আপনার টনসিল ঢাকা একটা কিছু রয়েছে তো তবু। বলে ভদ্রলোক উঠে জানলার পাল্লাটা নামিয়ে দিলেন আবার যাক, আমি কোন তর্কের মধ্যে যেতে চাইনে। নিজে সতর্ক থাকতে চাই।
হর্ষবর্ধনও উঠে তুলে দিলেন পাল্লাটা-গরমে আমার দম আটকে আসে। বন্ধ হওয়ায় স্বাস্থ্য খারাপ হয়। চারদিক বন্ধ করে দূষিত আবহাওয়ার মধ্যে আমি মোটেই থাকতে পারিনে।
আপনি কি আমাকে খুন করতে চান নাকি? ভদ্রলোক উঠে খুলে ফেললেন ফের পাল্লা–ঠাণ্ডা লেগে আমার সর্দি থেকে কাশি, কাশি থেকে গয়া–আই মীন; টাইফয়েড, তার থেকে নিমোনিয়া…!
তার থেকে পঞ্চত্বপ্রাপ্তি। ওপরের বার্থ থেকে জুড়ে দেয় গোবর্ধন। ব্যঙ্গের সূরেই বলতে কি!
তাই হোক আমার। তাই আপনি চান নাকি? আপনি তো বেশ লোক মশাই! বলে তিনি পাল্লাটা দিলেন জানলার।
আর আপনি কী চান শুনি? দূষিত বদ্ধ আবহাওয়ায় আমার হেঁচকি উঠুক, হাঁপানি হোক, যক্ষ্মা হোক, টি-বি হোক, ক্যানসার হোক, নাড়ি ছেড়ে যাক, দম আটকে মারা যাই আমি, তাই আপনি চান নাকি?
হর্ষবর্ধন উঠে পাল্লাটা তোলেন আবার।
এইভাবে চলল দুজনের….পালা করে পাল্লা ভোলা আর নামানো….পাল্লা দিয়ে চলল দু জনার। করতে করতে এসে পড়ল খড়গপুর।
বম্বে এক্সপ্রেস গার্ড থামতেই হর্ষবর্ধন তেড়ে-ফুড়ে নামলেন কামরার থেকে যাচ্ছি আমি গার্ড সাহেবের কাছে। আপনার নামে কমপ্লেন করতে চললাম।
আমিও যাচ্ছি। তিনিও নামলেন সঙ্গে সঙ্গে।
আমিও নামলাম ওঁদের পিছু পিছু। কেবল গোবরা রইল কামরায় মালপত্র সামলাতে।
গার্ড সাহেব দু-পক্ষেরই অভিযোগ শোনেন। শুনে মাথা নাড়ে গম্ভীরভাবে –এতো, ভারী মুস্কিল ব্যাপার দেখছি। শার্সি তুললে আপনার স্বাস্থ্যহানি হয়, আর শার্সি নামলে আপনার? তাই তো? ভারি মুস্কিল তো! চলুন দেখিগে…।
কোন কামরাটা বলুন তো আপনাদের?… বলতে বলতে তিনি এখোন ঐ ফার্স্ট ক্লাস কামরাটা বলছেন? জানলাটা এখন বন্ধ রয়েছে, না, ভোলা আছে?
আমি নামিয়ে দিয়ে এসেছি পাল্লাটা সেই ভদ্রলোক জানান।
ওটার শাসিটা তো ভাঙা বলেই জানতাম, ওর পাল্লার কাঁচটা তো বসানো হয়নি এখনো। যতদুর আমার মনে পড়ে আপনি বলছেন, কাঁচের পাল্লাটা নামিয়ে দিয়ে এসেছেন? কিন্তু কে যেন মুখ বাড়াচ্ছে না। জানলা দিয়ে?
