সেই যে ডি এল রায়ের হাসির গানে আছে না?
রাজা গেলেন…
দিল্লী কিংবা বম্বে নয়,
মাদ্রাজ কিংবা ব্ৰম্ভে নয়,
ট্রেনে নয় প্লেনে নয়,
রেল কি স্টীমার চেপে
রাজা গেলেন ক্ষেপে।
অনেকটা সেই রকমরেই ব্যাপার হলো যেন!
জীবনে হাজার মানুষের হাজারো রকমের পাল্লা কাটিয়ে এসে শেষটার কিনা সামান্য এক জানলার পাল্লায় পড়লেন হর্ষবর্ধন!
আর সেই এক পাল্লাতেই তার এমন দিলদরিয়া মেজাজ খিঁচড়ে গেল।
হর্ষবর্ধন, গোবর্ধন আর আমি তিনজনেই দুর পাল্লার যাত্রী। একটা ফাস্ট ক্লাস কামরার তিনটে বার্থ রিজার্ভ করে পাটনা যাচ্ছি আমরা সন্ধ্যেয় চেপেছি হাওড়ায়, সকালে পৌঁছোবো পাটনা স্টেশনে।
ওপরের দুটো বার্থে গোবরা আর আমি। তলাকার একটা বার্থে হর্ষবর্ধন। তলার অপর বার্থটায় ছিলেন অন্য এক ভদ্রলোক, কোথায় যাচ্ছেন কে জানে!
হর্ষবর্ধন পাটনায় তাঁর কারখানায় কাঠের কারবারের একটা শাখা খুলতে যাচ্ছিলেন, আমাকে এসে ধরলেন–চলুন। আপনি আমার দোকানের দ্বার উদঘাটন করবেন।
আমি কেন? ও-সব কাজ তো মন্ত্রীরাই করেন মশাই। পাটনায় কী কোন মন্ত্রী পাওয়া যায় না? আমি একটু অবাক হই, কেন, সেখানে কি মন্ত্রীর পাট নেই?
সত্যি বলতে এসব কাণ্ড-কারখানার মধ্যে যেতে আদৌ আমার উৎসাহ হয় না। উদঘাটন, উন্মোচন, ফিতে-কাটা এগুলোকে আমি মন্ত্রীদের অভিনয়ে পার্ট বলেই জানি।
থাকবে না কেন? বললেন তিনি, তবে তাদের কারো সঙ্গে আমার তেমন দহরম নেই–একদম নেই।
একদমে কথাটা শেষ করে নবোদ্যমে তিনি পরের খবরটি জানালেন। তাছাড়া, জানেন কি মশাই…দাদার কথায় বাধা দিয়ে গোন ফোড়ন কাটল মাঝখান থেকে–তাছাড়া, আপনিই বা মন্ত্রীর চেয়ে কম কিসে বলুন? দাদার মুখ্যমন্ত্রী আপনিই তো! দাদাকে যত কুমন্ত্রণা আপনি ছাড়া কে দেয় আর?
তাছাড়া, আরেকটা কথা, হর্ষবর্ধন তাঁর কথাটা শেষ করেন কলকাতায় তো এখন ছানা কন্টোল হয়ে মিষ্টি-ফিষ্টি একেবারে নেই! এখানকার কারিগররা গেছে কোথায় জানেন? সবাই সেই পাটনায় গিয়ে সন্দেশ বানাচ্ছে! কলকাতার মেঠাই সব সেখানে। নতুনগুড়ের সন্দেশ যদি খেতে চান তো চলুন পাটানায়।
নতুন গুড়ের এই নিগূড় সন্দেশ লাভের পর পাটনায় আর কোন বাধা রইল না তারপর।
বম্বে এক্সপ্রেস অন্ধকারের ভেতর দিয়ে ঘটাংঘটের ঘটঘটা তুলে ছুটে চলছিলো….
