সত্যিই খাটে শোবার কল্পনা তার ছিল না। জীবনে কখনো সে গদিমোড়া খাটে শোয়নি। আনন্দের আতিশয্যে সে তখনই একবার গড়িয়ে নিল বিছানায়। আঃ, কী নরম! আজ খুব আরামে ঘুমানো যাবে–খেয়েদেয়ে সে তো এসেছেই, আজ আর কোনো কাজ নয়, এমন কি মন্টুকে পড়ানোও না, আজ খালি ঘুম! তোফা একটা ঘুম বেলা আটটা পর্যন্ত।
মন্টু এল বই-পত্র নিয়ে। মিহির প্রস্তাব করল, এসো, খাটে বসেই পড়াই।
–না স্যার, আমি ও–খাটে বসব না!
মিহির বিস্মিত হল, কেন? এমন খাট!
–আপনি মাস্টার মশাই গুরুজন, আপনার বিছানায় কি পা ঠেকাতে আছে আমার? বাবা বারণ করেছেন।
–ওঃ তাই? তা হলে চল চেয়ারে বসিগে। ক্ষুণ্ণমনে সে চেয়ারে গিয়ে বসল কিন্তু যাই বল, বেশ বিছানাটি তোমাদের। ভারী নরম। বেশ আরাম হবে ঘুমিয়ে।….দেখি তোমার বই।….Beans!…বীনস মানে জানো?
মন্টু ঘাড় নাড়ে। তার মানে সে জানে না।
–Beans মানে বরবটি এক রকম সবজি-তরকারি হয়, আমরা খাই। Beans দিয়ে একটা সেনটেন্স কর দেখি। পারবে?
মন্টু ঘাড় নেড়ে জানায়—হ্যাঁ। তারপর অনেক ভেবে বলে। I had been there.
মিহির অত্যন্ত অবাক হয়–এ আবার কি! উঃ, এতক্ষণে সে বুঝতে পারলো কেন সব মাস্টার পালিয়ে যায়। গবাকান্ত বলে গবাকান্ত। মরীয়া হয়ে সে জিজ্ঞাসা করে তার মানে কি হল?
মন্টুও কম বিস্মিত হয় না–তার মানে তো খুব সোজা সার! আপনি বুঝতে পারছেন না? সেখানে আমার বরবটি ছিল। আই হ্যাড বিন দেয়ার আমার ছিল বরবটি সেখানে…সেইটাই ঘুরিয়ে ভাল বাংলায় হবে সেখানে আমার–
–থাম, থাম, আর ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হবে না তোমাকে। আই হ্যাড বিন দেয়ার মানে আমি সেখানে ছিলাম।
মন্টু আকাশ থেকে পড়ে–তবে যে আপনি বললেন বীন মানে বরবটি? তাহলে আমি সেখানে বরবটি ছিলাম–বলুন।
মিহির সন্দেহ প্রকাশ করে–খুব সম্ভব তাই ছিলে তুমি। Bean আর Been কি এক জিনিস হল? বানানের তফাত দেখছ না? এ Been হল be ধাতুর form–
বাধা দিয়ে মন্টু বলে, হ্যাঁ বুঝেছি স্যার, আর বলতে হবে না। অর্থাৎ কিনা এBeen হল মৌমাছির চেহারা। বি মানে মৌমাছি আর ফর্ম মানে চেহারা! আমি জানি।
বিস্ময়ে হতবাক মিহির শুধু বলে, জানো তুমি?
