ওর সহৃদয়তার প্রশ্রয় না দিয়ে গম্ভীরভাবেই জবাব দিই–না, এখন আর শিকার করবো না। সার্কাস দেখবার আগে এদের খতম করা নিশ্চয়ই ঠিক হবে না।
আড়াইটার শোরর টিকিট কেটে আমি আর দেবু ঢুকে পড়ি; আমার হাতে দেবুর এয়ার-গান, আর দেবুর হাতে আমার ক্যামেরা। স্থিরসংকল্প হয়েই ঢুকেছি, সার্কসের পরেই অব্যর্থ শিকার; কেননা অনেকে ভেবে দেখলাম, সাকার্স-এর সঙ্গে কারকাসই হচ্ছে একমাত্র মিল এবং খুব ভাল মিল। শিকারী জগতে ভয়ানক পিছিয়ে রয়েছি, অন্ততঃ আমার পিসতুতো দাদা এবং তার মাসতুততা বড়দার চেয়ে ত বটেই,–সেই অপবাদ আজ দূর করতে হবে।
প্রথমেই সেই মোটা ভালুক দুটোকে এরিনায় এনে হাজির করেছে। বেঁটেটাকে ওদের সঙ্গে দেবু একটু ক্ষুণ্ণ হলো,–সেই বাচ্চাটাকে আনবে না?
ওটা আস্ত জানোয়ারই আছে, এখনো মানুষ হয়ে ওঠেনি কিনা।
দেবু চুপ করে থাকে, বোধ করি ওর প্রাণের ভালুককে অমানুষ বলাতে মনে মনে দুঃখিত হয়। খানিক বাদে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে, হতভাগার জন্যে জাম এনেছিলাম।
আমি ওর দিকে আশ্চর্য হয়ে তাকাই–য়্যা? তোরও বুঝি ভালুক শিকারের মতলব? একরাশ ওই বিদঘুঁটে জাম খেয়ে কেউ বাঁচে কখনও? পেটে গেছে কি নির্ঘাৎ ধনুষ্টাংকার। তুই বুঝি জাম খাইয়ে কাজ সারতে চাস? দেবু উত্তর দেয় না। আমি আশ্বাস দিই–তা বেশ ত, এয়ার গানে ঐ জাম পুরে ছুঁড়লে নেহাৎ মন্দ হবে না। জাম খাওয়ানো–কে জাম খাওয়ানো, কাম ফতে–কে কাম ফতে।
দেবু সান্তনা পায় কিনা ও-ই জানে। দেখি ওর দুপকেট জামে ভর্তি। ইতিমধ্যে সেই মোটা ভালুক দুটো বাইসাকেলে চেপে এমন অদ্ভুত কসরৎ দেখাতে থাকে যা নিজের চোখে দেখলেও বিশ্বাস করা যায় না। ভালুকের ভাষা আলাদা না হলে এবং আলাপের সুবিধা থাকলে ওদের কাছ থেকে দুএকটা সাইকেলের প্যাঁচ শিখে নিলে নেহাৎ মন্দ হত না। সেটা সম্ভব কিনা মনে মনে চিন্তা করছি এমন সময়ে দেবু দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে–আমার সেজ মামা কি বলে জানিস অমল?
দেবুর সেজ মামা কি বলে জানবার আগ্রহ না থাকলেও জিজ্ঞাসা করি। বলে, যে সার্কাসে মানুষে ভালুকের খোলস গায়ে দিয়ে সেজে থাকে। সাইকেলের খেলা দেখে আমার তাই মনে হচ্ছে।
আমি প্রতিবাদ করি–পাগল। আমি কখনো কোনো মানুষকে এমন অদ্ভুত সাইকেল চালাতে দেখিনি, এ কেবল ভালুকের পক্ষেই সম্ভব।
দেবু ঘাড় নাড়ে–তা বটে।
আমি জোর দিয়ে বলি–নিশ্চয়ই তাই। শিক্ষালাভের ফলে কত কি হয় বইতে পড়িসনি? এ তো কিছুই না, আমি যদি ভালুকটাকে তারের ওপর সাইকেল চালাতে দেখি তাহলেও আশ্চর্য হব না।
এমন কি এখুনি যদি ওরা স্পষ্ট বাংলায় কথা কইতে শুরু করে দেয় তাহলেও না।
দেবু সায় দেয়–হু, তা বটে
কায়দা-কসরৎ দেখিয়ে ভালুকেরা চলে গেল। একটু পরে যখন হাতি চার পায়ে একটা পিপের পিঠে দাঁড়াবার দুশ্চেষ্টায় গলদঘর্ম হচ্ছে–আমি দেবুকে অপেক্ষা করতে বলে, অলক্ষ্যে ওদের অনুসরণ করলাম। দেখলাম এখন হাতির কসরতের ওপরেই সকলের যারপরনাই মনোযোগ, ভালুক শিকারের এই হচ্ছে সুযোগ।
সার্কাসের পেছন দিকে, একেবারে তাঁবুর শেষ প্রান্তে ভালুকের আস্তানা। দূর থেকে মনে হলো ভালুক দুটো যেন নিজেদের বাহাদুরির গল্প ফেঁদেছে। বেশ স্পষ্ট দেখলাম ধেড়ে-মোটাটা পিঠ চাপড়ে ছোট ভাইকে সাবাস দিচ্ছে। ওরা কী ভাষায় কথোপকথন করে জানবার কৌতূহল ছিল কিন্তু আমাকে দেখতে পাবামাত্র যেন একদম বোবা মেরে গেল।
আমি বললাম–কি হে ভায়ারা। বেশ তা আজ্ঞা চলছিল, থামলে কেন?
