কিন্তু চমৎকার সুযোগ মিলে গেল হঠাৎ। আমাদের পাহাড়ে দেশে সার্কাস–টার্কাস বড় একটা আসে না। সার্কাস দেখতে হলে আমরা কলকাতায় যাই বড়দিনে দাদার ওখানে। যাই হোক, এবার একটা সার্কাস এসে পড়েছে আমাদের অঞ্চলে। শুনলাম, অনেকগুলো ভালুকও এনেছে তারা। ভারী আনন্দ হল।
দেবুকে গিয়ে বললাম, এই, তোর বন্দুকটা দিবি দিন কতোর জন্যে?
কি করবি?
ভালুক শিকারের চেষ্টা দেখব।
আমার এটা তো এয়ার-গান, এতে কি ভালুক মরে? কেন অমল, তোর তো সেজকাকারই ভাল বন্দুক রয়েছে।
দুর, সেটা বেজায় ভারী। তোলাই দায়, ছোঁড়া তো পরের কথা। তাছাড়া আমি একটা গল্পে পড়েছি, ভারি বন্দুক ভালুক-শিকারের পক্ষে বড় সুবিধের নয়।
ও, তোর সেই দাদার গল্পটা? কিন্তু আমি যে এটা দিয়ে কাকমারি।
এট হল গিয়ে দেবুর স্রেফ গুল। বললে কাক মারি, কিন্তু আসলে ওই ও মাছি তাড়ায়। এয়ার গান থাকে ওর পড়ার টেবিলে, সেখানে কাকা একটাও নেই, কিন্তু যত রাজ্যের মাছি।
বেশ, আমি তোকে একটা জিনিস দেব, তাতে মারা না যাক কাক ধরা পড়বে।–দেবু উৎসুকচোখে তাকায়–আমার ক্যামেরাটা দেব তোকে ওর বদলে। কাকের ছবি ধরা আর কাক ধরা একই ব্যাপার নয় কি?
দেবু সে কথা মেনে নেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে উৎসাহিত হয়ে উঠে। আমার জাইস, আইকনের সঙ্গে ওর বন্দুকটা বিনিময় করে আমরা দুজনেই বেরিয়ে পড়ি সার্কাসের তাঁবুর উদ্দেশ্যে–ভালুক মারার মত্সব নিয়ে আমি, আর ভালুক ধরার উৎসাহ নিয়ে দেবু।
বাজারের কাছ দিয়ে যাবার দেবু এক গাদা কালো জাম কেনে। আমার দিকে, বোধ করি তার স্মরণশক্তির পরিচয় দেবার জন্যই, গর্বভরে তাকায়–জানিস, ভালুকেরা জাম খেতে ভাল বাসে?
হুঁ, জানি; কিন্তু যাকে শিকার করতে যাচ্ছি তাকে জাম খাওয়ানো আমি পছন্দ করি না–সাবাড়ের আগে খাবারের ব্যবস্থা একটা নিষ্ঠুর ব্যবহার নয় কি? আমার মতে ওটা দস্তুরমত অত্যাচার-ভালুকের প্রতি এবং নিজের পকেটের প্রতি। দেবুকে জবাব দিই, ভালুকের সঙ্গে ভাব করা তো মলব নেই আমার।
সার্কাসের তাঁবুর পেছন দিকটায় জানোয়ারের মিনেজারী–হাতি, ঘোড়া, বাঘ, সিংহ, ভালুক, জেব্রা–একটা উটও দেখলাম। খোটায় বাঁধা হাতি শুঁড় তুলে অপরিচিত লোককেও সেলাম ঠুকছে, জেব্রা এবং উটও কম দর্শক আকর্ষণ করেনি। কতকগুলো ছোঁড়া বাঘের খাঁচার দিকে গিয়ে ভিড়েছে, ওদের আফিং খাইয়ে রাখা হয় কিনা এই হলো ওদের আলোচ্য বিষয়। দেখা গেল, বাঘেরা মনোযোগ দিয়ে সেই গবেষণা শুনছে এবং মাঝে মাঝে হাই তুলে ওদের কথা সমর্থন করছে।
