সেরকম কথা থাকলে স্টেজের ওপরে শুয়েই এইসা একটা ল্যাং মারতাম ওকে যে বাছাধনের আর পাঁচ মিনিট ধরে লড়াই চালাতে হত না, সেই একটি ল্যাংয়েই পতন। আর পতনের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু।
কিন্তু মাস্টারমশাই বললেন, প্রবীর যাই করুক না, আমার পক্ষে কোন ল্যাং বা ল্যাংগুয়েজ নাস্তি।
বইয়ের সব পাটেরই ব্যবস্থা হলো, কিন্তু জনা সাজতে রাজি হলো না ছেলেদের কেউই। পার্টটা ডিফিকালট বলে নয়, মেয়ের পার্ট বলেই। বরং নেপথ্যে কোলাহল হতে রাজি হলো কিন্তু জনা হতে একজনাও না।
তখন মাস্টারমশাই নিজেই জনার পার্ট নিলেন।
জোর মহলা চলল তারপর কদিন ধরে। তেঁড়ে কুঁড়ে হাত পা নেড়ে যা শুরু করল প্রবীরটা…
দাও মাগো সন্তানে বিদায়।
চলে যাই লোকালয় ত্যজি।
ক্ষত্রিয়-সন্তান,
অপমান–কত সবো আর?…
তাকিয়ে দেখবার মতোই ব্যাপার। তার অঙ্গভঙ্গী রকমসকম হাবভাব দেখে, এমন কি, প্রবীর-প্রসবিনী জননী জনা (ওরফে আমাদের বাংলার মাস্টারেরও) তাক লেগে যায়।
আর এমন রাগ ধরে আমার। হাত পা খেলানো অ্যায়সা চমৎকার পার্টটা আমার হলে কী মজারই না হত। অবিশ্যি, শেষ পর্যন্ত, ‘পতন ও মৃত্যু’ অবধারিত হলেও আমার কোন আপত্তি ছিল না। তার বদলে আমাকে হতে হলো কিনা কাটা সৈনিক । চিরকাল ধরে দেখে আসছি আমার কপালটাই এমনি ফাটা।
তাহলেও, নিজের পার্টটা তৈরি করতে কোন কসুর ছিল না আমার। সুবিধের এইটুকু যে, এর রিহার্সাল স্টেজে না দিলেও চলে, নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে শুয়েই আরামে রপ্ত করা যায় বেশ খানিকক্ষণ নিঃস্পন্দ হয়ে পড়ে থাকা–এই বইতো নয়।
বিছানায় শুয়ে শুয়েই মতলব খেলতে থাকে আমার মাথায়। দাঁড়াও বৎস, তোমার ঐ হাত পা নেড়ে বক্তৃতা দেওয়া বার করছি আমি-এর ল্যাং মারতে না পারি, কিন্তু তোমার ঐ ল্যাংগুয়েজই মারব তোমায়। ল্যাং-ল্যাংগুয়েজ নাই মারলাম, ল্যাংগুয়েজের ল্যাং মেরেই কেড়ে ফেলব তোমাকে–দাঁড়াও না।
উৎসবের দিন সকার বেলায় এক কোচর মুড়ি আর আস্ত একটা মূলো নিয়ে প্রবীরের পাড়া দিয়ে যাচ্ছি–দেখি যে তখনো সে তার পার্ট নিয়ে দারুণ সোরগোল তুলেছে। সারা বাড়ি ফাটিয়ে পার্ট দিয়ে তার বাড়াবাড়ি।
সামনে দিয়ে আমায় যেতে দেখে সে বলল–কি খাচ্ছিস রে?
মুড়ি আর মূলো।
দিবি আমায় দুটি?