আমার ভাই গোবর্ধন। হর্ষবর্ধন জানান।
পাল্লার কাঁচটা ভাঙাই রয়েছে তাহলে। নইলে ছেলেটা শার্সির ভেতরে দিয়ে মুখি বাড়ায় কি করে? যান, যান উঠে পড়ন চট করে। এক্ষুনি গাড়ি ছেড়ে দেবে….টাইম ইজ আপ….।
বলতে বলতে গার্ড সাহেবের নিশান নড়ে, গাড়ি ছাড়ার ঘন্টা পড়ে। আর হর্ষবর্ধন কামরায় এসে গোবরাকে নিয়ে পড়েন।
তোর কি সব তাতে মাথা না গলালে চলে না? কি আক্কেল তোর বল দেখি? কে বলেছিল–কে? সমস্ত চোটটা তার ওপরই গিয়ে পড়ে তখন। এমন তিনি বিগড়ে যান যে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দেন গোবরাকে।
কাঁচের ভেতর দিয়ে মাথা গলানো। সত্যি, এমন কাঁচা কাজ করে মানুষ। আমিও গোবরাকে না দুয়ে পারি না।
বিজ্ঞাপনে কাজ দেয়
টুসিকে নিয়ে আবার মুশকিল হয়েছে ঘনশ্যামবাবুর। রবিবার দিন আফিসের তাড়া নেই, তাই একটু দেরি করে ওঠেন তিনি। সেদিনও সাতটা বাজিয়ে উঠেছেন; উঠে দেখেন টুসির কোন পাত্তা নেই। যা সন্দেহ করেছিলেন তাই, পকেট হাতড়ে দেখলেন ট্রামের মান্থলিখানাও হাওয়া।
ছুটির দিনে ভোরে উঠেই হাওয়া খেতে বেরিয়েছে টুসি।
ফিরল বারোটা বাজিয়ে–প্রায় একটার কাছাকাছি।
ছিলি কোথায় এতক্ষণ? আমার মান্থলি নিয়ে বেরিয়েছিস? কতদিন বলেছি এটা বে-আইন; তাছাড়া মান্থলির মধ্যে আমার…
বন্ধুদের বাড়ি বেড়াতে গেছলাম। সাড়ে দশটার শো-এ সিনেমা দেখে ফিরছি… জানালো টুসিঃ বুঝলে দাদু, ছবিটায় কি মারামারি কাটাকাটি… উঃ, কি মারামারি যে কী বলব।
বুঝেছি। কিন্তু মান্থলির খাপের ভেতর দুশো কত টাকা ছিল না?
দুশো সাত টাকা ছিল যেন। কিন্তু এখন আর তা নেই। আমরা বন্ধু মিলে সিনেমা দেখলাম? আর এতক্ষণ অব্দি না কিছু খেয়ে থাকা যায়? রেস্তোরাঁয় খেতেও হলো। বেশি খাই নি দাদু, একখানা করে মোগলাই পরোটা আর প্লেট করে কষা কারি।
কেতাত্থ করেছে! এখন দাওতো আমার মান্থলি আর দুশো টাকা!
পকেটে হাত দিয়ে টুসি আঁতকে ওঠে–ওমা, কোথায় গেল মান্থলিটা। এ পকেট ও পকেট হাতড়ায়। প্যান্টের পকেট পর্যন্ত।
নাঃ, হাফ প্যান্টের পকেটেও তো নেই। নিশ্চয় পড়ে গেছে কোথাও। ট্রামেই পড়েছে নিশ্চয়।
দুখানা একশো টাকার নোট ছিল যে রে। আর খুচরো সাত টাকা।
সাত টাকা আর নেই, বলেছি তো।
দুশো টাকাই রয়েছে যেন। রাগে উথলাতে থাকেন ঘনশ্যাম,–পড়ে গেছে না হাতি! বন্ধুদের কেউ হাতিয়ে নিয়েছে নিশ্চয়। যা সব বন্ধু! নয় তো কেউ পকেট মেরেছে নির্ঘাত।
আমার বন্ধুরা তেমন নয়–টুসির প্রতিবাদ–তারাও আমায় খাওয়ায়, সিনেমা দেখায়, তাই আমিও তাদের দেখালুম। আর আমার পকেট মারবে এমন কেউ জন্মায় নি এই কলকাতায়।
তুই নিজেই ত পকেটমার। আমার পকেট সাফ করাই তো তোর কাজ। বদ ছেলেদের পাল্লায় পড়ে দিনকে দিন উচ্ছন্নে যাচ্ছিস। তোকে আমি ত্যজ্যপুত্র করব।
ত্যজ্যপুত্র কি করে হবে দাদু? আমি তো তোমার পুত্র নই।
ত্যজ্যনাতি করে দেব তোকে।
ত্যজ্যনাতিও হয় না দাদু। শুনি নি কোনকালে।
