মন্টু সন্দেহ প্রকাশ করে–শেভিং মানে তো কামানো। ছোটুরাম আমাদের চাকর, সে বেতন কামায়, বেতন-নিবারকে শোয় না তো সে। তাকে অনেক বার অনেক করে বলা হয়েছে কিন্তু কিছুতেই সে শোয় না। সেইজন্যই তো এ-চাকরটা টিকে গেল আমাদের। বাবা ভারি দুঃখ করেন তাই।
কী সব হেঁয়ালি বকছে ছেলেটা? মাথা খারাপ না কি এর? অ্যাঁ? যাক, ওসব ভাববে না সে। সে প্রতিজ্ঞাই করেছে মোটেই মাথা ঘামাবে না এদের ব্যাপারে। একবার ঘামাতে আরম্ভ করলে তখন আর থামাতে পারবে না–নির্ঘাৎ পাগল হতে হবে। আজ আর পড়ানো নয়, অনেক পড়ানো হয়ে গেল, কেবল মাথা কেন, সর্বাঙ্গ ঘেমে উঠেছে তার ধাক্কায়। আজ এই পর্যন্তই থাক। মন্টুকে সে বিদায় দিল ।–যাক আজকের মতন তোমার ছুটি।
এইবার একটা তোফা নিদ্রা বিছানায়। দু-দুবার বৌবাজার আর বাগবাজার করেছেন আজ, অনেক হাঁটাচলা হয়েছে ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে আসছে। আজ রাত্রে সে খাবে না বলেই দিয়েছে–এক বন্ধুর বাড়িতেই খাওয়াটা সেরেছে বিকেলে। ব্যাস, সুইচ অফ করে এখন শুলেই হয়।
নরম বিছানায় সর্বাঙ্গ এলিয়ে দিয়ে আরামে মিহিরের চোখ বুজে এল–আঃ। নিদ্রার রাজ্যে সবেমাত্র প্রবেশ করেছে সে, এমন সময়ে তার মনে হল সর্বাঙ্গে কে যেন এক হাজার উঁচ বিধিয়ে দিল এক সঙ্গে। আর্তনাদ করে মিহির লাফিয়ে উঠল বিছানা ছেড়ে। বাতি জ্বেলে দেখে, সর্বনাশ–সমস্ত বিছানায় কাতারে কাতারে ছারপোকা ছারপোকা আর ছারপোকা। হাজারে হাজারে, লাখ-লাখ-গুনে শেষ করা যায় না। শুধুই ছারপোকা।
এতক্ষণে বেতন-নিবারক বিছানায় মানে সে বুঝল, বুঝতে পারল কেন মাস্টাররা টেকে না। ও বাবাঃ। কেবল ছাত্রই নয়, ছারপোকাও আছে তার সাথে। ঘরে-বাইরে যুদ্ধ করে একটা লোক পারবে কেন? তবু যে ভদ্রলোক ঊনত্রিশ দিন বুঝেছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলেন না ছেড়ে পালাতে হল যাকে তিনি একজন শহীদ পর্যায়ের সন্দেহ নেই। ত্রিশ টাকা মাইনের মাষ্টার রেখে বেতন না দিয়েই ছেলে পড়ানো নাঃ, ভদ্রলোক কেবল উদার আর মহৎ নন, বেশ রসিক লোকও বটেন তিনি। মায়া দয়া নেই একটু, একেবারে অমায়িক।
ভীতি-বিহ্বল চোখে সে ছারপোকা বাহিনীর দিকে তাকিয়ে রইল। গুনে শেষ করা যায় না–ওকি মেরে শেষ করা যাবে? আর সারারাত ধরে যদি ছারপোকাই মারবে তো ঘুমোবে কখন? নাঃ চেয়ারে বসেই আজ কাটাতে হল গোটা রাতটা।
আলো দেখা মাত্র ছারপোকার আবার মিলিয়ে গেল। মিহির ভাবল–বাপস, এরা রীতিমতো শিক্ষিত দেখছি। যেমন কুচকাওয়াজ করে এসেছিল তেমনি কুচকাওয়াজ করে চলে গেল–আধুনিক যুদ্ধের কায়দা-কানুন সব এদের জানা দেখা যাচ্ছে। কোথায় গেল ব্যাটারা?
সদ্য পাট-ভাঙা ধবধবে চাদরের এক কোণ তুলে দেখে তোশকের গদির খাঁজে খাঁজে থুক থুক করছে ছারপোকা অন্যধারেও তাই। আর বেশি সে দেখল না, কি জানি এখন থেকেই যদি তার মাথা খারাপ হতে থাকে। চেয়ারে গিয়ে বসল কিন্তু ভয়ে আলো নিবোল না কি জানি যদি ব্যাটারা সেখানে এসেও তাকে আক্রমণষ করে। বলা যায় নি কিছু….
