সে খোস-গল্পের স্বয়ং আমি জড়িত, তা আমার ভালো লাগবার কথা নয়। আমি তেমন উৎসাহ দেখাই না; কিন্তু মেসোমশাইকে উৎসাহ দেখাতে হয় না।
যেন আমাদের দেখোস। কত বৈদ্য-হাকিম হদ্দ হয়ে গেল। কিন্তু সারিয়েছিল কে তোর সেই খোশ-পাঁচড়া? শুনি? এই শৰ্মাই! সবে তকন মেডিকেল কলেজ ঢুকেছি–তখনই। তুই মরিস খোসের জ্বালায়, আর আমার মরি খোশবুর জ্বালায়–!
খোশবু কি মেশোমশাই? অনুসন্ধিৎসু হতে হয়, জেনারেল নলেজের পরিধি বাড়াবার প্রায়স পাই।
তোর সেই খোস পচে গিয়ে কী গন্ধই না বেরিয়েছিল, বাপস! আমি যতই বোঝাই তোর মাকে যে আগে আম ডাসা থাকে, তারপর পাকে, তারপর পচে, তারপরে শুকোয়, তারপরেই তো হয় আমসি–তখনই হলো গিয়ে আমের আরাম! আমাশা সারাতেও সেই কথা। তোর মা ততই বলেন, ছেলেটাকে তুমিই সারালে সনাতন! আরো বাপ, বলল যে সারালে, তা না সারলে। আর সারলে কি এক হোলো? দুটো কি এক ক্রিয়াপদ? আকারের তফাৎ নেই দুজনের?।
তবে সারালো কিসে? এবার আর নিজের খোস গল্পে সাগ্রহে যোগ না দিয়ে পারি না।
সারলো যেমন করে যাবতীয় ঘা সারে–যেমন করে ডাক্তারী-মতে সরিয়ে থাকি আমরা। খোস পচে হলো শোষ, শোষ থেকে হলো কাবাঙ্কল–তারপরে সারলো, সহজেই সারলো, শুকিয়ে গিয়ে সেরে গেল শেষে। সারবেই, ও তো জানা কথা, কলেরা হলেই আমাশা সেরে যায়–সারছে না আমাশা–কলেরা করে দাও, তারপর তখন নুনজল দাও ঠেসে। হামেশাই এই করে সারাচ্ছি–আরে, চিকিচ্ছে কি চারটিখানি কথা? হয় এম্পার, নয় ওস্পার! ডাক্তারকে ধরে দুর্গা বলে ঝুলে পড়তে হয়।
তা বটে।
সারানোর পদ্ধতিই এই। বাতের কি কোনো চিকিচ্ছে আছে? মানে, সোজাসুজি চিকিছে? উঁহু! কেবল পক্ষাঘাত হলেই বাত সারে। তারপর পক্ষাঘাতের ওষুধ হলোগে ম্যালেরিয়া। জ্বরের যা কাঁপুনি বাপু, সাতখানা কম্বল চাপা দিলেও বাগ মানে না, লাফিয়ে ওঠে রোগী। আর যাঁহাতক লাফানো, তাঁহাতক পক্ষাঘাত–সারা!
কিন্তু ম্যালেরিয়া থেকে গেল যে?
পাগল! জ্বর সারাতে কতক্ষণ? দুশো গ্রেন কুইনিন ঠেসে দাও, একদিনেই দুশ্মে। তারপর আর দেখতে শুনতে হবে না–
কিন্তু ম্যালেরিয়া আবার সময়মত পাওয়া গেলে হয়! আমি সন্দেহ প্রকাশ করি।
আরে, ম্যালেরিয়ার আবার অভাব আছে এদেশে? এনোফিলিস তো চারধারেই কিলবিল করছে। ডাক্তারের চেয়ে তাদের সংখ্যা কি কিছু কম, তুই ভেবেছিস? তবু যদি বিহারের এ-অঞ্চলে নিতান্তই না মেলে, পক্ষাঘাতের রুগীকে আমি চেঞ্জে পাঠিয়ে দিই বর্ধমানে! আমার কাত হয়ে রুগী যে বাত সারিয়ে ফিরে এসেছে বর্ধমান থেকে! তবে–
অকস্মাৎ থেমে যান মেসোমশাই। তারপর কতিপয় হ্রস্ব-নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলেন–কতক আর ফেরেনি রে! তাদের শেষটা নিউমোনিয়া ধরে গেল কিনা!
