কাল থেকেই সে ব্যর্থ হয়ে ছিল, এখন সুযোগ পেতেই সার্টিফিকেটখানা মন্টুর বাবার মুখের সামনে মেলে ধরল। ভদ্রলোকের চোখ দুই ছানাবড়ার মতো হয়ে উঠল বিস্ময়ে–সত্যিই। একটা কথাও মিথ্যে নয়, Passed with distinction–লেখাই রয়েছে। বটে এমন জিনিস ছারপোকা। কে জানতো গো।
পয়সা খরচ করে ছারপোকা কিনতে হবে না, তোমার বিছানাতেই রয়েছে হাজার হাজার, লাখ লাখ, যত চাও। তোমার ভয়ানক ঘুম বলে জানতে পারোনি।
এতক্ষণ কেন বলেননি আমায়? অনেকখানি ব্রেন করে ফেলতাম। এ বেলা আমার নেমন্তন্ন আছে ভবানীপুরে, এখনই বেরোতে হবে নইলে,এক্ষুনি, যাক, দুপুরে ফিরেই ওগুলোর সদ্বব্যহার করব। তারপরে পড়াতে বসব মন্টুকে।
মিহির চলে গেলে পিতাপুত্রে চাওয়াচাওয়ি হয়। অবশেষে মন্টুর বাবা বলেন, ছারপোকার সঙ্গে যে ব্রেনের সম্বন্ধ আছে, অনেক দিনই একথা মনে হয়েছিল আমার। ছারপোকার ব্রেনটা একবার ভাব দিকি–অবাক হয়ে যাবি তুই। খুচ করে এসে কামড়েছে, তক্ষুনি উঠে দেশলাই জ্বাল, আর পাবি না তাকে, কোথায় যে পালিয়েছে, তার পাত্তা নেই। মানুষ যে দেশলাই আবিষ্কার করেছে এ পর্যন্ত ওদের জানা। এটা কি কম ব্রেন? আর এ ব্রেন তো ওদের ওই রক্তেই, কেন না মাথা নেই ওদের গায়েই ওদের সব ব্রেন। ঠিক বলেছে মিহির।
–হ্যাঁ বাবা।
–তারপর ছারপোকার সঙ্গে শিক্ষার সম্বন্ধও কম নয়। ছারপোকা বিস্তারের সাথে সাথে শিক্ষার বিস্তার বাড়ে। ট্রামে বাসে সিনেমায় যেমন ছারপোকা বেড়েছে, তেমনি হু হু করে খবরের কাগজের কাটতিও বেড়ে গেছে। এই সেদিন বায়স্কোপে আমাদের সামনেই সাড়ে চার আনার সীটে একটা কুলী বসেছিল, তোর মনে পড়ে না মন্টু
–হ্যাঁ–বাবা।
–সে তো লেখাপড়া কিছুই জানে না। দু মিনিট না বসতেই দু পয়সা খরচা করে একখানা আনন্দবাজার কিনে আনলে সে। এতে শিক্ষা বিস্তার হলো না কি? মন্টু কি বলিস তুই?
–হ্যাঁ বাবা।
চল তবে এক কাজ করিগে। তোর মাস্টার মশাই ফেরার আগে আমরাই ছারপোকাগুলোর সদ্ব্যবহার করে ফেলি। ব্রেন তো তারও দরকার, আর আমারও মেমারিটও দিন দিন কেমন যেন কমে আসছে। সেদিন শ্যামবাবুকে মনে হল গোবর্ধনবাবু মনে হল হারাধন কান্ত। এ তো কথা নয়রে মন্টু। কি বলিস তুই?
