এই কথামৃত পড়ার পর থেকেই আমার ধারণা বলবৎ হয়েছে, যে বৈধ বা অবৈধ যে কোনো উপায়ে হোক, ঈশ্বরকে আত্মসাৎ না করে ও ছাড়বে না। আর তার পরেই ওর কেল্লা ফতে–বাড়িই কি আর দাড়িই কি, জুড়িই কি, আর ভুঁড়িই কি–সবই ওর হাতের আওতায়। তখন ওকে কে পায়!
হ্যাঁ, যা বলছিলুম…ছোটবেলার থেকেই ওর এই ভাগবৎ দৌর্বল্যের কথা। সেই কালেই একদিন ওর বাড়িতে গিয়ে যে-দুর্ঘটনা দেখেছিলাম তাতেই আমার আন্দাজ হয়েছিল যে ঈশ্বর না পেয়ে ওর নিস্তার নেই। বকু তখন স্কুলের ছাত্র, সেকেন্ড ক্লাসে এবং হাফপ্যান্টে। যদি পড়ার কথা ধরো, বইয়ের চেয়ে প্যান্টেই ছিল ওর বেশি মনোযোগ–প্যান্টই ছিল ওর একমাত্র পাঠ্য। এবং অদ্বিতীয়। প্রায় সময়েই পড়া না, প্যান্ট পরা নিয়েই ওকে বিব্রত দেখেছি।
এমনি একদিন গেছি ওদের বাড়ি, ক্লাস পরীক্ষার ফলাফলের বৃত্তান্ত নিয়ে, গিয়ে দেখি বকু এবং বকুর বাবা মুখোমুখি বসে–আর বুক দিচ্ছে বাবাকে ধর্মোপদেশ। কথাগুলো ঠিক ধরতে পারলাম না, তবে এটুকু বুঝলাম যে বড় বড় বাণী গড় গড় করে বকে যাচ্ছে বকু–বোধহয় মুখস্থ কোনো বই থেকে–আর হাঁ করে শুনছেন ওর বাবা।
আমাকে দেখে বকু সহসা থেকে যায়–কিরে কি খবর?
পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে–আমি ইতস্তত করি, বল–বলবো কি?
বল না কি হয়েছে?
ফেল গেছিস তুই! বাংলা, ইংরেজী, অঙ্ক পালি–সব সাবজেকটেই। বলে ফেলি আমি।
সামলাতে একটু সময় লাগে বকুর, ওর বাবার হাঁটা, কেবল আরো একটু বড়ো হয়। বকু বলে যাক, সংস্কৃতি যে পাস করেছি এই ঢের। ওতেও তো ফেল যেতে পারতুম। তবু ভাল।
সংস্কৃত তোর ছিল না, তুই পালি নিয়েছিলিস তো!
আমার বলার সঙ্গে সঙ্গে বকু যেন কেমন হয়ে গেল হঠাৎ!—ও–তাই নাকি! এই বাঙনিষ্পত্তি করেই তার চোখ ঠেলে কপালে উঠল, নাক গেল বেঁকে, মুখ গেল সাদা ফ্যাকাসে মেরে।
আমি ঘাবড়ে গিয়ে ওকে ধরতে গেলাম। ওর বাবা আমাকে ইঙ্গিতে নিরস্ত করলেন–তারপর আস্তে আস্তে ওর চোখ বুজে এল, ঘাড় হোল সোজা, সারা দেহ কাঠ হয়ে অনেকটা ধ্যানী বুদ্ধের মতো হয়ে গেল বুক।
আমি যেন সার্কাস দেখছি তখন, কিন্তু ঠিক উপভোগ করতে পারছি না, এমন সময়ে ওর বাবা বললেন-ভয় পেয়ো না, ভয়ের কিছু নেই। ওর সমাধি হয়েছে!
সমাধি? সমাধি কি? মরে গেলেই তো সমাধি হয়! আমি এবার সত্যিই ভয় পাই, যাকে বলে কবর দেওয়া! তাহলে বকু কি আর বাঁচবে না? আমার কণ্ঠস্বর কাঁদো কাঁদো।
না-না মরবে কেন। বেঁচেই আছে, জলজ্যান্ত বেঁচে আছে।
ও, বুঝেছি! আমি মাথা নাড়ি–জীবন্ত সমাধি! এরকম হয় বটে। অনেক সময়ে সমুদ্রে জাহাজ ডুবে গেলে এরকমটা হয়ে যায় নাকি!