মোটের উপর সমস্তটা জড়িয়ে বেশ উপভোেদ্য ব্যাপার। কিন্তু এ সমস্ত থেকে কাঠোরভাবে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে ভালুকের খাঁচার দিকে আমার অগ্রসর হলাম।
পথে-ঘাটে সর্বদাই যাদের দেখা মেলে স্বভাবতঃই তাদের মর্যাদা কম; বেচারা ভালুকদের বরাতে তাই একটিও -য়্যাডমায়ারার- জোটেনি।
একটি বড় খাঁচার একধারে দুটো মোটাসোটা ভালুক–আর তার পাশেই পার্টিশান-করা অন্য ধারে একটা বেঁচে ভালুক। পার্টিশানের মাঝখানের দরজাটা বাইরে থেকে লাগানো। এতক্ষণ অবধি কোনো সমঝদার না পেয়ে মোটা ভালুক দুটো যেন মুষড়ে পড়েছিল, আমাদের দুজনকে যেতে দেখে নড়ে-চড়ে বসল। কিন্তু বেঁটে ভালুকটার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। বুঝলাম নিতান্ত উজবুক বলেই ওটাকে আলাদা করে রেখেছে।
দেবু পকেট থেকে একমুঠো জাম বার করল–তাই না দেখে বেঁটে ভালুকটার লম্ফঝম্ফ দেখে কে? কিন্তু আমরা প্রথমে দিলাম মোটা ভালুকদের, তারা দু-একটা চাখলো মাত্র, তারপর আর ছুঁলোও না। এই ভালুক দুটোর টেস্ট উঁচুদরের বলতে হবে, কেননা আমরাও রাস্তায় চেখে দেখেছি জামগুলো একেবারে অখাদ্য, এমন বিশ্রী জঘন্য জাম প্রায় দেখা যায় না।
কিন্তু বেঁটে ভালুকটা তা-ই অম্লানবদনে সবগুলো খেলো; খেয়ে আবার হাত বাড়ায়! দেবু দুপকেট উলটিয়ে জানায় যে হোপলেস আর আগ্রহের নিবৃত্তি হয় না। বুঝলাম ব্যাটার বুদ্ধিশক্তি একটু কম।
দেবু আমার কাছে আবেদন করে,–এই অমল, দে না তোর একটা চকোলেট একে।
আমি অগত্যা বিরক্তিভরে একটা চকোলেট ছুঁড়ে দিই–ভারি হ্যাংলা তো।
দেবু মাথা নেড়ে জানায়, ছেলেমানুষ কিনা। বড় হলে শুধরে যাবে।
কিন্তু ভালুকটা চকোলেট স্পর্শও করে না, জামের জন্য দেবুর জামার নাগাল পাবার চেষ্টা করে। আমি এয়ার-গানের সাহায্যে চকোলেটটা সন্তর্পণে বাগিয়ে এনে বদন ব্যাদান করতেই দেবু বাধা দেয়, খাস নে, সেপটিক হবে।
বাধ্য হলে চকোলেটটা মোটা ভালুকদের দান করতে হয়। যথার্থই ওদের টেস্ট উঁচুদরের। ওদের একজন ওটা সযত্নে কুড়িয়ে নেয়, নিয়ে সুকৌশলে রূপোলী কাগজের মোড়ক খুলে ফেলে চকোলেটটা বার করে, তারপর সমান দুভাগ করে দুজনে মুখে পুরে দেয়। ভালুকদের মধ্যে এরূপ সভ্যতা আর সাধুতা আমি কোনদিন আশা করিনি। একদম অবাক হয়ে যাই। এ রকম ন্যায়পরায়ণ আদর্শ ভালকুকে মারাটা সঙ্গত হবে কিনা এয়ার গান হাতে ভাবতে থাকি।
দেবু চমৎকৃত হয়–দেখছিস কি রকম শিক্ষিত ভালুক। তারপর একটু থেমে যোগ করে–শিক্ষিত প্রাণীদের শিকার করা কি উচিত? অবশেষে আমার মতামত না পেয়েই আপন মনে ঘাড় নাড়তে থাকে–একেই তো আমাদের দেশে শিক্ষিত লোকের সংখ্যা কম,….এই ভালুকটি গেলে স্থান কি আর পূর্ণ হবে?
