ভারি রাগ হয়ে গেল আমার। চেঁচিয়ে বললাম–ও তো ভালুক, আর তুমি কি? তুমি যে আস্ত একটা জাম্ববান।
ওকে একটু লজ্জা দেবার চেষ্টা করলাম, এ রকম না দিলে চলে না। শিক্ষিত লোককেও অনেক সময় শিক্ষা দেবার দরকার হয়। আমার অত্যুক্তি শুনে বোধ করি ভালুকটার আত্মগ্লানি হলো, কেননা সে আর উচ্চবাচ্য করল না। বেঁটেটা আর এক পা এগুতেই আমি,এয়ার-গান ছুঁড়লাম, ছররাট ওর পেটে গিয়ে গিয়ে লাগল। ও থমকে দাঁড়িয়ে পেটটা একবার চুলকে নিল, কিন্তু মোটেই দমল না; ধীরে পদে অগ্রসর হতে লাগল–বন্দুকের মুখেই।
দুঃসাহসী বটে! বাধ্য হয়ে এবার আমাকেই পশ্চাৎপদ হতে হলো। আবার, আবার সেই কামান গর্জ্জন। কিন্তু ও একটু করে গা চুলকোয় আর এগিয়ে আসে। গ্রাহ্যই করে না, যেন অনেক কালের গুলি খাবার অভ্যাস!
বুঝলাম খুব শক্ত শিকারের পাল্লায় পড়া গেছে, আমার বড়দার বরাতে যা জুটেছিল, ইনি মোটেই তেমন সন্তোষজনক হবেন না। হঠাৎ উনি একটা উদ্ভুত গর্জ্জন করলেন; ওটা বাংলায় কোনো
অব্যয় শব্দ কিংবা কোন অপভাষা কিনা মনে মনে এইরূপ আলোচনা করছি এবং যখন প্রায় সিদ্ধান্ত করে ফেলেছি যে ওই গর্জনের ভাষাটা বাংলা নয় বরং গ্রীক হলেও হতে পারে, সেই সময়ে ভালুকটা অভদ্রের মত দৌড়ে এসে অকস্মাৎ আমকে এক দারুণ চপেটাঘাত করল।
স-বন্দুক আমি বিশ হাত দূরে ছিটকে পড়লাম। জানোয়ারদের খাবার জন্য কি শোবার জন্য জানি না বিচালির গাদি স্থূপাকার করা ছিল, তার ওপরে পড়েছিলাম বলেই বাঁচোয়া। এক মুহূর্তর চিন্তাতেই বুঝলাম গতিক সুবিধের নয়। যে পালায় সেই কীর্তি রাখে এবং রাখতে পারে কেবল সেই বেঁচে যায়, এমন কথা নাকি শাস্ত্রে বলে। আজ যদি শাস্ত্রবাক্য রক্ষা করি, তাহলে কাল ফিরে এসে শিকার আবার করলেও করতে পারি। অতএব–
চড়-টা আমার পালানোর পক্ষে সাহায্যই করল, না হেঁটে, না হটে এবং না লাফিয়ে বিশ হাত এগিয়ে পড়া কম কথা নয়! উঠেই উদার পৃথিবীর দিকে চোচা দৌড় দিলাম। ভালুক বাবাজীবনও অমনি পিছু নিলেন–যেমন ওদের দুস্বভাব। অনুকরণ আর অনুসরণ করতে যে ওরা ভারি মজবুত, দাদার গল্প পড়েই তা আমার জানা ছিল।
পাহাড়ের যে দিকটায় আলোয়ার ভয়ে দিনেও লোকে পথ হাঁটে না, প্রাণভয়ে সেইদিকেই ছুটলাম। মাঝখানে একটা জায়গা এমন স্যাঁৎসেতে, সেখান দিয়ে যেতে কি রকম একটা গ্যাসে যেন দম আটকে আসে; জায়গাটা পেরিয়ে উঁচু একটা পাথরের ঢিবিতে দাঁড়িয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।
দৌড়তে দৌড়তে ভালুকটা সেই স্যাঁৎসেতে জায়গাটায় এসে পিছলে পড়ল। মিনিটখানেক পরে উঠতে গিয়ে আবার মুখ থুবড়ে গেল। হঠাৎ কি হলো ভালুকটার? বার বার চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুতেই যেন আর দাঁড়াতে পারে না।
আমিও সেই উঁচু ঢিবিটার ওপরে দাঁড়িয়ে–অনেকক্ষণ কেটে গেল। হঠাৎ দেখি ভালুকটা উঁচু হয়েছে, উঠেই দাঁড়িয়েছে, কিন্তু মাথার দিকে নয় লেজের দিকে! অবাক কাণ্ড! মাথার নীচের দিকে, লেজ ওপরের দিকে এ অবাক কি রে! এটা কি এখানেই সার্কাস শুরু করল নাকি!