ও! নিউমোনিয়া হলে বুঝি আর সারে না মেসোমশাই? আমার কৌতূহল হয়। না কি, টাইফয়েড হলে তবেই তা সারবার?
মেসোমশাই নিরুত্তর।
গোদ কিংবা গলগন্ড হলে সারে বুঝি?
মেসোমশাই মাথা নেড়ে বাধা দেন।
তবে কি–তবে কি–সর্দিগর্মিই হওয়া চাই?
উঁহই। হার্টফেল হলে তবেই সারে নিউমোনিয়া। বলেই মেসোমশাই গম্ভীর হয়ে যান বেজায়।
তাহলে তো মারাই গেল? গেল নাকি? আমার সংশয় ব্যক্ত হয়।
গেলই তো! মেসোমশাই কোপান্বিতি হন–যাবেই তো! যত সব আনাড়িকেষ্ট বর্ধমানের! কেন যে রুগীদের নিউমোনিয়া হতে দ্যায় ভেবেই পাই না। সারানো না যাক, নিউমোনিয়ার প্রতিষেধক ছিল তো!
ছিলো! প্রতিষেধক থাকতে বেচারা বেতো-রুগীরা মারা গেল অমন বেঘোরে? বলেন কি মেসোমশাই? আমি প্রায় লাফিয়ে উঠি। ছিলো প্রতিষেধক?
ছিলোই তো! ম্যালেরিয়া থেকে কালাজ্বর করে দিতে পারতো! কালাজ্বরের তো ভালো চিকিচ্ছেই রয়েছে। ইউরিয়া স্টিবামাইন! আমাদের উপেন ব্রহ্মচারীর বের করা। নেহাৎপক্ষে যক্ষ্মা তো ছিল–যক্ষ্মা হলে আর নিউমোনিয়া হয় না। হাতি যেখান দিয়ে যায়, ইঁদুর কি সে-ধার মাড়ায় রে? ঘোড়া যেখানে ঘাস খায়, বাছুর কি সে জায়গা ঘেঁসে কখনো?
আমি একটু হতাশ হয়েই পড়ি। কিন্তু যক্ষ্মা হলে আর কি হোলো! যক্ষ্ম কি সারে আর?
সারে না আবার! তেমন গা ঝেড়ে বসন্ত হয়ে গেলে যক্ষ্মা তো যক্ষ্মা, যক্ষ্মার বাবা অবদি সেরে যায়! পকসের জার্মের কাছে লাগে আবার যক্ষ্মার ব্যসিলি :!
বসন্ত! শুনে আরো দমে যাই আমি।-–বসন্ত কি ইচ্ছে করলেই হয় সবার?
আলবৎ হয়–হবে না কেন? মেসোমশাই বেশ জোরালো হয়ে ওঠেন–টিকে না নিলেও হবে। আর টিকে যদি নিয়েছে, তাহলে তো কথাই নেই।
সেই পাগড়ি-পরা লোকটি এতক্ষণ অস্ফুট কাতরোক্তি দিয়ে মেলোমশায়ের মনোযোগ আকর্ষণের দুশ্চেষ্টা করছিল, এবার যে অর্ধস্ফুট হয়ে ওঠে–বাবুজি!
মেসোমশাই কিন্তু কর্ণপাত করেন না–এসব তথ্য বুঝতে হলে ডাক্তার হওয়া লাগে। তাই তো ডাক্তার হতে বলছি তেকে। বলি যে, ডাক্তারি পড় বোকাঁচন্দর।
মেসোমশায়ের আদুরে ডাকে আমার রোমাঞ্চ হয়।
আমপনার চিকিচ্ছে তো খাসা মেসোমশাই, ওষুধ খর্চা হয় না! রোগ দিয়েই রোগ সারিয়ে দ্যান! যাকে বলে রোগারোগ্য, বাঃ!
বিলক্ষণ! ওষুধ দিয়েই তো সারাই বিনা ওষুধে কি সারে? কিন্তু ওষুধের কাজটা হোলো কি? আরেকটা ব্যামো দেহে ঢুকি য়ে তবেই না একটা সারানো। উকিলদের যেমন! আরেকটা মামলার পথ পরিষ্কার করে, তাহলেই তাদের একন্ন মেটে! আমাদের ডাক্তারদেরও তাই! ওষুধ দিয়ে আনকোরা একটা ব্যারামের আমদানি না করলে কি–
