ক্রমশ বিকেল হয়ে আসে। অনেকক্ষণ বসে থেকে অবশেষে আমরা উঠি। খাওয়ার এবং শোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে তো! যতক্ষণ অথবা যতদিন এই জাহাজের এমনি ভেসে থাকার মতি গতি থাকবে, আর এই পাশ দিয়ে যেতে যেতে অন্য কোনো জাহাজ আমাদের দেখতে পেয়ে তুলে না নেবে, ততক্ষণ বা ততদিন টিকে থাকার একটা বন্দোবস্ত করতে হবে বই কি!
আফশোস করে আর ফল কি এখন?
জাহাজকে ধন্যবাদ দিতে হয়, তিনি সেইরূপ কাত হয়ে রইলেন, বেশি আর তলাবার চেষ্টা করলেন না। আমরা তিনজনে এধারে ওধারে এবং কেবিনে পরিভ্রমণ শুরু করলাম।
নাঃ, খাবার দাবার অপর্যাপ্তই রয়েছে। পাঁচ বছর না হোক, পাঁচ হপ্তা টেকার মতো নিশ্চয়ই! বিস্কুট, রুটি, মাখন, চকোলেট, জ্যাম, ঠাণ্ডা মাংস টিন কে টিন। গোরা পুলক আর ধরে না! তার কলেবর আমাদের একেবারে ক্ষেপিয়ে তুললো প্রায়।
খাওয়া দাওয়া সেরে একটা প্রথম শ্রেণীর কেবিনে শয়নের আয়োজন করা গেল। ডেকের টিকিট কেটে প্রথম শ্রেণীতে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া কতখানি সুবিধার, নরম গদির আরামের মধ্যে গদগদ হয়ে গোরা আমাদের তাই বোঝাতে চায়, কিন্তু তার সূত্রপাতেই এক ধমকে মেজমামা থামিয়ে দেন ওকে।
পরের দিন ভোরে ঘুম ভাঙলে সবাই আমরা চমৎকৃত হলাম। এ কি! কেবিনের দরজা কেবিন ছাড়িয়ে এত উঁচুতে গেল কি করে। রাতারাতি জাহাজটা কি আরেক ডিগবাজি খেলো না কি! বাইরে বেরিয়ে যে কারণ বের করব, তারও যোগ নেই। কেন না দরজা গেছে কড়িকাঠের জায়গায়, কিন্তু আমরা দরজার জায়গায় নেই। আমরা যে কোথায় আছি, ঠিক বুঝতে পারছি না।
গোরা কিন্তু আমাদের কাজের ছেলে। কোত্থেকে একটা দড়ি বাগিয়ে এনে হুক লাগিয়ে ফাঁসের মতো করে দরজার দিকে ছুঁড়ে দিল। কয়েকবার ছুঁড়তেই আটকালো ফাসটা। তারপর তাই ধরে সে অবলীলাক্রমে উপরে উঠে গেল। ফাঁসটাকে দরজার সঙ্গে বার করে বেঁধে দড়িটা নামিয়ে দিল সে আমাদের উঠবার জন্য।
যে দড়ি-পথ গোরার পক্ষে মিনিটখানেক পরিশ্রম, তাই বেয়ে উঠতে দুজনেই আমরা নাস্তানাবুদ হয়ে গেলাম। অনেকক্ষণে, অনেক উঠে পড়ে, বিস্তর ধস্তাধস্তি করে, এ ওর ঘাড়ে পড়ে, পরম্পরায়, বহুৎ কায়দা-কসরতে ঘর্মাক্ত কলেবরে অবশেষে আমরা উপরে এলাম। এসে দেখি জাহাজ এবার অন্যধারে কাত হয়েছেন। অন্যদিকে হেলেছেন, তাই আমাদের প্রতি এই অবহেলা। সেইজন্যেই কেবিনের মেজে পরিণত হয়েছে দেয়ালে, আর দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে ছাদ। জাহাজের মেজাজে!
