টারমশাই। আসতে আজ্ঞা হোক। তাকে দেখে হর্ষবর্ধন উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন : নমস্কার-দণ্ডবৎ-প্রণাম। আপনার ঋণ আমরা জীবনে শুধতে পারবো না।
মাস্টারমশাই বসলে তিনি ড্রয়ার থেকে নোটের তাড়াটা বের করে এগিয়ে দেন-এই নিন, আপনার বাকি পাঁচ হাজার। আমাদের যৎকিঞ্চিৎ প্রণামী। এই সামান্য দিয়ে আপনার মহৎ উপকারের প্রতিশোধ দেওয়া যায় না।
না, না। এমন করে বললেন না। কৃতজ্ঞতার মূল্য কম নয়। এ পৃথিবীতে ক-জন তা দিতে পারে? মাস্টারমশাই বলেন :–কথা রাখতে পেরেছি বলে আমিও কম কৃতার্থ নই হর্ষবর্ধনবাবু।
জুরিদের আপনার মতে আনতে খুব বেগ পেতে হয়েছিল নিশ্চয়?
বেগ বলে বেগ। এরকম বেগ আমি জীবনে পাইনি। তিনি জানান : মুশকিল হয়েছিল কোথায় জানেন? বাকি জুরিদের সবাই বিবাহিত, বৌয়ের জ্বালায় অস্থির। তাঁদের কাছে ভজহরিবাবু একজন হীরো। তাদের মতে ভজহরিবাবু কোনো দোষ করেননি বৌকে মেরে। তারা নিজেরাও পারলে তাই করতে চায়, কিন্তু তারা পরে না, ভজহরিবাবু পেরেছেন। তাদের চেয়ে তিনি একজন বীরপুরুষ।
তাই তারা বুঝি চাইছিল সে বীরের মতই মৃত্যুবরণ করুক? ফাঁসিতে লটকাক?
না ঠিক তা নয়, তবে আমি বৌয়ের মর্ম বুঝিনে, বিয়েই করিনি আদপে। সামান্য আয়ে নিজেরই কুলায় না, বোকে খাওয়াবো কি? আমি দেখলাম না, এমন করতে হবে যাতে আইনের লাঠিও ভাঙে অথচ সাপও না মরে। অনেক কষ্টে দ্বীপান্তর দিতে পেরেছি মশাই। জুরিদের ঘরে গিয়ে–প্রায় তিনঘন্টা ধরে বক্তৃতা দিয়ে তাদের বোঝালাম,….বুঝিয়ে নিজের মতে আনলাম।
তা নইলে তারা ফাঁসি দিয়ে দিত? নিঘাৎ। গোবর্ধন প্রকাশ করে।
না। তারা চাইছিলো বেকসুর খালাস দিতে।
শিবরাম চকরবরতির মত কথা বলার বিপদ
আর কিছু না, বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বলেছি খালি : চা খাও আর না খাও, আমাকে তো চাখাও।
অমনি দোকানের ও-কোণ থেকে কে যেন তার কান খাড়া করল, ছোট্ট একটি ছেলে, আমি লক্ষ্য করলাম।
দূর। এই অবেলায় এখন চা খায়? শুদু একগ্লাস জল–আর কিছু না। বন্ধুর জবাব এল :–আর-আর না হয় ওই সঙ্গে একখানা বিস্কুট। ভাগভাগি অবিশ্যি।
ভারী যে নিরাসক্তি। না বাপু, আধখানা বিস্কুটে আমার লোভ নেই, আর নীরেও আমার আসক্তি নেই তুমি জানো আমার। চা-ই চাই।
কান-খাড়া করা ছেলেটি এবার বলে উঠল?
অ্যাঁ, কি বললেন?
তোমাকে তো কিছু বলিনি ভাই।আমি বললাম : আমি বকচি এই-এই পাশের আমার পাশের কি বলব একে? এই পার্শ্ববর্তীকে।
আপনি শিবরাম চকরবতির মতো কথা বললেন না?
অ্যাঁ? কার মতো কথা বল্লাম? আমার বেশ চমক লাগে।
শিব্রাম চকরবরতির মতো।
এবার আমি হকচকিয়েই গেছি। বা রে। আমি আবার কার মতো কথা বলতে যাব? আমি কি বলতে কি আমি নিজেই কি উক্ত অভদ্রলোক সেই শিব্রাম চকরবরতি নাই?
