আমাদের নব জন্মদিনে সেটা এখন কাজে লাগে।
রেঙ্গুন থেকে চাল–বোঝাই হয়ে জাহাজটা কলকাতা ফিরছিল। জাহাজে উঠে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি অচেনা মানুষের মুখ দেখে আনন্দ হয়! ক্যালেন্ডারের তারিখ মিলিয়ে জানা যায়, পুরো পাঁচ পাঁচটা দিন আমরা জলে তলায় ছিলাম।
যাহোক পাতাল–বাস হলো মামা। মেজমামা ঘাড় নাড়লেন–পাঁচদিন না তো–পাঁচ বচ্ছর।
পাতালে তো অ্যাদ্দিন কাটলো, এখন হাসপাতালে কদিন কাটে কে জানে! আমি বলি, যা বিস্কুক পেটে গেছে এই কদিনে। শুকনো বিস্কুট চিবুতে হয়েছে দিনরাত!–
গোরা বলে, বারে বিস্কুট বুঝি খারাপ। ও তো খুউব ভাল জিনিস। বিস্কুট খেতে পেলে ভাত আবার খায় নাকি মানুষ!
গোরার মামা গুম হয়ে থাকেন। তাঁর ভোট যে বিস্কুট আর গোরার পক্ষেই সেটা বোঝা যায় বেশ
প্রবীর পতন
নেহাত অমূলক নয়। বরং বলতে গেলে বলতে হয় মূলোই এই কাহিনীর মূলে।
কথায় বলে শত্রুর শেষ রাখতে নেই। সমূলে তাকে সংহার করাই উচিত।
আমার সংহার পর্বটা প্রায় তার কাছাকাছিই যায়। সমূলে তাকে আমি শেষ করেছি।
সেদিন রবিবার হলেও সবাই আমরা গেছি ইস্কুলে। আমার, মানে, আমাদের সেকেন্ড ক্লাসের ছেলেরাই কেবল; আমাদের কেলাসে গিয়ে জমেছি সক্কলে।
ইস্কুলের বার্ষিক উৎসবের দিনে একটা নাটক অভিনয়ের কথা হচ্ছিল। সেদিন সেই নাটকের মহড়া শুরু হবার কথা।
কী নাটক আমরা জানিনে। আমাদের বাংলার স্যার লিখেছিলেন পালাটা। আর, তার বিভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করবার পালা ছিল আমাদের। সেদিনকে সেই সব পার্ট বিলি হবার কথা।
ক্লাসের আমরা বসতে না বসতেই স্যার এসে দাঁড়ালেন। হাতে-খেড়ড়া বাঁধা মোটা একটা খাতা। সেইটেই তাঁর স্বরচিত নাটকের কপি বলে মনে হলো আমাদের।
জনা-কে কেউ জানো তোমরা? ক্লাসে বসেই তিনি শুধোলেন আমাদের। কারো মুখে কোন জবাব নেই। কোন জনার কথা উনি বলছেন কে জানে। কত জনাকেই তো জানি।
প্রবীরের মা জনা। তিনিই জানালেন।
আমরা সবাই একদৃষ্টে প্রবীরের দিকে তাকালাম।
প্রবীর ত তার মার নাম কোনদিন আমাদের জানায়নি স্যার। আমি বললাম–জানব কি করে?
কেউ কি তার মার নাম কখনো মুখে আনে? আপত্তি করে প্রবীর : আনতে আছে কি? মা গুরুজন না?
মহাগুরু। সায় দিলেন মাস্টারমশায়। কিন্তু আমাদের প্রবীরের মার কথা এখানে হচ্ছে না। পৌরাণিক প্রবীরের কাহিনী নিয়েই আমার নাটকটা। মহাভারতের প্রবীর–যেমন বীর তেমনি যোদ্ধা। তাকে নিয়েই আমাদের এই পালা। আর সেই প্রবীরের মার নামই হচ্ছে জনা।
তাই বলুন স্যার। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
আমার নাটিকাটির নাম হচ্ছে জনা, ওরফে প্রবীন পতন। বললেন বাংলার স্যার। মহাকবি গিরিশচন্দ্র বিখ্যাত বই জনা-কে কেটে হেঁটে তোমাদের উপযোগী করে বানিয়েছি আমি।
তারপর তাঁর কথার সারাংশ প্রকাশিত হলো–প্রবীরই হলো এই বইয়ের হীরো। নাটকের যেন পার্ট। এখন তোমাদের মধ্যে কে এই পার্ট নিতে চাও জানাও আমায়।
ক্লাসশুদ্ধ সব ছেলেই আমি আমি করে উঠল। আমি স্যার…আমি স্যার.. আমি স্যার। এবং আমিও।
হীরো হতে চায় না কে? আমার আমিত্বও কারো চাইতে কিছু কম নয়। হারবার পাত্র নয় কারও কাছে।
কিন্তু প্রবীর বলল–না স্যার, আমাকেই এই পার্ট দেওয়া উচিত আপনার। আমি এর জন্য আগের থেকেই বিধিনির্দিষ্ট।
বিধিনির্দিষ্ট? বাংলার স্যার বিস্মিত।
নইলে স্যার আমার নাম প্রবীর হতে গেল কেন? এই স্কুলে আমি পড়তে এলাম কেন? এখানে ভর্তি হতে গেলাম কেন? এই কেলাসে প্রোমোশনই বা পেলাম কেন?
