হেঁচকি সমেত প্রবীরকে এক হ্যাঁচকায় টেনে নিয়ে জনাও স্টেজে তেকে অদৃশ্য হন।
যবনিকা পড়ে যায়–অট্টহাস্যে সামিয়ানা ফেটে পড়ে। আমি ততক্ষণে তার ত্রিসীমানা থেকে কেটে পড়েছি।
সংস্কৃতের স্যার তার ব্যাকরণের সূত্রে নিপাতনে সিদ্ধ কতবার করে বুঝিয়েছিলেন ক্লাসে, কিন্তু আমাদের মাথায় ঢোকেনি। আজ প্রবীবের নিপাতনে আমার সিদ্ধিলাভ হওয়ায় তার মানে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম আমি। তারোয়ালের খোঁচাগুলোই টের পাইয়েছিল আমায়।
আর এর মূলে ছিল সেই মূলো–মূলতঃ আমি হলেও, মূলোকেই আসলে আসামী করা উচিত।
বক্কেশ্বরের লক্ষ্যভেদ
আমাদের বকু শরীরের ঈশ্বরলাভের পর ভারী কে সমস্যায় পড়ে গেল। আর কিছু না– নিজের নামকরণের সমস্যার।
এ জন্মে ঈশ্বরলাভ হলে এইখানেই ফ্যাসাদ! অকস্মাৎ নাম থেকে নামান্তরে যাবার হাঙ্গামা। এজন্মে না পেলে এসব মুশকিল নেই, নাম বদলাতে হয় না, যথাসময়ে কলেবর বদলে ফেললেই চলে যায়। কিন্তু দেহরক্ষা না করে ঈশ্বরলাভ ভারী গোলমেলে ব্যাপার।
বকুল বরাতে এই গোলোযোগ ছিল–সশরীরে স্বর্গীয় হবার সঙ্কট। মরে যাবার পর যারা স্বর্গীয় হয়, বা স্বভাবতঃই ঈশ্বর পায়–তারা বিনা সাধ্যসাধনাতেই পেয়ে যায়; এইজন্য তাদের নামের আগে একটা চন্দ্রবিন্দু যোগ করে দিলেই চলে। যেমন চিত্তরঞ্জন–আশু মুখুজ্যে ইত্যাদি। স্বৰ্গত র নামের আগে অনুস্বর ও বিসর্গের পরবর্তী চিহ্নটি দিয়ে লেখা দস্তুর ব্যঞ্জনবর্ণের অন্তিমে, বিসর্গের শেষে স্বর্গের চূড়ান্ত ব্যঞ্জনার যেটি সংক্ষেপ। সংক্ষিপ্ত স্বর্গীয় সংস্করণ। তবে উচ্চারণের সময়ে তোমরা যা খুশি পড়তে পারো ও স্বর্গীয় চিত্তরঞ্জন কিংবা চন্দ্রবিন্দু চিত্তরঞ্জন বা ঈশ্বর চিত্তরঞ্জন। চিত্তরঞ্জন আপত্তি করতে আসবেন না।
বকুর বেলা আমাদের সে সুবিধে নেই। চন্দ্রবিন্দুযযাগে বকুর নিজেরও আপত্তি হতে পারে, তার মা বাবার তো বটেই এবং পাড়াপড়শীরাই কি ছেড়ে কথা কইবে? শ্রদ্ধের নেমন্তন্ন না ডেকে হঠাৎ নাম-ডাকে ঈশ্বর হয়ে যাওয়া–ফাঁকতালে একটা বাহাদুরি বরদাস্ত করতে তারা রাজী হবে না। সবাই কি হাসি মুখে যুগপৎ, পরের লাভ ও নিজের ক্ষতি স্বীকার করতে পারে? উঁহ।
ঈশ্বর সে তো মুঠোর মধ্যে?–এরকম সন্দেহ যার মনে ঘৃণাক্ষরেও জেগেছে সে-ই পিতৃদত্ত নাম পালটে নতুন নামে উত্তীর্ণ হয়। ব্যাঙাচি বড় হলেই তার ল্যাজ খসে যায়, ওরফে, ব্যাঙাচির ল্যাজ খসে সে বড় হয়। এতএব পৈতৃক নাম খসে গেলেই বুঝতে হবে যে লোকটা কিছু যদি হাতাতে পেরে থাকে তো সেই কিছু আর কিছু না, খোদ ঈশ্বর।
এখন, আমাদের বকুও ঈশ্বরকে বাগিয়ে ফেলেছে। তারপরেই এই নতুন নামকরণের নিদারুণ সমস্যা।
আনন্দ যোগ করে একটা উপায় অবশ্যি ছিল; কিন্তু কেউ কি তার কিছু বাকি রেখেছে আর? বিবেকানন্দ থেকে আরম্ভ করে আড়ম্বরান্দ, বিড়ম্বনানন্দ পর্যন্ত যা কিছু ভালমন্দ এবং ভালমন্দের অতীত আনন্দদায়ক নাম ছিল, সবাই বকুর বেদখলে। এই কারণে বকু ভারী নিরানন্দ কদিন থেকে। দেখা যাচ্ছে, ঈশ্বর হাতানো যত সোজা, ঐশ্বরিক নাম হাতড়ানো ততটা সহজ নয়।
অনেক নামাবলী টানা-ছেঁড়ার পর একট আইডিয়া ধাক্কা মারে আমার মাথায়; আচ্ছা ব্যাকরণ মতে একটা নাম রাখলে হয় না?
