খিদে পেয়েছে যে। গোরা বলে, ভোর না হলে বুঝি খিদে পেতে নেই?
খিদে কি আমারও পায়নি? মেজমামা ফোঁস করেন; কিন্তু–তা বলে কি রাত থাকতেই ব্রেকফাস্ট–এ রকম বে-আক্কেলে কথা কেউ শুনেছে কখনো?
কারো বাপের জন্মে? ভদ্রলোকে শুনলে বলবে কি?
আহা ছেলেমানুষ, খিদে পেয়েছে খাক না! এখানে তো ভদ্রলোক কেউ নেই। কে শুনছে? বিস্কুটের টিনটা গোরার দিকে আগিয়ে দিই।
বা-রে, আমি বুঝি বাদ? মেজমামা আমার দিকে হাত বাড়ান, ছেলেমানুষ বলে কি ও মাথা কিনেছে নাকি? ছেলেমানুষ না হলে খিদে পেতে নেইকো?
মেজমামাকেও একটা টিন দিতে হয় এবং নিজেও আমি একটা টিন শেষ করি। তারপর আবার ঘুম। তারপর আবার অনেকক্ষণ কাটে। আবার ঘুম ভাঙে। আবার খাবার পালা। এইভাবে বারবার তিনবার ব্রেকফাস্টের দাবী মিটিয়েও সকালের মুখ দেখা যায় না। বারোটা বিস্কুটের টিন ফুরোয়, কিন্তু বারো ঘণ্টার রাত আর ফুরোয় না, তখন বিচলিত হতে হয়, সত্যিই!
গোরা, জ্বালাতে টর্চটা একবার। কি ব্যাপার দেখা যাক–
টর্চের আলো ফেলে কেবিনের পোর্টহোলের ভেতর দিয় যা দেখি, তাতে চোখ কপালে উঠে যায়। জল, কেবল সমুদ্রের কালো জল! তা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না।
সর্বনাশ হয়েছে! মেজমামা কন–খুব সংক্ষেপেই।
হ্যাঁ আমরা জলের তলায়–ডুবে গেছি। আমাদের জাহাজ ডুবে গেছে কখন!
কিন্তু একথা মুখ ফুটে না বললেও চলতো, কেন না তথ্য আর অস্পষ্ট ছিল না যে, আমাদের আর আশেপাশের কেবিনগুলো সব ওয়াটার-টাইট বলেই আমরা বেঁচে আছি এখনো পর্যন্ত। পোর্টহোলের কাঁচের শাসিটা পুরু, এত পুরু যে, তা ভেঙে জল ঢুকতে পারবে না। তাই রক্ষা!
এবার কিন্তু মারা গেলাম আমরা। কান্নার উপক্রম হয় মেজমামার।
অনেকটা নিচেই তলিয়েছি মনে হয় এত নিচে যে, সুয্যির রশ্মিও এখানে এসে পৌঁছোয় না। দিন কি রাত, বোঝবার যো নেই।
কতক্ষণ আছি, তাই বা কে জানে! মেজমামার দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ে।
ব্রেকফাসেটর সংখ্যা ধরে হিসেব করলে মনে হয়, এক রাত কেটে গিয়ে গোটা দিনটা কাটিয়ে এখন আমরা আরেক রাতে এসে পৌঁছেছি।
তবে! তবে আর কি হবে। মেজমামার হতাশার স্বর শুনে দুঃখ হলো। তারপরে নিজেই তিনি নিজের প্রশ্নের উত্তর দিলেন–তবে আর কি হবে! দাও আমার রুটি- মাখনের বাক্সটা সাবাড় করা যাক তাহলে!
মুখ থেকে কথা খসতে না খসতেই গোরা মাতুল-আজ্ঞা পালন করে। এসব দিকে ওর খুব তৎপরতা।
এইভাবে এতদিন এখানে কাটাতে হবে, কে জানে! হয়তো বা যাবজ্জীনই, পাউরুটির পেষণে মুখের কথা অস্পষ্ট হয়ে আসে মেজমামার।–না খেয়ে তো আর বাঁচা যায় না। অতএব খাওয়াই যাক কী করা যাবে?
