কিন্তু এদের তো আমি চাই না…বোঝাতে যান বটকেষ্টবাবু–আমার নিজেরটিকেই চাই।
দারুণ ঘেউ ঘেউ শুনে এর মধ্যে আফিসের বড়কর্তা বেরিয়ে এসেছেন।
এখানে এত হট্টগোল কিসের? এসেই তিনি তম্বি করেন।
ইনি…এঁর কুকুর সব…নিয়ে যেতে বলছি এঁকে। ইনি নিচ্ছেন না কিছুতেই।
নিয়ে যান আপনার কুকুরদের। হুকুম দেন বড় কর্তা–দারোয়ান, ইন লোককো নিকাল দেও।–
দারোয়ানরা এসে দড়িসমেত কুকুরগুলো বটকেষ্ট জড়িয়ে দেয়–নিয়ে যান আপনার কুকুর মশাই। আপনি আমাদের চাকরি খাবেন দেখছি।
কুকুরের দলবলসহ বটকেষ্টকে তারা গলির মোড় অবধি পার করে দিয়ে আসে। তারপর, সদলবলে বটকেষ্ট চলে গেলে আসেন আরেক ভদ্রলোক।
হারানো—প্রাপ্তি–নিরুদ্দেশ বিভাগে আমি একটা বিজ্ঞাপন দিতে এসেছি।
দিন, বিজ্ঞাপন-বিভাগ থেকে তাঁকে বলা হয়–কিন্তু আমরা কুকুর- হারানো কোনো বিজ্ঞাপন নেব না। কুকুরের বিজ্ঞাপন একদম নেওয়া হয় না।
না না, কুকুর নয়। হারানোর বিজ্ঞাপনও না। আমি একটা ট্রামের মান্থলি টিকিট খুঁজে পেয়েছি। আজ বেলা সাড়ে বারোটার সময় ট্রামের মধ্যেই পড়েছিল মান্থলিটা।
বিশদ বিবরণ দিন। বিজ্ঞাপন-বিভাগের কর্মচারী কপি লিখে নিতে তৈরি হন।
মান্থলিটার খাপে G-H G-H মার্কা মারা…
জি-এইচ জি-এইচ? লাফিয়ে ওঠেন ঘনশ্যাম–ও তো আমার মান্থলি। আমার নাম ঘনশ্যাম ঘাই। তারই আদ্যাক্ষর জি-এইচ জি-এইচ।
তাই নাকি? বলুন তো আর কি ছিল সেই মান্থলির ভেতরে?
একশো টাকার দু-খানা নোট-মোট দুশো টাকা। কিছু খুচররাও থাকতে পারে। নোটের নম্বর দিতে পারি তবে তার জন্যে দয়া করে আমার বাড়িতে পায়ের ধুলো দিতে হবে একবার। আমার নোটবুকে টোকা আছে নম্বর।
তার দরকার নেই–এই নিন আপনার মান্থলি আর টাকাটা। বিজ্ঞাপন দেওয়ার খরচটা আমার বেঁচে গেল মশাই, তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ আপনাকেও। আমিও ঐ মান্থলির জন্যই বিজ্ঞাপন দিতে এসেছিলাম। আমার নাতি বলছিল যে বিজ্ঞাপন দিলে নাকি কাজ হয়। তা, দেখছি ব্যাপারটা সত্যি!
ভারী বুদ্ধিমান তো আপনার নাতি!
সে কথা বলতে। অমন ছেলে আর হয় না। তিনি গালভরা হাসি হাসেন– এমন কি বিজ্ঞাপন না দিয়েও কেবল দিতে এলেই কাজ হয় তাও দেখলাম।
বিহার মন্ত্রীর সান্ধ্য বিহার
সেবার পুজোর সেই বিহারেই যেতে হলো আবার।
ভূমিকম্পের পর থেকে বিহারের নাম করলেই আমার হৃৎঙ্কম্প হয়।
আর্থাকোয়েক আর হার্টফেল নোটিশ না দিয়েই এসে পড়ে, আর নিঃশ্বাস ফেলতে না ফেলতে কাজ সেরে চলে যায়।
তুমি হয়তো বলবে, ও-দুটোরই দরকার আছে। প্রাচীণ বাড়ি-ঘর যেমন শহরের বুকে কদর্যতা, তেমনি সেকেলে শহর-টহর পৃথিবীর পিঠে আর্বজনা–ভূপৃষ্ঠ থেকে ওরা কি সহজে সরতে ভূমিকম্প না থাকলে? এতো আর এক আধখানা পুরানো ইমারত নয় যে, মেরামত করে টরে বদলে ফেলবে? একে তো সারিরে সরানো যায় না, সরিয়ে সারাতে হয়–আর ভেঙ্গে গড়বার জন্য শহরকে–শহর সরিয়ে ফেলা কি চারটিখানি কথা?
