দেহাতী লোকটির দেহ হঠাৎ যেন কুঁকড়ে যায়। তার আর্তনাদে আমাদের আলোচনা ব্যাহত হয়। বাবুজী হম মর গিয়া!
মেসোমশাই চটেই যান–ক্যা হুয়া, হুয়া ক্যা?
বহুৎ শির দুখাতা, আউর পিঠমে ভি দরত—
আভি কেয়া? কল ফজিরমে আও! যো বখৎ হাসপাতাল খুলা রহতা–
নেই বাবুজি, মর যায়গা, গোড় লাগি। হামারা বোখার ভি আগয়ী–
কাকুতি-মিনতিতে মেশোমশাই ঈষৎ টলেন। থার্মোমিটারটা বার করেন; কিন্তু থার্মোমিটারের কাঠিটাকে খাপ থেকে বার করার কথা তিনি বিস্মৃত হন, খাপ-সমেত সমস্তটাই অবহেলাভরে দ্যান বেচারার বগলে ভরে।
তারপর সখাপ সেটাকে বগল থেকে বহিষ্কৃত করে সামনে এসে মনোযোগ সহকারে কি যেন পাঠ করেন। অতঃপর ওঁর মন্তব্য হয়–হুঁম বোঘর ভি হুয়া জারাসে!
প্রয়োজন ছিল না, তবু আমিও কিঞ্চিৎ ডাক্তারি বিদ্যা ফলাই–হুয়া বই কি! জারা লাগতি তো? জারা জারা?
মেসোমশাই ছাপানো ফর্মে খস খস করে দুলাইন ঝেড়ে দ্যান। ও প্রেসকৃপসন আমিও লিখে দিতে পারতুম! ব্যবস্থাপত্রের বাঁধা গৎ আমার জানা। আমার মনশ্চক্ষে ভেসে ওঠে ডিসপেনসিং রুমের প্রকাণ্ড কাঁচের জার এবং তার আভ্যন্তরীণ অদ্বিতীয় মহৌষধ যার রঙ কখনো লাল, কখনো বেগুনী, কখনো বা ফিকে জরদা। সর্দি-কাশি কি পেটব্যাথা, পিত্তশুল কি পিলে জ্বর, জরবিকার কি গলগণ্ড–যারই রুগী আসুক না কেন, সবারই সে এক দাবাই, সর্বজীবে সমদৃষ্টি সমদৃষ্টি মেলোমশায়ের, ভদ্রলোকে এক কথায় মত একমাত্র ব্যবস্থা।
পিঠে দারদওয়ালার বেলাও অবশ্য তার অন্যথা হয়নি, সেই একমাত্র ওষুধের একমাত্রা বা একাধিক নিশ্চয়ই তিনি বরাদ্দ করে দিয়েছেন– অকাতরেই। সে-বেচারা চিরকূট নিয়ে দাবাইখানার দিকে এগুতেই আমিও মেলোমশায়ের কাছ থেকে কেটে পড়ি। ডাক্তারি-বিদ্যা এক ধাক্কায় অনেকখানি হজম করা সহজ নয় আমার পক্ষে।
হাওয়া টাওয়া খেয়ে ফিরতে একটু রাতই হয়। পিসেমশায়ের নিকটে যাই–রাত্রের আহারটা তার আস্তানাতেই চলে কিনা! ইয়া ইয়া মাছ, মুরগী আর পাটা কোত্থেকে না কোত্থেকে প্রায় প্রত্যহই জুটে যায় পিসেমশায়ের পয়সা খরচ করে কিনতে হয় না। নৈশপর্বটা আমাদের জোরালো হয় স্বভাবতঃই।
থানায় পৌঁছেই দেখি, সেখানেও এসে জুটেছে সেই পাগড়ি-পরা লোকটা। আড়াই মাইল দুরে কোথায় তার আত্মীয়ের বাড়ি কি চুরি গেছে না কোন হাঙ্গামা হয়েছে তারই তদন্তে নিয়ে যেতে চায় পিসেমশাইকে। পিসেমশাই তাকে খুব বকেছেন, ধমকেছেন দাবড়ি দিয়েছেন হাজতে পোরাবার ভয় দেখিয়েছেন–কিন্তু লোকটা নাছোড়বান্দা, দারোগা দেখে সহজে রেগো হবার পাত্র না। পিসেমশাই রাত্রে এক পা নড়তে নারাজ, অগত্যা, সেই পাগড়ি পরা দশটা টাকা তার হাতে গুঁজে দিয়েছে, তখন তিনি কেসটা কেবল ডারেরীতে টুকে নিয়ে প্রস্তুত হয়েছেন। এখানে আসা অবধি বরাবর আমি লক্ষ্য করেছি, পিসেমশায়ের বামহাত দক্ষিণের জন্যে ভারি কাতর–বেশ একটু উদ্ব্যগ্র বললেই হয়–আর দক্ষিণহাত কি ইতর, কি ভদ্র–সবার প্রতি স্বভাবতঃই কেমন বাম–সবাইকে গলহস্ত দেবার জন্যে সর্বদাই যেন শশব্যস্ত হয়ে আছে।
ডায়েরী লেখা শুরু করেন পিসেমসাই। নামধাম জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁর প্রশ্ন হয়–কেয়া কাম করতে হো?
