চতুর্থ এদের কারো চেয়েই কোন অংশে নূন্য নয়।
মন্টুর মাস্টার
বি. এ. পাশ করে বসে আছে মিহির, কি করবে কিছুই স্থির নেই। এমন সময়ে দৈনিক আনন্দবাজারে একটা বিজ্ঞাপন দেখল কর্মখালির। কোনো বনেদী গৃহস্থের একমাত্র পুত্রের জন্য একজন বি. এ. পাশ গৃহশিক্ষক চাই–আহার ও বাসস্থান দেওয়া হইবেক, তাছাড়া বেতন মাসিক ত্রিশ টাকা।
বিজ্ঞাপনটা পড়েই লাফিয়ে উঠল মিহির, এই রকমই একটা সুযোগ খুঁজছিল সে…খাওয়া থাকাটা অমনিই হবে, তাছাড়া ত্রিশ টাকা মাস-মাস-কিছু বাড়িতেও পাঠাতে পারবে, এম. এটাও পড়া হবে সেই সঙ্গে, সিনেমা ফুটবল-ম্যাচ দেখার মতো পকেট-খরচারও অভাব হবে না।
একবার তার মনে হল এই বিজ্ঞাপনটা এর আগেও যেন দেখেছে সে-ওই আনন্দবাজারেই। হ্যাঁ, প্রায়ই সে দেখেছে। গত বছরও দেখেছিল, তখনই তার ইচ্ছা হয়েছিল একটা আবেদন করে দেয়,কিন্তু তখনো সে বি. এ. পাস করেনি। খবু সম্ভব ছেলেটি একটি গবাকান্ত–তাই বেতন ভারী দেখে কেউ এগোলেও ছেলে আবার তার চেয়ে ভারী দেখে পিছিয়ে পড়ে।
সে কিন্তু পেছোবে না, প্রাণপণে পড়াবে ছেলেটাকে–পড়াতে গিয়ে যদি পাগল হয়ে যেতে হয় তবুও! ত্রিশ টাকা কম টাকা নয়–তার জন্য গাধা পিটিয়ে মানুষ করা আর বেশি কথা কি, মানুষ পিটিয়েও গাধা বানানো যায়। ভদ্রলোক অতগুলো টাকা কি মাগনা দিচ্ছেন নাকি?
বিকেলেই মিহির সেই ঠিকানায় গেল। বি.এ.-র সার্টিফিকেটটা সঙ্গেই নিয়ে গেছল কিন্তু ভদ্রলোক তা দেখতেও চাইলেন না, কেবল মিহিরকে পর্যবেক্ষণ করলেন আপাদমস্তক। মিহিরই যেন মিহিরের সার্টিফিকেট, মিহির খুশিই হল এতে।
অবশেষে ভদ্রলোক বললেন, তোমার জামাটা একবার ভোলো তো বাপু?
মিহির ইতস্তত করে। জামা খুলতে হবে কেন? বুঝতে পারে না সে!
–আপত্তি আছে তোমার?
–না, না। মিহির জামাটা খুলে ফেলে। ত্রিশ টাকা জন্য জামা খোলা কেন, যদি জামাই হতে হয় তাতেও রাজি।
–তুমি একসারসাইজ কর?
–এক আধটু!
–বেশ বেশ। ভদ্রলোককে একটু চিন্তান্বিত দেখা যায়। মিহির ভাবে, একসারসাইজ করার অপরাধে চাকরিটা খোয়াল না তো? নাই বলতো কথাটা, কিন্তু কি করেই বা সে জানবে যে ভদ্রলোক একসারসাইজের উপর এমন চটা। কিন্তু এও তা ভারি আশ্চর্য, সে গ্রাজুয়েট কি না, কোন বছরে পাশ করেছে এসবের কিছুই তিনি জিজ্ঞাসা করছে না।
–আর একটা কথা খালি জিজ্ঞাসা করব তোমায়।
মিহির পকেটের মধ্যে সার্টিফিকেটটা বাগিয়ে ধরে–এইবার বোধ হয় সেই প্রশ্নটা আসবে! আর সে উত্তর দিয়ে চমৎকৃত করে দেবে যে বি. এ.-তে সে ফার্স্ট ক্লাস উইথ ডিস্টংশন পেয়েছে।
ভদ্রলোক মিহিরকে আর একবার ভাল করে দেখে নিয়ে বললেন, তোমার শরীরটা নেহাত মন্দ নয়। ওজন কত তোমায়!
