চটেমটেই চলে আসি–সেদিনকার মতো ওকে মার্জনা করে দিয়ে।
আসবার সময় সে রহস্যময় হাসি হেসে বলে–জানতে পাবে, ক্ৰমশঃই জানতে পাবে। অচিরেই প্রকাশ হবে সব। ভগবান যখন ফাটেন, বোমার মতোই ফাটেন! যেমনি অবাক করা তাঁর কাণ্ড তেমনি কান ফাটানো তার আওয়াজ! না দেখার, না শোনার মত কি! কতজনকে যে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে যান তার পাত্তাই পাওয়া যায় না। ভগবানের মুখে যে পড়েছে তার কি আর রক্ষে আছে ভাই?
দিনকতক পরে যথেষ্ট ইচ্ছাশক্তি সঞ্চয় করে আবার যাই বকুর কাছে। দৃঢ়সংকল্প হয়েই যাই, এবার বলা নেই কওয়া নেই, সোজা গিয়েই ওকে চাটাতে শুরু করে দেব, তা যাই থাক বরাতে–ভক্তবৃন্দই এসে বাধা দিক কি মাঝখানে পড়ন। কারুর কথা শুনছি না!
কিন্তু যাবার মুখে দোরগোড়াতেই প্রথম ধাক্কা। দেখি বকুর সাইনবোর্ড বদলেছে, শ্রীমৎ বক্কেশ্বর পরমহংসের বিনিময়ে স্রেফ স্বামী বক্কানন্দ! আমার মনে আঘাত লাগে, ভাল হোক মন্দ হোক বকু আমার বন্ধুই–বিনা হাফপ্যান্ট এবং হাফপ্যান্টের সময় থেকেই। ধনরত্ন কিছুই ওকে দিতে পারিনি, কেবল মান–মাত্র দান করেছিলাম, তাও অভিমান বশে সে প্রত্যাখ্যান করল।
অভিমানবশে কি ক্রোধভরে, কে জানে। আমি ওকে আড়ালে ডেকে নিয়ে অনুযোগের সুর তুলতেই ও বলে, আর ভাই, বোলো না! পাড়ার চ্যাঙড়াদের জ্বালায় পাল্টাতে হোলে! পরমহংসের জায়গায় কেবল পরমবক বসিয়ে দিয়ে যায়। চক দিয়ে, কালি দিয়ে, উড পেন্সিল নিয়েই–যা পায় তাই। কাঁহাতক আর ধোয়া মোছা করি? আর যদি দিনরাত কেবল নিজের নাম দিয়েই পাগল হব, ভগবানকে তাহলে ডাকব কখনও কাল আবার আলকাতরা দিয়ে লিখে গেছে–সে লেখা কি ছাই সহজে ওঠে? ভারী খিটকাল গেছে কাল; তারপরই ভাবলাম ধুত্তোর নাম। নাম নিয়ে কি ধুয়ে খাবো? রোজ রোজ নাম ধুয়ে খেতে হবে? বদলে ফেললুম নাম। তা বক্কানন্দ! এমন মন্দই বা কি হয়েছে?
শ্রীমৎ বক্কেশ্বর পরম্বক? আমি বলি, তাই বা এমনকি খারাপ হতো? ছেলেরা তো তোমার ভালই করছিল। বক্কানন্দের চেয়ে ভালই ছিল বরং।
বারে! তুমিও আবার বক বক করছ! বক যে একটা গালাগাল! বকু বলে– দারুণ গলাগাল যে! হংসমধ্যে বাকো কথা, পড়নি বইয়ে?
ধার্মিক মানুষদের তো বকের সঙ্গেই তুলনা করে। বলে বক ধার্মিক। বক কি যা তা? বকের পক্ষে আমি দাঁড়াই–হাঁসের চেয়েও বক ভাল এমন কি প্যাঁচার চেয়েও।
তোমার কাছে ভাল হতে পারে বকু এবার চলে, আমার কাছে নয়। তোমার ইচ্ছা হয়, বকের মাদুলি বানিয়ে গলায় বোলাওগে। আমি কিন্তু বক দেখলেই মুছে ফেলব, মেরেই বসব একেবারে! কেউ যদি একবার আমাকে বক দেখায়। যদি হাতের নাগালে পাই কাউকে। বকু গজরাতে থাকে।
তা যাকগে। আমি ওকে ঠাণ্ডা করি, ব্যাকরণ থেকে বের করা ছিল কিনা নামটা, তাই বলছিলাম–!