তারপর থেকে উদরকেই আমরা ঘড়ির কাজে লাগাই। আবার খিদে পেলেই বুঝি, আরো ছ ঘণ্টা কাটলো। এই করেই দিনরাত্রির হিসেব রাখা হয়। এসব বিষয়ে গোরার পেট সব চেয়ে নিখুঁত– একেবারে কাঁটায় কাঁটায় চলে। ঘণ্টায় ঘন্টায় সাড়া দেয়!
এইভাবে কয়েকটা ব্রেকফাস্ট কেটে যাবার পর মনে হলো, কেবিনে অন্ধকার যেন অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। হ্যাঁ, এই যে বেশ আলো আসছে পোর্টহোল দিয়ে।
কী ব্যাপার? ব্যগ্র হয়ে ছোটেন মেজমামা পোর্টহোলের দিকে, কই, আকাশ তো দেখা যাচ্ছে না। চারদিকেই জল যে! তাঁর করুণধ্বনি আমাদের কানে বাজে!
নাঃ, এখনো জলের তলাতেই আছি বটে, তবে কিছুটা উপরে উঠেছি। সূর্যরশ্মি প্রবেশের আওতার মধ্যে এসেছি! আমার মনে হয়, ইতিমধ্যে উপরের মাস্তুল টাস্তুলগুলো বসে গিয়ে ভার কমে যাওয়ায় খানিকটা হালকা হয়ে নিমজ্জিত জাহাজটা কিছু উপরে উঠতে পেরেছে। যাক, একটু আলো তো পাওয়া গেল, এই লাভ!
থাক না জল চারদিকে, আমাদের কেবিনের মধ্যে তো নেই! এই বা কি কম বাঁচোয়া! সান্ত্বনার স্বরে এই বলে মেজমামার কথার আমি জবাব দিই।
প্রত্যুত্তরে মেজমামা শুধু আরেকটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করেন।
আমার কিন্তু এমনি জলের তলায় থাকতেই ভাল লাগে। কিরকম মাথায় উপরে, তলায়, চারধারেই অথৈ জল! কেমন মজা! যদ্দুর চাও–খালি সমুদ্র–আর সমুদ্দুর গোরা এতক্ষণে একটা কথা কয়–বাড়ির চেয়ে এখানে–এখন ঢের ভাল!
হ্যাঁ! বাড়ির চেয়ে ভাল বই কি! মেজমামা নতুন বিস্কুটের টিন খুলতে খুলতে বলেন, জলে ডুবে বসে আছি জলাঞ্জলি হয়ে গেছে আমাদের–ভাল না?
জল ডুবে কি রকম? গোরা প্রতিবাদ করে–ডুবে গেলেও আমরা কতো নিচে আছি শিব্রামবাবু?
বিশ-ত্রিশ-চল্লিশফিট, কি আরো বেশিই হবে–কে জানে! আমি জানাই।
ডুবন্ত লোকের কাছে ত্রিশ ফিট জলের তলাও যা, আর হাজার ফিটও তাই! সবই সমান! কোনোটাই ভাল নয়। আবার মেজমামার দীর্ঘনিঃশ্বাস।
কিন্তু মেজমামা, আমাদের কেবিনের মধ্যে তো এক ফোঁটাও জল ঢুকতে পারছে না! তাহলে ডুবলামই বা কি করে? আবার গোরার জিজ্ঞাস্য হয়।–জলে যদি না পড়ি–না যদি হাবুডুবু খাই–আমরা মরবো কেন? বলেই সে আমার দিকে প্রশ্নবাণ ছাড়ে, হ্যাঁ, শিব্রামবাবু বলুন না! জলে ডুবে গেলে কি বাঁচে মানুষ? আমরা যদি ডুবেছি, তাহলে বেঁচে আছি কি করে?
আহা, জল ঢুকছে না যেমন, হাওয়াও ঢুকতে পারছে না যে তেমনি। আমি ওকে বোঝাবার প্রয়াস পাই। আর আমার মনে হয়, মানুষে জলে ডুবে যে মারা যায়, সে জলের প্রভাবে নয় হাওয়ার অভাবেই! এই কারণেই গায়ে জলের আঁচড়টিও না লাগিয়ে আমরা শোনপাপড়ির মত শুকনো থেকেও সমুদ্রগর্ভে ডুবে মারা যেতে পারি। আজই হোক কিংবা কালই হোক-সঞ্চিত হওয়ার অক্সিজেন নিঃশেষ হয়ে গেলেই—অক্সিজেন–বঞ্চিত হলেই আমরা…