এত কেন-র জবাবে আমার ছোট্ট একটি প্রতিবাদ–তোর নাম প্রবীর হতে পারে, কিন্তু তোর মার নাম তো আর জনা নয়। বইটার নাম শুনেছিস? জনা ওরফে প্রবীর পতন।
মার নাম জনা না হতে পারে কিন্তু জনাই আমাদের দেশ। জানায় প্রবীর।
জনাই? যেখানকার মনোহরা বিখ্যাত? মাস্টারমশাই জিজ্ঞেস করেন–মনোহরা নামক মেঠাই প্রসিদ্ধ যেখানকার?
হ্যাঁ স্যার, সেখানেই আমার জন্ম। সেই জনাই আমার মাতৃভূমি। আর মা আর মাতৃ মা তো এক; তাই নয় কি স্যার?
তা বটে। ঘাড় নাড়েন বাংলার স্যার–সে কথা ঠিক। জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী।
তাহলে পার্টটা আমার পাওয়া উচিত কিনা আপনি বলুন স্যার?
কিন্তু শুনেছ তো, বইটার নাম প্রবীর পতন। প্রবীর খুব বীর হলেও যুদ্ধ করতে করতে পড়বে শেষটায়। শেষ পর্যন্ত মারা পড়তে রাজি আছ তো তুমি?
কেন মরব না স্যার? সত্যি সত্যি তো আর মরতে হবে না। তবে যতক্ষণ আমি পারব বীরের মত লড়াই করে যাবো। সহজে মরব না স্যার–তা কিন্তু আমি বলে দিচ্ছি।
তোমাকে পাঁচ মিনিট লড়াই করতে হবে, তার বেশি নয়। তারপর যেই আমি উইং এর পাশে থেকে ইশারা করব–এইবার, তক্ষুনি তোমাকে ধপাস করে পড়তে হবে কিন্তু গায়ে একটু লাগতে পারে; কিন্তু তা গ্রাহ্য করলে চলবে না। এর নাম হচ্ছে পতন ও মৃত্যু। ভেবে দয়াখো কথাটা…রাজি আছ?
এক কথায় সে রাজি। তার নামের টু-থার্ড বীর তো-সেই কথাটাই, আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সে বললে যে বীরের মৃত্যু তার শিরোধার্য। (আহা, নামমাত্র মরে নাম করতে কে চায় না যেন।)
প্রবীরের পার্টটা সে-ই পেল। আর সব পার্টও বিলি হলো। সবাই পেল এক একটা পার্ট আমিও পেলাম একটা।
আমারটা কাটা সৈনিকের পার্ট। তাতে কোন বক্তৃতা নেই, লম্ফ ঝম্ফ কিছু না। স্টেজের এক কোণে চুপটি করে মড়ার মতন শুয়ে থাকা কেবল। নাকে মাছি বসলেও নড়া চলবে না, মশা কামড়ালেও নয়। প্রবীর যখন বীরদর্পে তার তরোয়াল ঘুরিয়ে স্টেজময় দাপাদাপি করে লড়াই কররে, আমি তখন লাশের মতোই পড়ে থাকব এক পাশে। একটি কথাও কইতে পারবো না। ও যদি আমার পায়ের কাছেও এসে লাফায়, আমায় ডিঙিয়ে যায়, বারংবার আমার এধার থেকে ওধারে টপকাতে থাকে, এমন কি আমার ওপরে দাঁড়িয়েই লড়াই জমায় তবু আমি মোটেই ওকে ল্যাং মারতে পারব না। আমার মুখে যেমন কথাটি নেই, পায়ের বেলাও ও-কথা নয়।