জাহাজের এই রকম দোলায় অতঃপর কি করা যায়, তাই হলো আমাদের ভাবনা। ব্রেকফাস্ট করা যাক। গোরা প্রস্তাব করল।
এই রে! মেজমামা বাজের মতন ফাটবেন এইবার! মুখ না ধুতেই প্রাতরাশের সম্মুখে! এ প্রস্তাবে নাঃ আর রক্ষা নেই! কিন্তু আমার আশঙ্কা ভুল, মেজমামার দিক থেকে কোনই প্রতিবাদ এলো না। কাল থেকে গোরার প্রত্যেক কথাতেই তিনি চটছিলেন, কিন্তু একথায় তাঁর সর্বান্তঃকরণ সায় দেখা গেল।
প্রাতরাশ সেরে সব চেয়ে উঁচু এবং ওরই মধ্যে আরামপ্রদ একটা স্থান বেছে নিয়ে সেখানে আমরা তিনটি প্রাণী গিয়ে বসলাম। বসে বসে সারাদিন জাহাজটার আচার-ব্যবহার লক্ষ্য করি! প্রত্যেক ঘণ্টায়ই একটু একটু করে জলের তলায় তিনি সমাধিস্থ হচ্ছেন। এই ভাবে চললে তার আপাদমস্তক তলানো ক ঘণ্টার বা কদিনের মামলা, মনে মনে হিসাব করি।
হয়েছে হয়েছে। মেজমামা হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন, যখন আমরা জাহাজে উঠলাম, মনে নেই তোমার? জাহাজের খোলে যত রাজ্যের লোহা লক্কর বোঝাই করছিল মনে নেই?
হ্যাঁ আছে। তা কি হয়েছে তার?
লক্করগুলো তো ভেগেছে, এখন ওই লোহার ভারেই জাহাজ ডুবছে। খোলের ভেতর থেকে লোহাগুলো তুলে এনে যদি জলে ফেলে দেওয়া যায় তাহলে হয়তো জাহাজটাকে ভাসিয়ে রাখা যায়।
আমি ঘাড় নাড়ি–তা বটে। কিন্তু কে আনবে সেই লোহা? এবং কি করেই বা আনবে?
গোরা উৎসাহিত হয়ে ওঠে আনবো? আনবো আমি? তার কেবল মাত্র আদেশের অপেক্ষা!
থাম! মেজমামা প্রচণ্ড এক ধমক লাগান।
লক্করদের সবাই কি গেছে? আপাতত একে ফেলে দিলেও জাহাজটা কিছু হালকা হতে পারে বোধ হয়? দেব ফেলে? আমি বললাম।
থামো তুমি। মেজমামা গরম হলেন আরো তোমরা দুজনে মিলে আমাকে পাগল করে তুলবে দেখছি।
তার চেয়ে এক কাজ করা যাক। আমি গম্ভীরভাবে বলি, জাহাজের কেবিনগুলো ওয়াটার-টাইট বলে শুনেছি। বড়ো দেখে একটার মধ্যে ঢুকে ভাল করে দরজা এঁটে আজকের রাতটা কাটানো যাক তারপর কালকের কথা। কাল যদি ফের বেঁচে থাকি, তখন।
তাই করা গেল। স্টোর-রুম থেকে প্রচুর খাবার এনে সব চেয়ে বড়ো একটা কেবিনের মধ্যে আমরা আশ্রয় নিলাম। গোরা কতকগুলো টর্চ বাতি নিয়ে এসেছিল, তাদের আর আমাদের একসঙ্গে জ্বালাতে শুরু করলো। টর্চের সাহায্যে টর্চার করার নামই হচ্ছে জ্বালানো মেজমামা বললেন, এর চেয়ে জ্বালাতন আর কি আছে? আর ঠিক এই ঘুমোবার সময়টাতেই! বললেন মেজমামা।
অনেকক্ষণ কেটে গেল, কিন্তু রাত যেন আর কাটে না। যতক্ষণ সম্ভব এবং যতদূর সাধ্য, প্রাণপণে আমরা ঘুমিয়েছি; কিন্তু ঘুমানোর তো একটা সীমা আছে! গোরা সেই সীমানায় এসে পৌঁছেই ঘোষণা করে, এইবার ব্রেকফাস্ট করা যাক।
অ্যাঁ! এই রাত থাকতেই! শুয়েই আমি চমকে উঠি।
কী রাক্ষুসে ছেলে রে বাবা! মেজমামাও গর্জ্জন করেন, তোর কি ভোর হোতেও তর সইছে নারে?