–হ্যাঁ বাবা।
সন্ধের পরে ফিরল মিহির। কাল সারা রাত ঘুম নেই, তারপর আজ সমস্ত দিন বন্ধুদের আড্ডায় তাস পিটে এতই ক্লান্ত হয়েছে যে ঘুমোতে পারলে বাঁচে। আজ সে আলো জ্বালিয়েই শোবে-আলো দেখে যদি না আসে ব্যাটারা। এখন নমো নমো করে মন্টুকে খানিকক্ষণ পড়ালেই ছুটি,–
মন্টু বই নিয়ে আসতেই গোটা ঘরটা একটা বিশ্রী দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
–নতুন ধরনের এসেন্স-টেসেন্স মেখেছ না কি কিছু? ভারি গন্ধ আসছে তোমার গা থেকে। মিহির জিজ্ঞাসা করল।
–গা নয় স্যার, মাথার থেকে।
–কিসের গন্ধ? বেজায় খোশবাই দিচ্ছে।
–ছারপোকার। আপনি চলে যাবার পর বাবা আর আমি দুজনে মিলেই বেতন-নিবারকেরর যতো ছারপোকা ছিল সব শেষ করেছি। ছোটুরামকেও বলা হয়েছিল কিন্তু সে ব্যাটা মোটেই ব্রেন চায় না। বসে যে বিরেন সে কেয়া কাম? আর একটাও ছারপোকা নেই আপনার বিছানায়। হি-হি-হি।
–হ্যাঁ? সিংহনাদ করে মিহির চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বিছানায় গিয়ে পড়ে সটান চিৎপটাং। মন্টু তো হতভম্ব। দারুণ সেই চিৎকার শুনে মন্টুর বাবা ছুটে আসেন–কী হয়েছে রে, মন্টু? কী হল?
–ছারপোকা নেই শুনে মাস্টারমশাই অজ্ঞান হয়ে গেছেন।
–তা তুই বলতে গেলি কেন? বারণ করলাম না তোকে? অতগুলি ছারপোকার ব্রেনের শোক।
–আমি কী করে জানব যে উনি অমন করবেন। আমি কিছু বলিনি। উনি কী করে গন্ধ পেলেন উনিই জানেন। মুখে জল ছিটোলে জ্ঞান হয় শুনেছি, ছিটবো, বাবা? অজ্ঞান অবস্থাতেই মিহিরের গলা থেকে বের হয়–উঁহু।
মন্টুর বাবা বললেন কাজ নেই। জ্ঞান হলে যদি কামড়ে দেয় রে? ঐ দ্যাখ বিড়বিড় করছে–
মিহির তার শোক সামলে উঠল পরদিন সাড়ে আটটায়। ষাঁড়ের মতন সারারাত এক নাগাড়ে ডাকাবার পর।
মাসতুতো ভাই
জীবন-মরণ সমস্যার দিন আজ একটা। বৌকে খুন করে সেশন কোর্টের আসামী ভজহরি। তার রায় বেরুবার দিন আজ।
মাসতুতো ভাইকে মাসতুতো ভাই না দেখলে কে দেখবে? কিন্তু আজ আর ভজহরিকে দেখা দিচ্ছেন না হর্ষবর্ধন।
দেখা শোনা, মামলার তদ্বির যা করবার তা এতদিন সবই করেছেন তিনি, এমন কি ষোলোআনার ওপর আঠারো আনাও। কিন্তু আজ আদালতের দিকে পা বাড়াবার তাঁর সাহস হয় না। নিজের চোখে ফাঁসি দেখা যেমন কষ্টকর, নিজের কানে সেই দণ্ডাজ্ঞা শোনাও তার চেয়ে কিছু কম কঠিন নয়। ভজুকে প্রাণদণ্ড থেকে যদি বাঁচানো না গিয়ে থাকে, এগিয়ে নিজের কানদণ্ড নেওয়া কেন?
ভাই গোবর্ধনকে বলে রেখেছেন, আদলতের লাঞ্চের সময়ে সেশন কোর্টের বার লাইব্রেরিতে উকিলবাবুকে ফোন করে যেন খবরটা জেনে নেয়।
কিন্তু গোবর্ধনকে আর ফোন করতে হলো না, সাড়ে বারোটার সময় উকিলবাবুই খবর দিলেন টেলিফোনে। এই মাত্তর ভজহরির দ্বীপান্তর হয়ে গেলো। যাবজ্জীবন। যার মানে আসলে হচ্ছে বারো বছরের জেল, উকিলবাবু জানালেন।
ভজুটা বেঁচে গেলো এ-যাত্রা। হাঁপ ছাড়লেণ হর্ষবর্ধন: ফাঁসিকাঠে লটকাতে হলো না বেচারাকে।
তারপর একটু পরে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন : ভজুর ভাগ্যকে আমার হিংসে হয়, জানিস গোবরা?