–হ্যাঁ আজ সকালেই জেনেছি। আপনি চলে যাবার পর বাবা বললেন, তোর নতুন মাস্টার মশায়ের বেশ ফর্ম তখনই জেনে নিলাম।
মিহির কথাটা ঠিক ধরতে না পেরে, বললে, আমার চেহারা মৌমাছির মতো? জানতাম না তো। কিন্তু সে কথা যাক, যে Beans মানে বরবটি, তা দিয়ে সেনটেন্স হবে এই রকম–Peasants grow beans অর্থাৎ চাষীরা বরবটি উৎপন্ন করে, বরবটির চাষ করে। বরবটি ফলায়। বুঝলে এবার।
মন্টু ঘাড় নেড়ে জানায়, বুঝেছে।
–অতটা ঘাড় নেড়ো না, ভেঙে যেতে পারে। তোমার তো আর মৌমাছির চেহারা নয় আমার মতন। বেশ, বুঝেছ যদি, এই রকম আর একটা সেনটেন্স বানাও দেখি বীনস দিয়ে।
অনেকক্ষন ধরে মন্টুর মুখ নড়ে, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বার হয় না। মিহির হতাশ হয়ে বলে, পারলে না? এই ধর যেমন, Our cook cooks Beans আমাদের ঠাকুর বরবটি রাধে। এখানে তুমি কুক কথাটার দু রকম ব্যবহার পাচ্ছ, একটা নাউন আরেকটা ভাব। আচ্ছা, আর একটা সেনটেন্স কর দেখি।
এতক্ষণে বীনস ব্যাপারটা বেশ বোধগম্য হয়ে এসেছে মন্টুর। সে এবার চটপট জবাব দেয়। We are all human beans.
–অ্যাঁ বল কি? আমরা সবাই মানুষ–বরবটি? বরবটি মানুষ?
–কেন? বাবাকে অনেকবার বলতে শুনেছি যে হিউম্যান বীনস।
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে মিহির। অর্থাৎ বসে তো সে ছিলই, মাথায় হাতটা দেয় কেবল। দিনের পর দিন-মাসের পর মাস এই ছেলেকেই পড়াতে হবে তাকে? ওঃ এইজন্যই মাস্টাররা টিকতে পারে না? কি করে টিকবে? পড়াতে আসে–কুস্তি করতে তো আসা নয়। রোজই যদি এ রকম ধস্তাধস্তি করে দুবেলা ওকে পড়াতে হয়, তাহলেই তো সে গেছে। তাহলে তাকেও পালাতে হবে টিউশানির মায়া ছেড়ে, ত্রিশ টাকার মায়া কাটিয়ে, নরম আরাম ফেলে—
নাঃ, সে কিছুতেই পালাচ্ছে না। একজন ঊনত্রিশ দিন পর্যন্ত টিকেছিল আর একদিন টিকতে পারলেই ত্রিশ টাকা পেত, কিন্তু একটা দিনের জন্য এক টাকাও পেল না। বোধ হয় তার কেবল পাগল হতেই বাকি ছিল–পাগল হয়ে যাবার ভয়ে পালিয়েছে। আর একটা দিন পড়াতে হলেই পাগল হয়ে যেত। কিংবা পাগল হয়েই সে পালিয়ে গেছে হয়তো, নইলে ত্রিশ-ত্রিশটা টাকা কোন সুস্থ মানুষ ছেড়ে যায় কখনো? কী সর্বনাশ। ভাবতে তার স্বকম্প হয়।
সে কিন্তু চাকরিও ছাড়বে না, পাগলও হবে না, তার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। মন্টু যা বলে বলুক-না পড়ে না পড়ুক–বোঝে বুঝুক, না বোঝে না বুঝুক–মন্টুকে সে বই খুলে পড়িয়ে যাবে–এই মাত্র; ও কে নিয়ে মোটেই সে মাথা ঘামাবে না আর মাথাই যদি না ঘামায় পাগল হবে কি করে? নির্বিকার ভাবে সে পড়াবে–কোনো ভয় নেই তার।
তার গবেষণায় বাধা পড়ে, মন্টু হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে বসে বেতন-নিবারক বিছানা-এর ইংরেজী
কি হবে সার?
–বেতন-নিবারক বিছানা আবার কি?
–সে একটা জিনিস। বলুন না ওর ইংরেজীটা জেনে রাখা দরকার।
–ও রকম কোনো জিনিস হতেই পারে না।
–হতে পারে না কি হয়ে হয়েছে। আপনি জানেন না তাহলে ওর ইংরেজী। সেই কথা বলুন।
ওর ইংরেজী হবে পে-সেভিং বেড (Pay-saving bed)।
