মাসীমা বলেন–কাল বিকেলে হাসপাতালে কে একটা উটমুখো এসেছিল না?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি তখন ছিলাম তো। কে এক রাজমিস্ত্রী না ছুতোরমিস্ত্রী!
সেই সর্বনেশের কাণ্ড দয়াখো! টেবিলের ওপর খোলা চিঠিটার দিকে দৃকপাত করেন মাসীমা–খুব বিরক্তিভরেই।
আগাপাশতলা পড়ে দেখি চিঠিটা বিহারের জনৈক মন্ত্রী লিখছেন–নামটা নাই করলাম–লিখেছেন অনেক কথাই। তিনি জানিয়েছেন যে, থার্মোমিটারের খাপের, যে কোনো নামী মেকারের যত দামী জিনিসই হোক না কেন, বগলে গলিয়ে দিলেই কিছু জ্বার-উত্তোলনের ক্ষমতা জন্মে না, বরং তাকে বগলদাবাই করাই এক বিড়ম্বনা। উপরন্তু আরো বিশেষ করে এই কথাও তিনি জানাতে চেয়েছেন যে, সবাই হচ্ছে চিকিৎসকের ধর্ম; যখন, যে সময়ে, যে অবস্থাতেই রোগার্ত আসুক না কেন, তাকে সুস্থ না করা পর্যন্ত ডাক্তার তটস্থ থাকবেন, তা সে রুগী ইতরই হোক, কি দ্রই হোক! গরীবই হোক, আর বড়লোকই হোক; সরকারী ভারী চাকুরেই হোক কি সে বেসরকারী ভবঘুরেই হোক;
তা ছাড়া আরো তিনি বলেছেন : আমরা–সরকারী কর্মচারীরা, তা মন্ত্রীই হই, কি ডাক্তারই হই; দারোগা হই; দারোগা হইয়া বা পাহারাওয়ালাই হই; ভুলেও যেন কখনো না মনে ভাবি যে, আমরাই জনসাধারণের মনিব। জনসাধারণেরই নিছক খাই, তাদের সেবার জন্যেই আছি, আমরা তাদের ভৃত্য মাত্র।
ইত্যাদি ইত্যাদি বহুবিধ সদুপদেশের পর তাঁর সার কথাটি আসে সর্বশেষে। নিজের দুরবস্থা তো তিনি স্বচক্ষেই কাল দেখে গেছেন হাসপাতালের আর সব রুগীরা কিভাবে আছে, তাদের দুর্দশা পর্যবেক্ষণ করতে আজ স্বয়ং তিনি সেই তিনিই আসবেন…ছদ্মবেশে নয় অবিশ্যি এবার–ভদ্রবেশে প্রকাশ্যরূপে!
ছুটি হাসপাতালে।
গিয়ে দেখি বিপর্যয় ব্যাপার! বেজায় হৈ হৈ, ভারী শশব্যস্ততা সবদিকে। প্রেসকৃপশন সব পালাটানো হচ্ছে, বদলানো হচ্ছে খাতা-পত্ৰ, রঙ-বেরঙের ভালো ভালো দাবাই পড়ছে রুগীদের শিশিতে। মিনিস্টার আসছেন হাসপাতাল পরিদর্শনে! বহুরূপী সেজে নয়–দস্তুরমত সরকারী কেতায়! অফিসিয়াল ভিজিট–যা তা না!
