কিসের হিংসে?
জানিস গোবরা, বছর বারো আগে আমারও মাথায় খুন চেপেছিলো একবার। খুন করবার ইচ্ছে হয়েছিলো তোর বৌদিকে।
বলল কি দাদা? গোবর্ধন আঁতকে ওঠে।
তোর বৌদির জ্বালায় অস্থির হয়ে–আর বলছিস কেন? ভেবেছিলাম যে খুন করে বরং ফাঁসি কাঠে চলে যাই, রেহাই পাই দুজনেই!
অমন কথা মুখেও আনতে নেই।
পারলাম কই করতে? পারলেও তো বাঁচতাম। হাড়মাস ভাজা ভাজা হয়ে গেলো অ্যান্দিনে।
এখনো তোমার সেই মতলব আছে নাকি দাদা?
এখন…এই বয়সে? অসম্ভব। কিন্তু হায়, যদি পারতাম তখন…! হর্ষবর্ধনের হায় হায় শোনা যায়। তাহলে বারো বছর বাদে আজ তো আমি মুক্ত পুরুষ রে!
জেল থেকে বেরিয়ে এসে বিয়ে করতে বুঝি আবার?
আবার? রামোঃ!
তুমি যে এমন সর্বনেশে লোক দাদা, আমি তো তা জানতুম না।
সর্বনেশেই বটে ভাই! নইলে এমন করে নিজের সর্বনাশ করি!
আমাদের অতো ভালো বৌদি–গোবরা মুখ গোমড়া করে–আর তাকেই কিনা তুমি?
তো বৌদি তার ভালো, আমার কে! দাদাও ফোঁস করে ওঠেন। ভজহরির বরাত জোর, নিজেও বাঁচলো বৌয়ের হাত থেকেও বাঁচলো! বারো বছর বাদে ফিরে এসে দিব্যি স্বাধীন হয়ে চরে বেড়াবে।
ভজুদা তোমার জন্যই তো বাঁচলো দাদা! গোবরা বলে।
তা বলতে পারিস–ওকে বাঁচাতে কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি আমায় আবার তোর জন্যেও। বটে!
সত্যি দাদা, এই বুড়ো বয়সে কেঁচে গুণ্ডুষ করতে হলো আমায়। লেখাপড়া শিখতে হলো আবার। তবে আসলে তোমার বুদ্ধিতেই বাঁচলো ভজুদা। যাটালো দাদা, তোমার বুদ্ধি কিন্তু অঢেল।
ভাইয়ের সার্টিফিকেট দাদার বুক বিস্ফারিত হলেও তিনি খাতিয়ে দেখেন বুদ্ধিটা আসলে ভজুরই। নিজের বুদ্ধিতেই বেঁচে গেলো ভজু। কথায় বলে না–আপ্তবুদ্ধি শুভঙ্করী, স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী! বৌ বেঁচে থাকলে আর বুদ্ধি দেবার সুযোগ পেলে ভজুকে আর বাঁচতে হোত না।
ভজহরির হাজত হবার খবর পেতেই ছুটে গিয়েছিলেন হর্ষবর্ধন। আমি বড়ো বড়ো উকিল লাগাবো, তুমি কিছু ভেবো না ভজু। আশ্বাস দিয়েছিলেন মাসতুতো ভাইকে।
উকিল তো ছাই করবে! উকিলের বিষয়ে বিশেষ ভরসা নেই ভজহরির; উকিল বলবে এখন তো দুর্গা বলে ঝুলে পড়ো বাপু, তারপর তোমায় আপীলে খালাস করে আনবো।
তাহলে? মিথ্যা সাক্ষী দিলে হয় না?
মিথ্যে সাক্ষীতে কাজ হয় বরং, কিন্তু এখানে তো সাফাই দেবার পথ রাখিনি ভাই। খুন করে রক্ত মাথা দা হাতে নিজেই থানায় গিয়ে ধরা দিয়েছি। কবুল করেছি সব।
এক দা-য়ে তোমাদের দুজনকেই কেটেছে দেখছি।
তখন কি আমার কোনো কাণ্ডজ্ঞান ছিলো? যেমন করে পারো আমায় বাঁচাও ভাই। দীপান্তরের আমার দুঃখু নেই, ফাঁসিটা যেন আটকায়।
টাকার আমার অভাব নেই। হর্ষবর্ধন জানায়ঃ তোমাকে বাঁচাবার জন্য খরচের আমি কোনো কসুর করবো না….
