গুরুতর বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাঝখানেই গোরা সশব্দে লাফিয়ে ওঠে–একি? কে ওখানে? ও কে?
আমাদের সবার দৃষ্টি পোর্টহোমের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ওর শার্সির ওধারে বদন ব্যাদান করে এ আমার কোন প্রাণী বাবা? অজানা কোন জানোয়ার? সমুদ্রের তলায় এমন বিচ্ছিরি বিটকেল বিদঘুঁটে চেহারা–ভয় দেখাচ্ছে এসে আমাদের!
শার্ক! মেজমামা পর্যবেক্ষণ করে কন। এরই নাম শাক।
হ্যাঁ বইয়ে পড়েছি বটে। এই সেই শার্ক? গোরার উৎসাহের সীমা থাকে না। পোর্টহোলের। উপর সে ঝুঁকে পড়ে একেবারে।
উঁহু, অতো না! অতো কাছে নয়, কামড়ে দিতে পারে। আমি সতর্ক করে দিই, এমন কি, না কামড়ে একেবারে গিলে ফেলাও অসম্ভব নয়।
বাঃ শার্সি রয়েছে না মাঝখানে? গোরা মোটেই ভয় খাবার ছেলে নয়।
তোকে দেখলেই সুখাদ্য মনে করবে! মেজমামও সাবধান করতে চান–তখন শার্সি ফার্সি ভাঙতে ওর কতক্ষণ! মাঝখানে আমরাও মারা পড়বো তোর জন্যেই!
গোরা কিন্তু ততক্ষণে অতিথির সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান শুরু করেছে।
সেদিন বিকেল থেকেই কেবিনের বাতাস দুর্গন্ধ হয়ে উঠল–এইবার কমে আসছে অক্সিজেন, বিষাক্ত হয়ে উঠছে বাতাস। আমি বললাম, এর পর নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিতেও কষ্ট হবে আমাদের।
তাহলে উপায়? মুখখানা সমস্যার মত করে তোলেন মেজমামা। তাহলে এক কাজ করা যাক তিনি নিজেই সাবধান করে দেন, যতো টিন আর বিস্কুট আছে, সব খেয়ে শেষ করা যাক এসো। খেয়ে দেয়ে তারপর গলায় দড়ি দিলেই হবে। খাবি খেয়ে অল্পে অল্পে মরার চেয়ে আত্মহত্যা করা ঢের ভালো!
ঠিক অতো উপাদেয় না হলেও আরেকটা উপায় আছে এখনো? মেজমামাকে আশ্বস্ত করি, আমাদের দুধারেই কেবিন, উপরে আর নিচের তলাতেও। আপাতত দেয়ালে এবং মেঝের ছ্যাদা করে ঐ সব ঘরের বিশুদ্ধ বাতাস আমদানি করা যাক। এ ঘরের দূষিত বায়ু সব দূর করে দিই। তারপর শেষে ছাদ ফুটো করলেই হবে। আপাতত এতেই চলে যাবে দিনকতক।
মেজমামা স্তস্তির সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়েন। গোরা বলে, তার চেয়ে আমরা জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলি না কেন। তাতেও তো কি বাতাস বাড়াতে পারে! কি বলেন?
মেজমামা কটমট করে তাকান ওর দিকে, আমি কোনো উত্তর দিই না।
এর পরের কদিনের ইতিহাস সংক্ষেপে এই : ঘরের বাতাস ফুরিয়ে এলেই এক একধারে একটা করে গর্ত বাড়ে। বাতাসের কমতি গর্তের বাড়তির দ্বারা পুষিয়ে যায়। গোটা জাহাজটা আমাদের ভাগ্যক্রমে এয়ার-ওয়াটার-টাইট ছিল বলেই এই বাঁচোয়ো!