তলার সেই অপর বার্থটির ভদ্রলোক উঠে জানলার পাল্লাটা নামিয়ে দিলেন হঠাৎ।
হর্ষবর্ধন বললেন, একি হলো মশাই! জানালাটা বন্ধ করলেন কেন? মুক্ত বাতাস আসছিল বেশ।
ঠাণ্ডা আসছে কিনা। বললেন সেই ভদ্রলোক।
ঠাণ্ডা! ওপরের বার্থ থেকেই যেন ধপাস করে পড়লেন হর্ষবর্ধন, তাঁর নিচেকার বার্থে শুয়ে থেকেই।ঠাণ্ডা এখন কোথায় মশাই! সবে এই অঘ্রাণ মাস! শীত পড়েছে নাকি এখনই? উঠে জানলার পাল্লাটা তুলে দিয়ে প্রাণভরে যেন তিনি অঘ্রাণের ঘ্রাণ নিলেন–আহা! কী মিষ্টি হাওয়া।
রীতিমতন হাড় কাঁপানো হাওয়া মশাই! জবাব দিলেন সেই ভদ্রলোক। তারপরই জানলাটা ফের নামিয়ে দিলেন তক্ষুনি।
হাড় কাঁপানো হাওয়া! দেখছেন না, আমি ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি গায়ে দিয়েছি! বলে হর্ষবর্ধন জানলাটা তুলে দিলেন আবার।
ফিনফিনে তো দেখছি ওপরে। কিন্তু তার তালায়? শুধোলেন সেই অচেনা লোকটি, ফিনিফিনের তলায় তো বেশ পুরু কোট এঁটেছেন একখানা, তার তলায় আবার একটা অলেষ্টারও দেখছি….
আজ্ঞে এবার আমাকেই প্রতিবাদ জানাতে হয়–আজ্ঞে ওটা ওঁর কোট নয়, গায়ের মাংস! বেশ মাংসল দেহ দেখছেন না ওঁর? আর যেটাকে আপনি অলেষ্টার বলে ভ্রম করছেন সেটা আসলে ওঁর ভুড়ি….।
ওই হলো মাংসের কোটিং তো, তা সেটা কোটের চেয়ে কম না কি? ওতেও গা বেশ গরম থাকে? কোটের মতই গরম রাখে গা। হাড়ে তো ঠাণ্ডা হাওয়া লাগতে পায় না। আমার এই হাড় জিরজিরে শরীরে অলেষ্টার চাপিয়েও ঠাণ্ডার শিরশির করছে হাত পা! বলতে বলতে সত্যিই যেন তিনি শিহরিত হতে লাগলেন শীতে; তারপর আমার মাফলারটাও আনতে ভুলে গেছি আবার! আমার টনসিলের দোষ আছে জানেন? গলায় যদি একটু ঠাণ্ডা লাগে তো আর রক্ষে নেই।
মুক্ত বাতাস দারুণ স্বাস্থ্যকর। তাতে কখনো টনসিল বাড়ে না। হর্ষবর্ধন জানান–বাড়তে পারে না। বলে পাল্লাটা গভীরভাবে তুলে দেন আবার।
আপনার বাড়ে না। কিন্তু আমার বাড়ে। আপনার কি, গলায় তো বেশ মোটা একটা কমফর্টার জড়িয়ে রয়েছেন!
আপনার গলায় কমফর্টার? হর্ষবর্ধন ঊর্ধ্বনেত্রে আমাকেই যেন সাক্ষী মানতে চান।
না মশাই! গলায় ওঁর কোনো কমফর্টার নেই। বাধ্য হয়ে বলতে হয় আমায়।
আপনার টনসিলের দোষ বলছেন, কিন্তু চোখেরও বেশ একটু দোষ আছে দেখছি। ওঁর গলায় পুরু মতন ওটা যা দেখছেন, ওকে কী বলা যায় আমি জানিনে। গরুর হলে গলায় পুরু মতন ওটা যা দেখছেন, ওকে কী বলা যায় আমি জানিনে। গরুর হলে গলকম্বল বলা যেত, কিন্তু ওঁকে তো গোরু বলা যায় না বলে হর্ষবর্ধনকে একটু কমফর্ট দিই। ওঁর ক্ষেত্রে ওটাকে গলার ভুড়িই বলতে হয় বাধ্য হয়ে, কিংবা ভুরি ভুরি গলাও বলতে পারেন।
গলায় কেউ কম্বল জড়ায় নাকি? হর্ষবর্ধন আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টি হানেন এবার গরুরাই গলায় কম্বল জড়ায়।
সেই কথাই তো বলেছি আমি। কৈফিয়তের সুরে জানাই, গরুর হলে ওটা গলকম্বল হত। আপনার বেলা নয়। তাই তো আমি বলছিলাম ওনাকে।
