এমন সময়ে জনৈক ভক্ত এক ছড়া পাকা মর্তমান নিয়ে এসে হাজির। দণ্ডবৎ হয়ে বকুর শ্রীচরণে কলার ছড়াটা নিবেদন করে দেন তিনি।
বকু হাত তুলে আশীর্বাদ জানায়–জয়স্ত।
তারপর একটা কলা ছাড়িয়া মুখের কাছে তোলে নিজের মুখের কাছে। কাকে যেন অনুনয় করে–মা খাও!
আমি চারিদিকে তাকাই, বকুর মাকে দেখতে পাই না কোথাও। তিনি হয়তো তখন তেতলায় বসে। তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে পান দোক্তাই চিবুচ্ছেন হয়ত। সেখান থেকে কি শুনতে পাবেন বকুর ডাক? তাছাড়া হাজার অনুনয় বিনয়েও, তিনি কি আসতে চাইবেন এই দঙ্গলে? সাধের দোক্তা ফেলে খেতে চাইবেন এই কলা?
বকুর পুনরায় সকাতর অনুরোধ–খাও না মা?
তাহলে বোধহয় দরজার আড়ালেই অপেক্ষা করছেন উনি। এতক্ষণ হয়তো নেপথ্যেই বিরাজ করছিলেন।
আমি মার আগমনের প্রতীক্ষা করি, বকু কিন্তু করে না, কলাটা মুখের মধ্যে পুরে দিয়ে, সুচারুরূপে বিচিয়ে ফ্যালে একদম।
দ্বিতীয় কলাটিও ঐভাবে মুখের কাছাকাছি আনে। আবার বকুর বেদনামথিত আহ্বান–মা! মাগো! খাও না মা! আরেকটা কলা খাও!
আমি অবাক হইয়া এবার। পাশের একটি ভক্তকে জিজ্ঞেস করি–মহাপ্রভুর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এমন করছেন কেন?
শুনে তিনি তো চোখ পাকান, আরেকজন ঘুসি পাকায়। অবশেষে পেছনের একটি সদাশয় ভদ্রলোক আমাকে সব বুঝিয়ে দেন; তখন আমি জানতে পারি যে, ভগবানের সঙ্গে আমাদের চিরদিনের আদা ও কাঁচকলার সম্পর্ক চেষ্টা করে হলে গিয়ে, আত্মীয়বোধে তার সঙ্গে বাতচিত করা আধুনিক ভাগবৎ সাধনারই একটা প্রত্যঙ্গ। তারপর আর বুঝতে দেরী হয় না আমার। অর্থাৎ ভগবানকে মা-মাসী বলে একটা সম্পর্ক পাতিয়ে আমাদের ধর্ম মা যেমন–ভুলিয়ে ভালিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে কিছু বাগিয়ে নেবার ফন্দি। ভগবানের সঙ্গে এহেন চালাকি আমার ভাল লাগে না। চালাকির দ্বারা একে চালাকি করা ছাড়া কি বলব? কিন্তু চালাকির দ্বারা কি কোনো বড় কাজ হয়?
তৃতীয় কলার প্রাদুর্ভাবেই আমি প্রতিবাদ করি–উঁহু, মা বেচারীকে অত কলা খাওয়ানো কি ঠিক হবে? সর্দি হতে পারে মার। তার চেয়ে বরং এখানকার বাবাজীদের মধ্যে বিতরণ করলে কি হয় না?
বকুর কদলী সেবন কিন্তু বাধা পায় না। চিবুতে চিবুতেই সে বসে, হ্যাঃ, মার আবার সর্দি হয় নাকি? তিনি হলেন আদ্যশক্তি। সর্বশক্তীময়ী! সর্দি হলেই হলো। আর যদি হয়ই, মা কি আমার আদা-চা খেতে জানেন না?
সাধ্য-সাধনের লোকে চেঁকি গেলে, কলা তো কি ছার! সমস্ত ছড়াটাই বকুর মাতৃগর্ভে গেল! মার বিকল্পে বকুর অন্তরালে দেখতে না দেখতে হাওয়া!