ব্যাকরণের নাম–কি রকম নাম–কি রকম শুনি আবার? বকু একটু আশ্চর্যই হয়। কিন্তু নিমজ্জমান লোকের কুটোটিকেও বাদ দিলে চলে না এবং কুটোটি এগিয়ে পরের উপকার করতে, ঈশ্বর যে পায় নি, সেও কদাচই পরানুখ হয়।
সোৎসাহে আমি অগ্রসহ হইঃ এই যেমন এই ধর না কেন, বকু ছিল ঈশ্বর–
সে বাধা দেয়ঃ বারে! আমি আবার ঈশ্বর ছিলাম কবে?
ছিলে কি ছিলে না তুমিই জানো! আমার জানা থাকার কথা নয়। ব্যাকরণের ব্যবস্থাটাই বলছি আমি কেবল। বেশ, তাহলে এই ভাবেই ধরো–বকু হলো ঈশ্বর–তো হয়? হতে পারে তো?
বাঃ! আমি হবো কেন? সে আপত্তি করে, আমি তো কেবল ঈশ্বরকে পেলাম!
বেশ, তাই সই। তবে এই রকম হবে–বকু পেল ঈশ্বর ইতি বক্কেশ্বর। কেমন, হলো এবার?
ততটা মনঃপুত হয় না বকুর। কিন্তু অনেক টানা–হ্যাঁচড়ার পর কষ্টেসৃষ্টে এই একটা বেরিয়েছে, এটাও খোয়ালে, অগত্যা বিনামা হয়েই থাকতে হবে যে বকুকে, কিংবা নেহাত কোনো বদনামই না বইতে হয় শেষটায় একথা স্পষ্টাস্পষ্টিই আমি ওকে জানিয়ে দিই।
ব্যাকরণের সূত্রটা কি শোনা যাক তো?
যাবে বলে একেবারে দীর্ঘসূত্র। আমি ব্যাখ্যার দ্বারা বোঝাই। সন্ধিও বলতে পারো। সমানও বলা যায়। সমাস হলে হবে দ্বন্দ্ব সমাস–বকুশ্চ ঈশ্বররশ্চ–
আর বলতে হয় না। নামের মহিমায় বকু বিহ্বল হয়ে পড়ে। বিলি বকু প্রগলভ হয়ে ওঠে, বাঃ বেশ নাম! নামের মতো নাম। বক্কেশ্বর! বকু ছিল–নাঃ, ছিল কি? ছিল কেন? এ তো অতীতের কথা নয়–বকু হলো—হ্যাঁ–হওয়া আর পাওয়া একই। হলেই পায়, পেলেই হয়–বকু হলো ঈশ্বর। আবার ব্যাকরণসিদ্ধও বটে? কটা সিদ্ধপুরুষের আছে এমন নাম। বকুশ্চ ঈশ্বরশ্চ–যেন দিল্লীশ্বরো বা জদীশ্বরো বা! খাসা!
সেই থেকে দ্বন্দ্ব সমাসে ঈশ্বরের সঙ্গে ওর সন্ধি স্থাপিত হয়েছে এবং মার্বেলের ট্যাবলেট পড়েছে বাড়ির সদরে : স্বামী বক্কেশ্বর পরমহংস।
ঈশ্বরের সঙ্গে সন্ধিসূত্রে জড়িত হবার ঢের আগে থেকেই বুকু বেচারা আমাদের ঈশ্বরে জর্জরিত। ছোট বেলা থেকেই ওর ঈশ্বর–উপার্জনের দুরভিসন্ধি। সদ্য প্রকাশিত ওর নিজের কথামৃতে রয়েছে: বরাবরই আমার ঝোঁক ছিল, এই পরম বর্বরের দিকে বাড়িই বলল আর জুড়িগাড়িই বলো কিংবা জারিজুরিই বলো এ সবই পেতে হবে বর্বর হয়ে। বর্বরতা ব্যতিরেকে এসব লভ্য হবার নয়। নায়মাত্মা বলহীনের লভ্য। বল আর বর্বরতা এক; দয়াখো ভূতপূর্ব্ব ইংরেজ আর বর্তমান জাপানকে, দয়াখো অভূতপূর্ব্ব হিটলার, মুসোলিনী আর চেঙ্গীজ খাকে। এইসব বর্বর শক্তির মূলে আছেন সেই বর্বর শক্তিমান মহাবীর। হিটলাটের হিট-এর যোগান এই কেন্দ্র থেকেই। মুসোলিনীর মুষল ইনিই। প্রচুর অর্থ বা প্রচুর অর্থ যাই যাই করতে চাও না কেন, খোদ ভগবানের কাছ থেকেই তার ফন্দি ফিকির জেনে নিতে হবে। এই রহস্য হচ্ছে উত্তম রহস্য–উপনিষদের রহস্যমুত্তমম। তার কাছ থেকেই জানতে হবে সুকৌশলে। কায়দা করে। সহজে জানান দেবার পাত্র তিনি নন–যোগবলেই তাঁকে টের পাবে। যোগঃকর্মসুকৌশলম। এবং তার ফলেই হবে বলযোগ। অচিরাৎ এবং নির্ঘাৎ।