বকুর বাবা ঘাড় নাড়েন–উঁহু, সে সমাধিও নয়। তাতে তো লোক মারা যায়, প্রায় সব লোকই মারা যায় জলে ডুবই মারা যায়। কিন্তু এ সমাধিতে মরবার কিছু নেই, খাবি খায় না পর্যন্ত।
তারপর একটু থেকে তিনি অনুযোগ করেন, এরকম ওর মাঝে মাঝে হয়। প্রায়ই হয়।
তবে বুঝি কোন শক্ত ব্যায়রাম? সভয়ে জিজ্ঞাসা করি।
ব্যায়রাম! হ্যাঁ, ব্যায়রামই বটে! অমায়িক মৃদু মধুর হাস্য ওর বাবার। কেবল ঈশ্বরজনিত মহাপুরুষদেরই হয় এই ব্যায়রাম।
আমি এর ওষুধ জানি। বলি ওর বাবাকে। আমার পিসতুতো ভায়ের এই রকম হতো। ঠিক হুবহু। তারপর পাঁচু ঠাকুরের মাদুলি পরে ভাল হয়ে গেল। আপনি যদি ওকে মাদুলি আনিয়ে দ্যান, ও সেরে যাবে।
পাগল। এ পেঁচোয় পাওয়া নয় যে সারবে। এ হচ্ছে ভগবানে পাওয়া– এ সারে না। তাঁর কণ্ঠস্বর আশাপ্রদ কি হতাশাব্যঞ্জক ঠিক ধরতে পারি না। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, আর একবার ভগবানের হাতে পড়লে, মানে ভগবানের হাতে কারু কি পরিত্রাণ আছে? তাঁর কাছ থেকে কি পালিয়ে বাঁচতে পারে কেউ?
এই অভিযোগের আমি আর কি জবাব দেব? তবু তাঁকে আশ্বাস দিতে চেষ্টা করি, যদি বলেন, এখনকার মতো আমি বকুকে ভাল করে দিতে পারি?
তিনি শুধু সবিস্ময়ে আমার দিকে, কিছু বলেন না।
আপনাদের বাড়িতে নস্যি নেয় কেউ? এক টিপ ওর নাকে দিলেই এক্ষুণি–
খোকা, তুমি নেহাৎ ছেলেমানুষ! সমাধির ব্যাপার বোঝ তোমার সাধ্য নয়। এ যে পরমহংসদেবের মতো! সমাধি সারানো নস্যির কর্ম না–তা পরিমলই দাও কি কড়া মুকুথলই দাও।
নস্যির কর্ম নয়–তাহলে-তাহলে-তাহলে তো ভারী মুশকিল! বেচারার দৈহিক বিপর্যয় দেখে দুঃখ হয় আমার। অজ্ঞান মানুষকে জ্ঞান দেবার ইচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক। এই ইচ্ছার বশে যারা ডুবন্ত অবস্থায় জল খেয়ে বা আত্মহত্যার আকাঙ্ক্ষায় আত্মহারা হয়ে আফিং গিলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে, তাদের অভিরুচির তোয়াক্কা বা অনুমতির অপেক্ষা না রেখেই তাদের ঠ্যাং ধরে প্রবল প্রতাপে আমরা ঘুরিয়ে তাকি, দুমদাম দুদ্দাড় পিঠে কিলাচড় সাঁটিয়ে যাই তাদের দেহে লাগবে কি মনে ব্যথা পাবি মিছুমাত্রও একথা ভাবিনে, তাদের আবার ধাতস্থ করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনাতেই আমাদের আনন্দ।
তাহলে তো সত্যিই ভারী মুশকিল! একটু ইতস্তত করে বলেই ফেলি কথাটা, অবশ্যি আরো একটা উপায় আছে সমাধি সারাবার। যদি বলেন–যদি বলেন আপনি–তবে র্যাক চড়ে–
মনে হলো বকু চমকে উঠলো। চড়ের উঠলো। চড়ের কথায় নড়েচড়ে বসলো যেন। কিন্তু সেদিকে দেখব কি, আমার চড়ের গুণই বা কি দেখাব, তার আগেই ওর বাবার চাড় দেখা গেল। ওর বাবা করছেন কি, আমার কথা শুনেই না হাতের কাছে ছিল এক ভাঙা ছাতা, তাই নিয়ে এমন এক তাড়া করলেন আমায়, যে তিন লাফে সিঁড়ি ডিঙিয়ে সটান ছাতে উঠে পাশের বাড়িতে টপকে পড়ি বেচারা বকুকে সমাধির গর্ভে অসহায় ফেলে রেখে পালিয়ে আসি প্রাণ নিয়ে। বকুর আগে আমাকে নিজেকে বাঁচতে হয়।