তারপর একে একে মা আঁচাও মা মুখ মোছ–ইত্যাদি হয়ে যাবার পর একটি পান মাতৃজাতির মুখে দিয়ে বকুর দ্বিতীয় কিস্তি কথামৃত শুরু হয়। মাঝে একবার একটা সমাধির ধাক্কাও সামলাতে হয় বেচারা বকুকে।
অবশেষে অনেক বেলায়, ভক্তদের সবার অন্তর্ধানের পর, থাকি কেবল বকু আর আমি।
এই যে শিব্রাম যে! অনেকদিন পরে কি মনে করে? ভারিক্কী চালে বকু বলে।
এলাম তোমাকে সঙ্গে নিয়ে সিনেমায় যাব বলে! মডার্ন টাইমস হচ্ছে মেট্রোয় চার্লি চ্যাপলিনের। চল, দেখে আসা যাক আর হেসে আসা যাক খানিক।
আমার কত কাজ, কি করে যাই বল! বকুর মুখ ভার।
আচ্ছা মাকে একবার জিজ্ঞেস করেই নাও না বাপু। তিনি তো এখনো দেখেননি ছবিটা। কিংবা যদি দেখেও থাকেন তো দেখেছেন সেই ফিল্ম তোলার সময় হলিউডে। তারপর সটান চলে এসেছে কলকাতায়, এই প্রথম শো।
আঃ, কী যা তা বকছ! মার এখন সময় কই?
তবে মাকে নাই নিয়ে গেলে, তোমাকে নিয়ে গেলেই হবে। মার কি মাসীমার কি যারই হোক, অনুমতিটা নিয়ে নাও চটপট।
ভাই শিব্রাম, বকুর দ্বিতীয় দফার দীর্ঘনিঃশ্বাস : ঈশ্বর ছাড়া কি কোনো কাম্য আছে আমার জীবনে? না, আর কোনো চিন্তা? না, কিছু দ্রষ্টব্য? না। এখন ঈশ্বরই আমার একমাত্র লক্ষ্য।
তা বেশ তো। লক্ষ্য তাই থাক না, কিন্তু সিনেমাটা উপলক্ষ্য হতে বাধা কি? চার্লি চ্যাপলিন–
তা হয় না ভাই শিব্রাম বকু বাধা দিয়ে বলে–তুমি নিতান্ত মূঢ়মতি! মহৎ গূঢ় রহস্য কি বুঝবে! লক্ষ্য মাত্রই ভেদ করার জিনিস তা তো মানো? কথায় বলে লক্ষ্যভেদ। ঈশ্বর যদি জীবনের লক্ষ্য হয় তাহলে ঈশ্বাকেও ভেদ করতে হবে বৈ কি। ঈশ্বরকে ফাঁক না করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই।
আমার কি রকম একটা ধারণা ছিল যে, ঈশ্বর লক্ষ্য হতে পারে কিন্তু ভেদ্য নন, কিংবা ভেদ্য হতে পারেন কিন্তু লক্ষ্য নন অথবা ও দুয়ের কিছুই তিনি নন সমস্ত ভেদাভেদের বিলকুল অতীত তিনি। সেই কথাই পরিষ্কাররূপে প্রমাণ করতে যাচ্ছি কিন্তু পাড়তে না পাড়তেই সে আমাকে বাগড়া দেয়–বাঃ, ভেদ করা যায় না কে বলল? ঈশ্বরকে ভেদ করেই তো আমরা এলাম। এলো এই বিশ্ব চরাচর! নইলে এলাম কোত্থেকে? ঈশ্বরকে ছিন্নভিন্ন ছত্রাকার করেই তো আমরা এসেছি ধাবমান পলাকতক বিধাতার ছত্রভঙ্গ আমরা! যা একবার ভেদ হয়েছে তা আবার ভেদ হবে! বার বার ভেদ হবে। তবে হ্যাঁ, দুর্ভেদ্য বটে।
এই বলে সে অর্জুনের লক্ষ্যভেদের উদাহরণ ঠেলে নিয়ে আসে আমার সামনে, আমার কিন্তু ওরফে ধনঞ্জয় য়ের, অধিকতর মুখরোচক দৃষ্টান্তে প্রহারের দুরভিসন্ধিই জাগতে থাকে মাথায়।
নিজেকে সামলে নিয়ে কোনরকমে–না, এতখানি বরদাস্ত করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার পিত্ত প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে, একটা নিষ্কাম রাগ, নিঃস্বার্থ ভাবে তাকে ধরে অহেতুক পেটাবার সদিচ্ছা আমার পেটের মধ্যে প্রধুমিত হয়। না,বকু এতটা বাড়ে তাহলে বকুকেই আমার জীবনের লক্ষ্য করে বসব কোনদিন! ধরে ঠ্যাঙাব, বা একেবারে ভেদ করেই ফেলব ওকে জরাসন্ধের মত সরাসরি। জরাসন্ধকে কে ফাঁক করেছিল? অর্জ্জুন, না, ধনঞ্জয়–কে? সে যেই হোক, য়্যাডভাইস বা একজাম্পলের পরোয়া নেই আমার ওকেও আমি দেখে নেব, হুবহু, তা যাই থাক কপালে, মানে বুকর কপালে! আর বলতে কি, বকুকে আমার ততটা দুর্ভেদ্য বলে মনে হয় না আদপেই।