শার্কটা গোরার রূপে-গুণে মুগ্ধ হয়েছিল নিশ্চয়। সে কেবলি ঘুরে ঘুরে আসে। গোরা তার শার্ক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করে সময় কাটায়। ইতিমধ্যেই দুজনের ভাব বেশ জমে উঠেছে। সামুদ্রিক সব বিষয়কৰ্ম ফেলে ঘুলঘুলির কাছেই ঘোরা-ফেরা করছে শার্কটা। আর গোরার তরফেও আগ্রহের অভাব নেই, সুযোগ পেলেই সে সমুদ্রচর বন্ধুর আদর-আপ্যায়নের কসুর করে না। বেশির ভাগ সময়ই ওদের মুখোমুখি দেখা যায়–মাঝে শার্সির ব্যবধান মাত্র। কোন দুর্বোধ্য ভাষায় যে ওরা আলোচনা করে, তা ওরাই জানে কেবল।
মেজমামা একটার পর একটা বিস্কুটের বাক্স উজাড় করে চলেন। আর কারো হস্তক্ষেপ করার যো নেই ওদিকে। মেজমামার প্রসাদ পায় গোরা। আর কখনো-সখনো নিজের প্রসাদের দু-এক টুকরো আমাকে দ্যায়। আমি হাঁ করেই থাকি, উঠে কি হাত বাড়িয়ে খাবার কষ্ট স্বীকার করার ক্ষমতাও যেন নেই আমার। গোরার ভুলবশত ক্বচিৎ কখনো এক-আধখানা যা গোঁফের তলায় এসে পড়ে, তাতেই আমার জীবিকা-নিৰ্বাহ হয়ে যায়।
শুয়ে শুয়ে প্রেমেনের বইখানা পড়ি। দুবার পড়ে ফেলেছি এর মধ্যেই একবার শেষ থেকে গোড়ার দিকে, আরেকবার গোড়া থেকে শেষের দিকে। এবার মাঝখান থেকে দুদিকে পড়তে শুরু করেছি যুগপৎ।
কদিন এইভাবে কাটে, জানি না! খাওয়া আর শোওয়া ছাড়া তো কাজ নেই শুয়ে পড়া, শুয়ে শুয়ে পড়া। এমনি করে একদিন যখন বইটার দিগ্বিদিকে পড়ছি, এমন সময়ে অকস্মাৎ সমুদ্রতল যেন তোলপাড় হয়ে উঠল। আমাদের কেবিন কাঁপতে লাগল, একটা গমগমে আওয়াজ শুনতে পেলাম। সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে বসলাম আমরা কী ব্যাপার? প্রশ্নের পরমুহূর্তেই পোর্টহোলের ফাঁক দিয়ে সূর্যের উজ্জ্বল আলো আমাদের কেবিনের মধ্যে ঢুকলো। এ কী! এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় সবাই আমরা চমকে গেলাম।
আকাশ, আকাশ! মেজমামা চিৎকার করে আকাশ ফাটান।
তাইতো! আকাশই তো বটে! ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে দেখি–রৌদ্রকরোজ্জ্বল সুনীল আকাশ! নীলাভ শূন্যের তলায় দিগন্ত বিস্তার সমুদ্রের কাঁচলে নীল জল! আবার যে এইসব নীলিমার সাক্ষাৎ পাবো, এমন আশঙ্কা করিনি।
ভেসে উঠেছি আমরা। ভাসছি আবার। কিন্তু ভেসে উঠলাম কি করে? মেজমামা হঠাৎ কঠোরভাবে চিন্তা করেন–অনেক ভেবে চিন্তে বলেন, হয়েছে, ঠিক হয়েছে। জাহাজের খোলটা গেছে খসে সঙ্গে যত লোহালক্কর ছিল, সব গেছে জলের তলায়। তার জন্যই ওই বিচ্ছিরি আওয়াজটা হলো তখন, বুঝেছিস গোরা!
গোরা ততক্ষণে কেবিনের দরজা খুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে! তারও আর্তনাদ শোনা যায় সঙ্গে সঙ্গেই–জাহাজ! মেজমামা, জাহাজ! এদিক দিয়েই যাচ্ছে দ্যখোসে–
এতদিনে ও একটা বুদ্ধিমানের মতো কাজ করে। হাফ-প্যান্টের পকেট থেকে লাল সিল্কের রুমালটা বার করে নাড়তে শুরু করে দ্যায়। আমিই ওটা ওকে একদা উপহার দিয়েছিলাম! ওর জন্মদিনে।