আন্দামান থেকে ফিরে এসে মনের মতো বৌ নতুন করে সংসার পাতবো আবার।
বৌ কখনো মনের মতো হয় না দাদা। নিজেকেই বৌয়ের মনের মতো করে নিতে হয়। আমি যেমন নিজেকে গড়ে পিটে করে তুলেছি।
শোনো হর্ষ, নিচের কোর্টে আমার এ মামলার কোনো ফয়সালা হবে না। সেশনে জুরিদের ভাঙচি দিয়ে মোটা টাকা ঘুষ দিয়ে…।
বুঝেচি। আর বলতে হবে না হর্ষবর্ধন বাধা দেন, কেউ শুনতে পেতে আমাকেও ধরে ফাটকে পুরে দেবে। ঘুষ দিতে গেলেও জেলে যেতে হয়। তুমি কিছু ভেবো না। টাকায় যা হতে পারে তার কোনো ত্রুটি হবে না তুমি নিশ্চিত থাকো।
কিন্তু সেশন কোর্টে পৌঁছে দেখলো সে বড়ো কঠিন ঠাই। হোমরা-চোমরা যতো জুরি, গোমড়া মুখ সেখানে তার জারিজুরি খাটবে না।
তবে ওদের মধ্যে চিনতে পারলেন একজনকে। তাঁদের পাড়াতেই থাকেন, দরিদ্র স্কুল-মাস্টার। চল্লিশ টাকা বেতন নিয়ে বেতনের খাতায় একশো কুড়ি টাকা পাইলাম বলে লিখতে হয় যাকে, উদায়াস্ত দশ পাঁচটাকার গোটা দশেক টুইশানি করে সংসার চালাতে হয় যাকে।
ভাবলেন তাকেই পাকড়াবেন।
কথাটা পাড়লেন গোবরার কাছে–বুঝলি শ-দুই টাকার একটা টুইশানি দিয়ে ওকেই হাত করতে হবে।
কিন্তু পড়বে কে? বাড়িতে পড়বার ছেলে কই তোমার? গোবরা শুধায়।
তা বটে। হর্ষবর্ধন খাতিয়ে দেখেন, বাড়িতে ছেলে বলতে গোবরা আর মেয়ে বলতে উনি, গোবরার বৌদি। ওঁকে পড়বার কথা বলতে তাঁর সাহস হয় না, তাহলে হয়তো বৌকে বিধবা করে বৌয়ের হাতের নিজেকেই খুন হতে হবে। অগত্যা–
–কেন তুই তো আছিস। ছোট ভাই তো ছেলের মতই। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সম পিতা বলে থাকে শুনিসনি। তুই-ই পড়বি।
আমি? গোবরা আকাশ থেকে পড়ে। এই বয়সে?
পড়বার আবার বয়স আছে নাকি? সব বয়সেই বিদ্যা শিক্ষা করতে হয়। মরবার আগে পর্যন্ত জ্ঞানার্জন করে যায় মানুষ।
না দাদা, লেখাপড়া করা আমার দ্বারা হবে না।
আরে পড়বি নাকি? পড়ার ছলনা করবি তো।
ছলনা করতে আমি পারবো না। মাস্টারকে আমার ভারি ভয়। নীলডাউন করিয়ে দেবে।
তা দেবে। সে কথা ঠিক। সায় দিতে হয় দাদাকে : আমি না হয় চেয়ার বেঞ্চির বদলে নরম গদির ফরাশ পেতে পড়বার ব্যবস্থা করবো। তাহলে তোর হাঁটুতে আর তেমন লাগবে না।
না লাগুক। আমার আত্মসম্মান হানি হবে তো? যদি আমার কান মলে দেয়?
তখন বাধ্য হয়ে হর্ষবর্ধনকে উদাত্ত হতে হয়:–কিন্তু ভাই গোবরা, বাঙালীকে বাঙালী না রাখিলে কে রাখিবে? কে বলেছিলো এ-কথা?
চন্দ্রশেখর।
চন্দ্রশেখর বলেছিলো? শুনে দাদা তো হতবাক।