ওজন? আকাশ থেকে পড়ে মিহির অবশেষে কি না এই প্রশ্ন-তা প্রায় দু মনের কাছাকাছ!
–বেশ বেশ। কিছুদিন টিকতে পারবে তুমি, আশা হয়। কি বলিস মন্টু তোর ও মাস্টার মশাই কিছুদিন টিকে যাবে, কি মনে হয় তোর?
মিহিরের ছাত্র কাছেই দাঁড়িয়েছিল, সে সায় দিল হ্যাঁ বাবা, এ মাস্টার মশাইয়ের গায়ে অনেক রক্ত আছে।
ভদ্রলোক অবশেষে তাঁর রায় প্রকাশ করলেন কিছুদিন টেকা আশার কথা, বেশ কিছুদিন টেকাটাই হল আশঙ্কার। যাক, সবই শ্রীভগবানের হাত–
মন্টু বাধা দিল–ভগবানের হাত নয় বাবা, শ্রী ছার–
–চুপ! কথার উপর কথা কস কেন? কিছু বুদ্ধিশুদ্ধি হল না তোর। হ্যাঁ, দেখ বাপু, পড়াশুনার সঙ্গে এটিকেও একে শেখাতে হবে। পিতামাতা গুরুজনদের কথায় উপর কথা বলা, অতিরিক্ত হাসাএই সব মহৎ দোষ সারাতে হবে এর। বেশ, আজ থেকেই ভর্তি হলে তুমি। ত্রিশ টাকাই বেতন হল, মাসের পয়লা তারিখেই মাইনে পাবে, কিন্তু একটা শর্ত আছে। পুরো এক মাস না পড়ালে, এমন কি একদিন কম হলেও একটা টাকাও পাবে না তুমি। পাঁচ দিন দশ দিন পড়িয়ে অনেক প্রাইভেট টিউটার ছেড়ে চলে গেছে, সে রকম হলে আমি বেতন দিতে পারি না, সে কথা আমি আগেই বলে রাখছি–
মন্টু বলল, একজন কেবল বাবা উনত্রিশ দিন পর্যন্ত ছিলেন আরেকটা দিন যদি কোনো রকমে থাকতে পারতেন, কিন্তু কিছুতেই পারলেন না।
–থাম তা তোমার জিনিসপত্র সব নিয়ে এসোগে। আজ সন্ধ্যা থেকেই ওকে পড়াবে। মন্টু, যা, মাস্টার মশায়ের ঘরটা দেখিয়ে দে, আর ছোট্ট রামকে বলে যে বেতন-নিবারকে মাস্টার মশায়ের বিছনা পেড়ে দিতে।
আগাগোড়াই অদ্ভুত ঠেকছিল মিহিরের, কিন্তু ত্রিশ টাকা–এক সঙ্গে ত্রিশ টাকা মাসের পয়লা তারিখে পাওয়াটাও কম বিস্ময়ের নয়। চিরকাল মাস গেলে টাকা দিয়েই সে এসেছে কলেজের টাকা, মেসের টাকা, খবরের কাগজওয়ালার টাকা; এই প্রথম সে মাস গেলে নিজে টাকা পাবে। এই অনির্বচনীয় বিশ্মীয়ের প্রত্যাশায় ছোটখাট বিস্ময়গুলো সে গা থেকে ঝেড়ে ফেলল।
সন্ধ্যার আগেই সে জিনিসপত্র নিয়ে ফিরল। বেশ ঘরখানি দিয়েছে তাকে–ভারি পছন্দ হল তার। এমন সাজানো গোছানে ঘরে এর আগে থাকেনি কখনো। একধারে একটা ড্রেসিং টেবিল–পুরনো হোক, বেশ পরিষ্কার। একটা ছোট বুককেসও আছে–তার বইগুলি সাজিয়ে রাখল তাতে। আর একধারে পড়াশুনার, টেবিল, তার দু ধারে দুটো চেয়ার–বুঝল, এই ঘরেই পড়াতে হবে মন্টুকে। সব চেয়ে সে চমৎকৃত হল নিজের বিছানাটা দেখে।
ঘরের একপাশে একখানা খাট, তাতেই তার শোবার বিছানা। চমৎকার গদি দেওয়া, তার উপরে তোশক, তার উপরে ধবধব করছে সদ্য পাটভাঙা বোম্বাই চাদর। ভারি ভদ্রলোক এরা,–না কেবল বললে অপমান করা হয় যথার্থই এরা মহৎ লোক।
