পরের দিন ইস্কুলে এসে বকুর কি না বকুনি আমায়।
আমার সমাধি তুই কি বুঝিস রে হতভাগা? বোকা গাধা কোথাকার। জানিস শ্রীরামকৃষ্ণের, শ্রীচৈতন্যের সমাধি হতো? শ্রীবকুরও তাই হয়। তুই তার জানবি কি মুখ? চড় দিয়ে উনি সমাধি সারাচ্ছেন! আহাম্মোক! সমাধি হলে কানের কাছে রাম নাম কৃষ্ণ নাম করতে হয় তাহলেই হয় তাহলেই জ্ঞান ফিরে আসে। সবাই জানে একথা, আর উনি কিনা–
বকুর আফশোস আর ফোঁস ফোঁস সমান তালে চলে। বাধা দিয়ে বলতে যাই–রাম নামের মহিমা আমারও জানা আছে। আমাকে আর তোর শেখাতে হবে না। কিন্তু মারের চোটেও ভূত পালায় নাকি? তোকে পোঁচা ভূতে পেয়েছিলো তাই আর–
সেই মুহর্তে মাষ্টারমসাই আসেন ক্লাসে–বিতণ্ডা চাপা পড়ে যায়। কিন্তু পর মুহূর্তেই, বকুর কি বরাত জানি না, সেই পুরাতন দুর্লক্ষণের পুনরাবৃত্তি। মাষ্টারমশাই পড়া নিয়ে কী প্রশ্ন করেছেন, বুকু পারেনি; অমনি হুকুম হয়ে গেছে বেঞ্চির উপর নীল ডাউনের। আর নীল ডাউন হবার সঙ্গে সঙ্গেই বকুর সমাধি।
ব্যাপার দেখে ভড়কে গিয়ে মাষ্টারমশাই তো জল আনতে ছুটে বেরিয়েছেন। ক্লাসসুদ্ধ সবাই গেছে হকচকিয়ে; কী করতে হবে ভেবে পাচ্ছে না কেউ। ভারী বিভ্রাট!
আমি ওর কানে কাছাকাছি গিয়ে রাম না, মার–কোনটা যে লাগাবো ঠিক করতে না পেরে বলেই ফেলি হঠাৎ–চাঁটাও কসে য়্যাক চড়!
যেই না এই বলা, অমনি বকু সমাধি আর নীল ডাউন ফেলে রেখে এক সেকেন্ডে স্ট্যান্ড আপ অন দি বেঞ্চি।
তারপর–তার পরদিনই বকু ইস্কুলে ইস্তফা দিল।
এসব তো বেশ কিছুদিন আগের কথা। ইতিমধ্যে বকু বয়সে বেড়ে এবং বুদ্ধিতে পেকে যে ঈশ্বরকে নিয়ে বাল্যকালে তার নিতান্তই খুচরো কারবার ছিল তাকেই এখন বেশ বড় রকমের আদমানী রপ্তানীর ব্যাপারে ফলাও রকমে ফাঁদতে চায়। আর সেই জন্যেই ওকে জাঁকালো রকমের নাম নিতে হচ্ছে, শ্রীমৎ বক্কেশ্বর পরমহংস। যে কোনো ব্যবসাতেই নামটাই হচ্ছে আসল। সেইটাই–গুড-উইল কিনা।
বকু থেকে বক্কেশ্বর হবার পর, অনেকদিন আর যাওয়া হয়নি ওর কাছে। ভাবলাম যাই একবার। ঈশ্বরই লাভ করেছে বেচারা, কিন্তু ঈশ্বরকে ভাঙিয়ে আরো কতদূর কী লাভ কোনো সুরাহা করতে পারলো কিনা দেখে আসা যাক। পুরো টাকাটা পেয়ে কোনোই সুখ নেই–যদি না মোলো আনায়ও চৌষট্টি পয়সায়–এবং কত আধলায় কে জানে–তার বহুল ও বহুবিস্তৃত হবার সম্ভাবনা থাকে। যে টাকাকে আনায় আনা যায় না, তা নিতান্তই অচল টাকা। তাকে পাওয়াও যায় না, না পাওয়াও তাই–একেবারেই বদলাভ বলতে গেলে।
বকুই আমাকে বলেছিল একথা। যে ঈশ্বর ব্যাঙ্কে বাড়েন না, তিনি নিতান্তই বক্কেশ্বর। বক্কেশ্বর। বকেশ্বরের তাকে আদৌ কোন দরকার নেই। অকেজো জিনিসের ঝামেলা কে সইবে বাপু??