আমার কথা শুনে এ-ওর মুখের দিকে তাকাল। তার মানে–এই ছেলেটা কি বলছে হ্যাঁ? নিশ্চয়ই আমাদের বুলি ওদের বোধগম্য নয়। উঁহু, স্বদেশী ভালুক না; তবে কি উত্তর মেরুর? যাকে, পোলার বেয়ার বলে, তাই নাকি এরা? পোলার বেয়ার মারতে পারলে বড়দার চেয়ে বড় কীর্তি রাখতে পারব ভেবে মনে ভারি ফুর্তি হল। এয়ার-গানটা বাগিয়ে ধরলাম।
প্রথমে বাচ্চা থেকেই শুরু করা যাক, কিন্তু খাঁচার পাখি শিকার করে আরাম নেই। বেঁটে ভালুকটার খাঁচার দরজা খুলে দিলাম। বিপদ এবং মুক্তি এক কথা বিপন্মুক্তির সম্মুখীন হয়ে ও যেন প্রথমটা ভ্যাবাচকা খেয়ে গেল। কেননা অনেক ইতস্তত করে তবে সে খাঁচায় নীচে পা বাড়ালো।
এমন একটা অঘটন ঘটল। অকস্মাৎ দৈববাণী হলো–পালাও পালাও, মারাত্মক ভালুক।
চারিদিকে তাকালাম, কেউ কোথাও নেই, সার্কাসের লোকজন সার্কাস নিয়ে ব্যস্ত। তবে এ কার কণ্ঠধ্বনি? নিজের স্বৰ্গতোক্তি বলেও সন্দেহ করবার কারণ ছিল না। ভাল করে চেয়ে দেখি, ওমা, সেই মোটা ভালুকদেরই একজন হাত নাড়ছে আর ওই কথা বলছে।
আগেই আঁচ করা ছিল, তাই আর আশ্চর্য হলাম না। বাংলাভাষাও যে এরা আয়ত্ত করেছে, এই ধরণের একটা সন্দেহ আমার গোড়া থেকেই ছিল। শিক্ষিত ভালুকের পক্ষে একটা বিদেশী ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করা এমন আর বেশি কথা কি? ইতিমধ্যে সেই বেঁটে ভালুকটা দেখি আমার বন্দুকের রেঞ্জের মধ্যে এসে পড়েছে।
মোটা ভালুকটা আবার আওয়াজ ছেড়েছে–ওহে দেখছ না। ভালুক যে।
ভালুক যে, তা অনেকক্ষণ আগেই দেখেছি। ভালুক আমি খুব চিনি। চিনি এবং নিজেকেও চেনাতে জানি–আমি এবং আমার দাদা দুজনেই। কিন্তু এই মোটা ভালুকটার আহাম্মকি দেখ! একটু শিক্ষা পেটে পড়েছে কি আর অহঙ্কারের সীমা নেই অমনি নিজের জাত ভুলতে শুরু করেছেন। কোন কোন বাঙালি যেমন দুপাতা ইংরেজি পড়েই নিজেকে আর বাঙালি জ্ঞান করে না, একেবারে খাস ইংরেজ ভেবে বসে, ওরও তাই দশা হয়েছে। নিজেও যে উনি একটি নাথিং বাট ভাল্লুক, তা ওঁর খেয়াল নেই।