তারপর হার্টফেল হ্যাঁ–ওটাও সেকেলে লোকদের জন্যই, তুমি বলবে। নিজের হৃদয়ের কাছে হেলাফেলা না পেলে বুড়ো মানুষরা কি মরতে চাইতো সহজে? আধমরা হয়েও আধাখাচরা জীবনকে আঁকড়ে ধরে থাকতো–বলবে তুমি।
তুমি তো বলেই খালাস, কিন্তু আমি যে নিজেকে যথেষ্ট সেকেলে মনে করতে পারছিনে, নতুবা বিহারে পা বাড়াতে আর কি আপত্তি ছিল আমার? হৃৎকম্প থেকে হৃঝম্প একটার থেকে আরেকটার কতখানি বা দুরত্ব?
যাক–সেই বিহারেই যেতে হলো বেড়াতে।
গেছলাম যেখানে, জায়গাটার নাম করব না, আমার পিশেমশাই সেখানে দারোগা আর হাসপাতালে ডাক্তার হচ্ছেন সাক্ষাৎ আমার মেসোমশাই।
দারোগার দোর্দন্ড প্রতাপে যারা রোগা হয়ে পড়ে, অচিরাৎ ডাক্তারের কবলে তাদের আসতে হয়; কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে তারা কোথায় যায়, ডাকঘরে খবর নিয়েও তার হদিশ মেলে না। অর্থাৎ তারা একেবারে সুদূরপরাহত হয়ে যায়। রোগী আর রোগ দুজনকেই যুগপৎ আরোগ্য করার দিকে কেমন যেন একটা গো আছে মেলোমশায়ের।
পই পই করে বলে দিয়েছিলেন মা-মরে গেলেও ওষুধ খাসনে। হাজার অসুখ করলেও মেলোমশায়ের কাছে যাসনে।
আর পিসেমশাই? তার কাছে গেছি কি, অমনি তিনি ছাতুখোর পাহারাওয়ালাদের দিয়ে আমাকে পিসে ফেলে আরেক প্রস্থ ছাতু বানিয়ে থানায় পুরে রাখবেন আমায়, কিন্তু এসে দেখলাম। যতটা ভয় করা গেছল, ততটা না; তেমন মারাত্মক কিছু না। মেশোমশায়ের তো মায়ার শরীর, রোগযন্ত্রনা রুগীর যদি বা সয়, ওঁর আদপেই সহ্য হয় না, রোগের যাতনা লঘু করতে গিয়ে রুগীকেই লাঘব করে ফেলেন তিনি–আর পিশেমশাই? সারা পৃথিবীটাই তার কাছে মায়া! দুনিয়াটাই জেলখানা তাঁর কাছে। তাই দুনিয়াটাকেই জেলখানায় পুরতে পারলে তিনি বাঁচেন।
তবে আমার অন্তত ভয়ের কিছু ছিল না কোনো পক্ষ থেকেই। আমার প্রতি ভয়ানক অমায়িক ওরাঁ দুজনেই। দু-একদিনেই ভুব ভাব জমে গেল আমাদের।
একদা পড়ন্ত বিকেলে হাসপাতালের ডাক্তারখানায় বসে মেসোমশায়ের সঙ্গে খোস গল্প করছি, এমন সময় এক খোট্টই মার্কা রুগী আস্তে আস্তে এসে হাজির হোলো সেখানে। দেখলেই বোঝা যায়, দেহাতী লোক, যন্ত্রনাবিকৃত মুখ। এসেই বিরাট সেলাম ঠুকলো মেসোমশাইকে।
মেশোমশাই তাকে আমলই দিলেন না। তোর মনে থাকবার কথা না তুই আর তখন কতটুকু! তবে তোর মাকে জিজ্ঞেস করিস। অনেকরকম খোস দেখেছি, সারিয়েছিও, কিন্তু সে কি খোস রে বাবা–!