আরো খানিকক্ষণ কাটল! ভালুকটা আরো একটু উঁচু হল। ভাল করে চোখ রগড়ে দেখি–ও দাদা, এ যে একেবারে মাটি ছেড়ে উঠে পড়েছে। দাঁড়িয়েই আছে বলতে হবে, যদিও তার মাথাই নীচে আর পা ওপরের দিকে। ভালুকটা দুহাত মাটি আঁকড়াবার প্রাণান্ত চেষ্টা করছে, কিন্তু তার আকাশে পদাঘাত করাই সার–কেননা পৃথিবী আর তার মধ্যে তখন দুহাত ফারাক। মাটির নাগাল পাওয়া মুশকিল!
খানিক বাদে ভালুকটা উড়তে শুরু করল। ভালুক উঁড়ছে এ কখনও কল্পনা করতে পার? কিন্তু আমার স্বচক্ষে দেখা। আমার হাত থেকে এয়ার গান খসে পড়ল। উড়তে উড়তে ভালুকটা এবার আমার মাথার কাছাকাছি পর্যন্ত এল–আমি বসে পড়ে আত্মরক্ষা করলাম। ও যে রকম হাত বাড়িয়েছিল,–ঠিক ডুবন্ত লোক যেভাবে কুটো ধরতে যায়,–আর একটু হলেই আমায় ধরে ফেলেছিল আর কি! ওর চোখে এক অসহায় সপ্রশ্ন ভাবটা যেন, হায়, আমার একি হলো। আমাকে ধরতে ওকে সাহায্য না করায়, ও যে আমার ওপর খুব বিরক্ত আর মর্মাহত হয়েছে, তা ওর মুখভাব দেখলেই বোঝা যায়।
লক্ষ্য করে দেখলাম ওর পেটটা ভয়ানক কেঁপে উঠেছে–চারটে জয়ঢাক এক করলে যা হয়। ঠিক যেন একটা রক্তমাংসের বেলুন। ভালুকটা ক্রমশঃই ওপরের দিকে যেতে লাগল–লেজ সর্বাগ্রে। দেখতে দেখতে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়ে অবশেষে বিন্দুমাত্রে পরিণত হলো, তারপর পলকে শূন্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
অমল ভ্রাতাজীবনের শিকার কাহিনী পাঠে বিজ্ঞানবিদ পাঠক হয়ত এই ব্যাখ্যা দেবেন যে বেচারা ভালুক সে স্যাঁতসেতে জায়গায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে, সেখানটায় প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রাদুর্ভাব ছিল; সেই উদরস্থ করার ফলেই বাবাজী বেলুনে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। আমার বিশ্বাস ওই ভালুকটা ছিল অতিরিক্ত পুণ্যাত্মা–কেননা সশরীরে স্বর্গারোহণের সৌভাগ্য খুব কম লোকেরই হয়। এভাবে মহাপ্রস্থানের পথে যাবার এ্যাকসিডেন্ড এ পর্যন্ত চারজনের মোটে হয়েছে, এই ভালুক–নন্দনকে ধরে; যাদের মধ্যে কেবল একজন মাত্র দুর্বিপাক কাটিয়ে কোন গতিকে স্বস্থানে ফিরতে পেরেছেন। প্রথম গেছলেন স্বয়ং যুধিষ্ঠির, দ্বিতীয়–তাঁরই সমভিব্যাহারি জনৈক কুকর শাবক, তৃতীয় আমার বন্ধু শ্ৰীযুক্ত প্রবোধকুমার সান্যাল, আর চতুর্থ–?