গিয়ে দেখি বেশ ভীড় ওর বৈঠকে। ঘর জুড়ে শতরঞ্জি পাতা, ভক্ত শিষ্য পরিবেষ্টিত বকু মাঝখানে সমাসীন। নির্লিপ্ত, নির্বিকার প্রশান্ত ওর মুখচ্ছবি– কেমন যেন ভিজেবেড়াল ভাব।
আমিও গিয়ে বসি একপাশে, ও দেখতে পায় না, কিংবা দেখেও দেখে না, কে জানে!
ভক্তদের একজন প্রশ্ন করেছে, প্রভু, ব্ৰহ্ম কি? ব্রহ্মের সঙ্গে জগতের সম্বন্ধই বা কি?
প্রথমে বকুর মৃদু হাস্য-তারপরে বকুর সুমধুর কণ্ঠ। ব্ৰহ্ম! ব্রাহ্মকে দেখা স্বয়ং ব্রহ্মারও অসাধ্য। আর ব্রহ্মের সঙ্গে জগতের সম্বন্ধ বলছ? সে হচ্ছে ডিমের সম্বন্ধ! এই জন্যেই জগৎকে ব্রহ্মাণ্ড বলে থাকে। আমাদের জন্যে ব্রহ্মের কোনোই হাপিত্যেশ নেই; আমরা বাঁচি কি মরি, খাই কি না খাই, খাবি খাই কি খাবার খাই তা নিয়ে ব্রহ্মের মোটেই মাথা ব্যাথা করে না। মাথাই নেই তো–মাথা ব্যাথা! ব্রহ্মণ সে এক চীজ। এই প্রত্যয় যার হয়েছে তাকেই বলা যায় ব্রহ্মালু। ব্রহ্মের আলু প্রত্যয় আর কি? খুব কমলোকেরই এই প্রত্যয় আসে জীবনে। যাদের হয় তাঁদেরই বলা হয় সিদ্ধ মহাপুরুষ। অর্থাৎ কিনা–
ভিড়ের ভেতর থেকে আমি ফোড়ন কাটি, আলুসেদ্ধর মহাপুরুষ।
ক্ষণেকের জন্য বকুর খাইফোঁটা বন্ধ হয়, ভক্তরাও চঞ্চল হয়ে ওঠে।
কিন্তু ভক্তির স্রোত কতক্ষণই বা রুদ্ধ থাকে! আরেক জনের প্রশ্ন হয়–দেখুন, আপনি ভগবানকে মাতৃভাবে সাধনা করতে বলেছেন। কিন্তু মার কাছে যা চাই তাই পাই, কিন্তু ভগবানের কাছে চেয়ে পাই না কেন বলুন তো?
ভারী মুশকিলের কথাই। এই নিদারুণ সমস্যার বকু কি সমাধান করে, জানবার আমারও বাসনা হয়।
বকুর আবার মৃদু হাস্য–তবে এবার হাসির পরিধি সিকি ইঞ্চি সংক্ষিপ্ত।
আমরা কি ভগবানের কাছে চাই পাগলা? সত্যি সত্যিই কি তাঁকে মা বলে ভাবতে পারি? আমাদের প্রার্থনা তো রাম শ্যাম যদু মধুর কাছেই। তাদের কাছে চেয়ে-চিন্তে আমাদের পাওয়া- গণ্ডা না পেলে তখন গিয়ে ভগবানকেই গাল পাড়ি।
কিন্তু রাম শ্যাম যদু মধুর মধ্যেও কি সেই ভগবান– সেই মা নেই কি? তবে তাদের আচরণ ঠিক মাতৃবৎ হয় না কেন মশাই?
তার কারণ, সেই মা যখন সীমার মধ্যে আসেন তখন সে মাসীমা হয়ে পড়েন। মার চেয়ে মাসীর দরদ কি বেশি হয় কখনন? মাসীর যদি বা কদাচ দেবার ইচ্ছাই হয় সে নিতান্তই যৎকিঞ্চিৎ, কখনো বা হয়ই না, কখনো যদি বা হলো, দিলেন আবার ঠিক উল্টোটাই। তাই এত হা-হুতাশ।
বকু তাক লাগিয়ে দেয় আমায়। এই সব মুরুব্বির মতো আর মোরব্বার মতো বোলচাল–যেমন মিষ্টি তেমনি গুরুপাক। অ্যাতো তত্ত্ব পেলো কোথায়। তবে কি সত্যিই ভগবান পেয়েছে নাকি? সন্দিগ্ধ হতে হয়। এ যে স্বয়ং পরমহংসদেবের মতোই প্রাঞ্জল ভাষায় প্রাণ জল করা কথা সব। আমার নাস্তিক হৃদয়েও ভক্তির ছায়াপাত হতে থাকে।