তা খা না, কত খাবি। বজার থেকে আজ এক ঝুড়ি মূলো নিয়ে এসেছে আমাদের বাড়ি। তুই খা ততক্ষণ, আমি পোস্টাফিস থেকে বাবার জন্যে ডাকটিকিট কিনে আনি।
বলে মূলো আর মুড়ি তার জিম্মায় রেখে আমি চলে গেলাম। বেশ খানিকক্ষণ বাদ ফিরে এসে দেখি, মুড়ির স্বাদ আর আমায় পেতে হবে না–মুড়ির সঙ্গে আস্ত মূলোটিও খতম। আমূল সে শেষ করেছে সবটা।
যাকগে-খাকগে। কথায় বলে বীরভোগ্যা বসুন্ধরা। সেই বসুন্ধরার সামান্য একটা মূলোর গোটাটাই সে হজম করবে সে আর বেশি কি। আজকের দিনটির বীর তো ঐ প্রবীরই।
উৎসবের ক্ষণটি এলো অবশেষে। ঠিক দুপুরবেলায় স্কুলের প্রাঙ্গণে খাটানো সামিয়ানার তলায় প্রথম সারিতে বসে হেড স্যার, জেলার ম্যাজিস্ট্রেট, আর পুলিস সাহেব এবং আমাদের ছোট্ট শহরের আরো সব বড় বড় লোক।
দৃশ্যপট উঠল স্টেজের।
আলুলায়িতকুন্তলা জনা। (ছদ্মবেশে আমাদের বাংলার স্যার) স্টেজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, আর প্রবীর তার সামনে খাড়া। কাটা সৈনিকের ন্যায় আমি রণক্ষেত্রের এক পাশে ধরাশায়ী।
হাত পা নাড়া দিয়ে শুরু হলো প্রবীরের
দা-দাও মা-মা গো স-স-স-সন্তানে বিদায়-হিক-হিক-হিক-….দা-দাও মা-মা গগা…হিক…হিক…
হেঁচকিরা এসে ওর বক্তৃতার তোড়ে বাধা দিতে লাগল।
দাদা আর মামা পাচ্ছ কোথায়? ফিস ফিস করলেন জনা।-তোমার তো তোতলামি ছিল না, এ ব্যরাম আবার কবে থেকে?
প্রবীর। চ-চ-চ-চ-চ-চ-চ-চ-….
জনা (জনান্তিকে) এই সেরেছে।
প্রবীর। চলে যাই হিক হিক…লো-লোলো-লো লোকালয় ত্যজি-হি-হিক
কী হচ্ছে কি। জনা এগিয়ে গেলেন প্রবীরের কাছে–ওমা, দারুণ মূলোর গন্ধ বেরুচ্ছে যে মুখ দিয়ে। মুলো খেয়েছিল না কি আজ? প্রবীবের কানে প্রশ্ন তার।
আ-আমি মূ-মূ-মূ-মূলো হিক হিক হিক খা-খাইনি স্যার। ও-ও-ও আমায় খা-খাইয়ে দিয়েছে বলে সে ধরাশায়ী আমায় একটা তরোয়ালের খোঁচা লাগায়।
খাইয়ে দিয়েছে। জনা-মশাই তো অবাক।
হ্যাঁ স্যার। ও বলললে যে খা। তখন কি জা জানি মূ-মূ-মূ-মূ-মূলো খেলে এমন হেঁ হেঁ হেঁ হেঁচকি ওঠে। হিক হিক।
জনার মুখে কথাটি নেই। আড়চোখে দেখি দেখি তিনি রোষ-কষায়িত নেত্রে তাকিয়ে রয়েছেন আমাদের দুজনার দিকেই।
আবার শুরু করে প্রবীব ও লোকালয় ত্যজি।
ক্ষ-ক্ষ-ক্ষ-ক্ষ-ক্ষ-ক্ষ-হিক হিক।
প্রবীরের ক্ষয় আর শেষ হয় না। কিন্তু ওকে ক্ষয়িষ্ণু হতে দেখে মাস্টারমশাই আর সহিষ্ণু থাকতে পারলেন না। খুব হয়েছে। বেশ চড়া গলাতেই বলে ফেললেন এবার।
কিন্তু প্রবীরের হেঁচকি উঠতেই লাগল। জনার ধিক্কারে তার হিক্কার বাধা পেল না একটুও।
জা-জানি সার। ও আমার শত্রুর। চি-চি-চিরদিন জানি। কি-কিন্তু এত বড় শত্রুর তা-তা আমি জা-জা জানতুম না।
বলে সে আমাকে আবার এক তরোয়ালের খোঁচা লাগাল।
পড়ে পড়ে মার খেতে হয় আমায়। কিন্তু মড়ার উপর খাড়ার ঘা কত আর সওয়া যায় বল?
আমি লাফিয়ে উঠি। উঠে দৌড় মারি স্টেজ থেকে। আর প্রবীর এদিকে প্রাণ ভরে হেঁচকাতে থাকে।