পরদিন মন্টুর বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, বেশ ঘুম হয়েছিল রাত্রে?
–খাসা। অমন বিছানায় ঘুম হবে না, বলেন কি আপনি?
ভদ্রলোক একটু অবাক হয়ে বললেন, বেশ বেশ, ঘুম হলেই ভাল। জীবনের বিলাসই হল গিয়ে ঘুম।
–আর ব্যাসন হল বেগুনি? না বাবা?
–তা তোমার ঘুমটা বোধ হয় বেশ জমাট? ঘুমিয়ে আয়েস পাও খুব?
–আজ্ঞে, সে-কথা আর বলবেন না। একবার আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পাশের বাড়ি চলে গেছলাম। কিন্তু মোটেই তা টের পাইনি।
–বল কি?
–আমাদের বাড়ি বর্ধমানে। শুনেছেন বোধ হয় সেখানে বেজায় মশা-মশারি না খাঁটিয়ে শোবার যো নেই। একদিন পাশের বাড়িতে খুব দরকারে ডেকেছিল আমাকে কিন্তু ভুলে গেছলাম কথাটা। যখন শুতে যাচ্ছি তখন মনে পড়ল, কিন্তু অনেক রাত হয়ে গেছে, অত রাত্রে কে যায়, আর দরজা টরজা বন্ধ করে তারা শুয়ে পড়েছে ততক্ষণ আমি করলাম কি, সেরাত্রে আর মশারি খাটালাম না। পরের দিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল মশাই, বলব কি, দেখি পাশের বাড়িতেই শুয়ে রয়েছি।
দারুণ বিস্মিত হলেন ভদ্রলোক–কি রকম?
–মশায় টেনে নিয়ে গেছে মশাই। সেইজন্যেই তো মশারি খাটাইনি। রাত-বিরেতে অনায়াসে পাশের বাড়ি যাবার ওইটেই সহজ উপায় কি না।
ভদ্রলোক বেজায় মুশড়ে পড়লেন যেন-মশাতেই যখন কিছু করতে পারেনি তখন কিসে আর কী করবে তোমার। তুমি দেখছি টিকেই গেলে এখানে।
মিহির বলল, আমার কিন্তু একটা নিবেদন। কয়েকটা টাকা আমাকেদিতে হবে আগাম। ছারপোকার অর্ডার দেব।
–ছারপোকার আর্ডার। কেন? সে আবার কি হবে?
–ও, আপনি জানেন না বুঝি? ছারপোকার মতো এমন মস্তিষ্কের উপকারী মেমোরি বাড়ানোর মহৌষধি আর নাই। বিলেতে ছারপোকার চাষ হয় এইজন্যে। গাধা ছেলে সব দেশেই আছে তো, তাদের কাজে লাগে।
একটু থেমে সে আবার বললে, আমার এক বন্ধু তো এই ব্যবসাতেই লেগে পড়েছে রেলগাড়ির ফাঁকফোকর থেকে সব ছারপোকা সে টেনে বার করে নেয়।
সাগ্রহে ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন, কি রকম, কি রকম? বিলেতে ছারপোকার চাষ হয়? দাম দিয়ে কেনে লোকে? আমাদানি রপ্তানি হয় তুমি জানো? আমি বেচতে পারি, হাজার হাজার, লাখ লাখ–যতো চাও।
–বেচুম না। আমিই কিনে নেব। আমার নিজের কাজে লাগবে। ছারপোকার রক্ত ব্রেনের ভারি উপকারী একটা ছারপোকা ধরে নিয়ে এমনি করে মাথায় টিপে মারতে হয়, এই রকম হাজার হাজার লাখ লাখ ছারপোকার রক্তে এক ছটাক ব্রেন; সঙ্গে সঙ্গে ব্রেন;–বি. এ. পাশের সময়ে আমি নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি। সারা বছর ফাঁকি দিয়েছি, ফেল না হয়ে আর যাই না। এমন সময়ে এক বিলেতি কাগজে ছারপোকার উপকারিতা পড়া গেল, অমনি সমস্ত বাসা খুঁজে যার বিছানায় যত ছারপোকা ছিল, সব সদ্বব্যহার করলাম। পরীক্ষা দেবার তখন মাত্র তিন দিন বাকি। তারপর ফল যা পেলাম নিজের চোখেই দেখুন, আমার কাছেই দেখুন, আমার কাছেই আছে, বি.এ. পাশ করলাম উইথ ডিস্টিংশন–ফার্স্ট ক্লাস উইথ…