কাজেই, নিঃশ্বাস ফেলবার ফুরসৎ নেই মেলোমশায়ের। হাসপাতালের কায়েমী রুগীদের অনেক করে জপানো হচ্ছে চিকিৎসার কিরকম সুব্যবস্থা করা হয় এখানে ওদের। ঘণ্টায় ঘন্টায় কি সব সুপাচ্য ও সুপৃথ্য ওদের দেওয়া হয়। এই যেমন–আঙ্গুর-বেদনা, সাগু-মিছরি, দুধ-বার্লি, মাখন পাউরুটি, সূপ-সুরুয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।
অনাস্বাদিত তালিকা মুখস্থ করতে করতে হাঁপ ধরে যাচ্ছে, নাভিশ্বাস উঠছে বেচারাদের, মনে মনে তারা গাল পাড়ছে মিনিস্টারকে।
ওদের মধ্যে দু-একজন আবার হয়তো যুধিষ্ঠির সেজে বসেছে, তারা দাবি করেছে, শুধু শুধু মিথ্যেকথা বলা তাদের ধাতে পোষাবে না, উপরোক্ত খাদ্যখাদ্যগুলি বস্তুত যে কি চীজ, কেবল কানে শুনে সঠিক ধারণা করা যায় না, এমন কি চোখে দেখাও যথেষ্ট নয়, চোখে দেখার দরকার। ঐ তালিকা মনে রাখবার মতো মুখস্থ করতে হলে সত্যি সত্যিই ওদের মুখস্থ করে দেখতে হবে। তাদের সত্যবাদিতার পরাকাষ্ঠা বজায় রাখতে রান্নার তোড়জোড় করতে হয়েছে। নাজেহাল হয়ে পড়েছেন মেসোমসাই।
ডাক্তারখানায় তো এই দৃশ্য! সেখানে থেকে সটান ছুটি থানায়। সেখানে আবার কি দুর্ঘটনা, কে জানে।
গিয়ে দেখি পিসেমশাই তো মাথা হাত দিয়ে বসে পড়েছেন। তিনিও পেয়েছেন এক চিঠি।
চিঠির আসল মর্ম–আসল মর্ম তিনিই জানেন কেবল! কাউকে জানতে দিচ্ছেন না তিনি। দাবাবোডেরা তাঁর পাশেই গড়াগড়ি যাচ্ছে, তাঁর ভ্রূক্ষেপ নেই। আষাঢ়স্য প্রথম দিবসের মতই তার মুখ বেশ থমথমে। কার সাধ্য, তার কাছে ঘেঁসে! মনে হয় কে যেন মশাই! পিসে ফেলেছে আমার পিসেমশাইকে—আপাদমস্তক–একেবারে পা থেকে শিরোপা অব্দি।
ওধারে হাসপাতালে ভূমিকম্প দেখে এলাম, এখানে যা দেখছি, তাতে তো হৃঙ্কম্পের ধাক্কা!
পিসেমশায়ের এক দাবা, আর সেসোমশায়ের একমাত্র—দাবাই–এসে অবধি কেবল এই দেখছি এঁদের দুজনের। এই দিয়েই এতদিন এখানকার সবাইকে ওঁরা দাবিয়ে এসেছেন; কিন্তু আজ যেন ওঁরাই দাবিত–নিজের চালে নিজেরাই মাত হয়ে গেছেন কিরকমে! ওঁদের কাত দেখে আমারো ভারী রাগ হয়–কিন্তু কার ওপর যে বুঝতে পারি না সঠিক!
ভূমিকম্পেরই দেশ বটে বিহার! ছোটখাটো ভুমিকম্প যেখানে সেখানে যখন তখন লেগেই রয়েছে ও অঞ্চলে আজকাল!
ভালুকের স্বর্গলাভ
গল্প কেমন লিখি জানিনে, কিন্তু শিকারী হিসেবে যে নেহাৎ কম যাই না, এই বইয়ের আমার ভালুক শিকার, এই তোমরা তার পরিচয় পেয়েছে। আমার মাসতুতো বড়দাদাও যে কত বড় শিকারী, তাও তোমাদের আর অজানা নেই। এবার আমার মামাত ছোট ভাইয়ের একটা শিকার-কাহিনী তোমাদের বলব। পড়লেই বুঝতে পারবে, ইনিও নিতান্ত কম যান না। হবে না কেন, আমারই ছোট ভাই।
গল্পটা, যতদূর সম্ভব, তার নিজের ভাষাতেই বলবার চেষ্টা করা গেলঃ
ভালুকদের ওপর আমার বরাবর ঝোঁক, ছোটবেলা থেকেই। দাদুর ভালুক শিকারের গল্পটা শুনে অবধি, ভালুকদের ওপর আমার ছোটবেলার টানটা যেন হঠাৎ বেড়ে গেল। সর্বদাই মনে হয়, কোন ফাঁকে একটা ভালুক শিকার করি। কিন্তু শিকারের জন্য এয়ারগান পাওয়া সোজা হতে পারে (আমাদের দেবুই একটা আছে)–কিন্তু ভালুক যোগাড় করাই শক্ত। অবশ্য রাস্তায় প্রায়ই ভালুকওয়ালাদের দেখা পাওয়া যায় সেসব নিঃসন্ধিগ্ধ নৃত্যপটু ভালুকদের শিকার করাও অনেকটা সহজ, কিন্তু তাতে ভালুকদের আপত্তি না থাকলেও তাদের গার্জেনদের রাজি করানো যাবে কি না সন্দেহ।