মন্ত্ৰীকা কাম।
কেয়া? মিস্ত্রীকা কাম? কনটাকে চাগিয়ে নেন পিসেমশাই।
নেহি নেহি, জি! মিস্ত্রী নেহি–মন্ত্রী!
সমঝ গিয়া! পিসেমশাই লিখে নেন তাঁর ডায়েরীতে। আমাকে বলেন–আমরা যাদের মিস্তির বলি এইসব দেহাতী লোকেরা তাদেরই মন্ত্রী বলে, বুঝেচিস? লেখাপড়া জানে না তো, অকাট মুখখু, আবার সমসকত করে বলা হচ্ছে?
মন্ত্রীকা কাম…।
তারপর পাগড়ি পরার দিকে ফেরেন?
সমঝ গিয়া! কেয়া মন্ত্রী? রাজমন্ত্রী, না ছুতোর-মন্ত্রী?
রাজমন্ত্রী! বিরক্ত হয়েই বুঝি জবাব দ্যায় পাগড়ি-পরা।
ওই যো-লোক দেশকো ইমারত বনা? বাঁশকো ভারা বাঁধতে মাথপর ইঁটকো বোঝা লোক উপর উঠতা–? পিসেমশাই প্রাঞ্জল ব্যাখা দ্বারা পরিষ্কাররূপে প্রাণিধান করতে চান।
জি হ্যাঁ,! বহুত ভারী বোঝা! সায় দ্যায় সে।
উসি ব্যাস্তে তুমারা শির দুখাতর? নেহি জি? আমি জিজ্ঞাসা করি। এতক্ষণে ওর দাবাইখানা যাবার কারণ আমি টের পাই।
পিঠমে ভির দরদ! সে বলে একটু মুচকি হেসে। উসি বাস্তে।
পিসেমশাই তার জেরা চালিয়ে যান–উঠনেকা বখ? কভি কভি গিরভি যাতা উলোক–ঐ রাজমন্ত্রী লোক? কেয়া নেহি?
ঠিক হ্যায়। পাগড়ি পরা ঘাড় নাড়ে।–কভি কভি।
বহুৎ ধ্বস্তাধস্তি, বিস্তর বাদানুবাদের পর ডায়েরী লেখা শেষ হয়! লোকটা চলে গেলে পিসেমশাই নোটখানা খুলে দ্যাখেন, পরীক্ষা করেন আসল কি জাল।
দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেন তিনি–না, আসলই বটে, তবে চোরাই কিনা কে জানে! কোনো মিনিস্টারের পকেট মেরে আনা নয় তো?
কি করে জানলেন? শার্লক হোমসের জুড়িদার বলে সন্দেহ হয় আমার পিসেমসাইকে।
ক্যাবিনেটেরে একজনের নামের মত নাম লেখা নোটের গায়ে। তবে নাও হতে পারে। এসব তো এধারের বাজার-চলতি চালু নাম, অনেক ব্যাটারই এমন আছে।
সকালবেলায় খাওয়াটা মেলোমশায়ের বাড়িতেই হয় আমার। রাত্রের গুরুভোজনের পর ঘুম থেকে উঠে পিসেমশায়ের সঙ্গে একচোট দাবা খেলে স্নান টান সেরে যেতে প্রায় বারোটাই বেজে যায়।
আজ গিয়ে দেখি মাসীমা বিচলিত ভারী। মেসোমশাই হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে সেই যে সাত সকালে হাসপাতালে গেছেন, ফেরেননি এখনো। কারণ জিজ্ঞাসা করি।