বাঃ, এতেও তো ব্যাকরণ বজায় আছে। বিলক্ষণ! বকু ছিল আনন্দ কিংবা বন্ধু পেল আনন্দ অথবা বকুর হল আনন্দ ইতি বক্কানন্দ! এমন কি মন্দ!
কিন্তু এই যে নামের গোড়ায় স্বামী বসিয়েছ! স্বামী কেন আবার?
বাঃ তাও জানে না? স্বামী বসাতে হয় যে। বিয়ে না করলেও বসানো যায়। আমার বোকামিতে বকুর বিস্ময় ধরে না–তার ওপরে আমি তো বিয়েও করতে যাচ্ছি শিগগির।
আমি আকাশ থেকে পড়ি–বল কি? বিয়ে? এই এত বয়সে?
অবাক হচ্ছ যে! বিয়ে কি করতে নেই? বকু বলে, দুদিন বাদে বক্কানও লোপ পাবে আমার। থাকবে কেবল স্বামী। শুধুই স্বামী।
হ্যাঁ।
তোমাকে লক্ষ্যভেদের কথা বলেছিলাম না? সে লক্ষ্যভেদে হয়ে গেছে আমার অ্যাদ্দিনে।
হ্যাঁ বলো কি? ঈশ্বরকে ফাঁক করেছো তাহলে?
একেবারে চৌচির–এই দয়াখো। ব্যাঙ্কের একটা পাস বই বের করে আমাকে দেখায়, তাতে বকুর নামে লক্ষ টাকা জমা। পুনরায় আমার পিলে চমকায়–অ্যাঁ! এত টাকা বাগালে কোত্থেকে?
ভক্তদের কাছ থেকে প্রণামী পাওয়া সব। ধারও আছে কিছু কিছু–তাও বেশ মোটারকমের। তবে ধর্তব্য নয়। ফেরত দেবার কোনো কথা নেই।
ভক্তদের ফাঁকি দেবে? বেচারাদের?
ভক্তিতে মানুষকে কানা করে! গুরুর কাজ হচ্ছে চক্ষুদান করা। এইজন্যে গুরুকে বলেছে জ্ঞানাঞ্জন শলাকয়া। সেই গুরুতর কাজটাই করছি আমি কেবল!
বারে আমার ভাই বক্কানন্দ! বলে আমি তারিফ করি–বাহবা কি বাহবা! গদাম—গদাম–গুম!
শেষের কথাগুলো বলে আমার দক্ষিণহস্ত…ওর প্রশস্ত পিঠে–বেশির ভাগ অব্যয় শব্দ সব হাতের অপব্যয় থেকেই আসে তা!
আমার তারিফের তাল সামলাতে ওর সময় লাগে। এটা অনুরোগের বহর, না কি, অনেকদিনের রাগের ঝাল…ও ঠিক বুঝতে পারে না। আমিও না।
পুনাবৃত্তির সূত্রপাতেই ও পিছিয়ে যায়। আমি চললুম ব্যাঙ্কে। য়্যাদ্দিন শুধু সমাধিই করেছি। এবার সমাধা করি!
আমি হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকি। লক্ষ টাকা ভেদ করা কি চারটি খানি? দুর্ভেদ্য রহস্যের মতোই বকুকে বোধ হতে লাগল আমার।
ব্যাঙাচির ল্যাজ খসে সে ব্যাঙ হয়, আর বড়ো হলে তার ব্যাঙ্ক হয় তারপরে যখন ঠ্যাংটাও খসে যায় তখন থাকে শুধু ব্যা।
তা, ভক্তদের কাছে অপদস্থ হলেও বকুর আর কোনো তুয়াক্কা নেই। সে আবার বিয়ে করতে যাচ্ছে। নতুন ব্যা–কারনে।
ভক্তরা ওর পীঠস্থানে যদি পাদ্যর্ঘ দেয় তাতেই বা কি যায় আসে ওর এখন?
বিগড়ে গেলেন হর্ষবর্ধন
এমন পাল্লায় পড়ে মানুষ। চিরদিন সহর্ষ দেখেছি বিগড়োতে দেখিনি কখনো, এমন যে মানুষ তাঁকেও সেদিন বিগড়ে যেতে দেখা গেলো…
