উপকূল থেকে আমরা এখন কদ্দুরে? মেজমামার প্রশ্ন।
দেড় শো কি দুশো মাইল হবে বোধ হয়। আমি বলি, ছসাত ঘণ্টা তো চলছে আমাদের জাহাজখানা!
বলতে বলতে ঢং ঢং করে অ্যালার্ম বেল বাজতে শুরু করলো এবং শ্রীমদগৌরাঙ্গদেব লাফাতে লাফাতে আবির্ভূত হলেন।–মেজমামা, দেখবে এসো, কী মজা! আপনিও আসুন শিরামবাবু! জাহাজের খালে হুহু করে জল ঢুকছে। কী চমৎকার! তার হাতাতালি আর থামে না।
অকুস্থলে উপস্থিত হয়ে দেখি, কাপ্তেন সেখানে দাঁড়িয়ে। খালাসীরা পাম্পের সাহায্যে জলনিকাশ করছে। চারিদিকেই দারুণ ত্রাস আর এ্যস্ততা। যাত্রীরা ভীত-বিবর্ণ মুখে খালাসীদের কাজ দেখছে। সমস্ত জনপ্রাণীর মধ্যে আমাদের গেরোই কেবল আনন্দে আত্মহারা। পাতালে যাবার পথ পরিষ্কার হচ্ছে কিনা ওর, কাজেই ওর ফুর্তি!
কেন অনর্থক পাম্প করে মরছে? আমাকেই প্রশ্ন করে গোরা। জাহাজটা ডুবে গেলেই তো ভাল হয়।
ভালটা যাতে সহজে না হয়, তারই চেষ্টা করছে, বুঝতে পারছো না? আমার কণ্ঠস্বরে উম্মা প্রকাশ পায়।কলিযুগে কেউ কি কারো ভাল চায়?
যা বলেছেন! ভারী অন্যায় কিন্তু! এক মুহূর্তের জন্য থামে সে–ডাঙ্গা এখান থেকে কদুর?
তা–দু-তিন মাইল হবে বোধ হয়। আমি ভেবে বলি।
মোট্টে! তাহলে তো সাঁতরেই চলে যেতে পারবো। সে যেন একটু হতাশ হয়। কোন দিকে বলুন তো ডাঙ্গাটা?
সোজা নিচের দিকে।
ওঃ তাই বলুন! ওর মুখে হাসি ফোটে আবার আপনি যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন।
নাঃ, ভয় কিসের! আমি জোর করে হাসি।
পাতালে যেতে হবে এবং পুরো পাঁচবচ্ছর হবে সেখানে। তার আগে চলছে না। কি বলুন? তাই তো? আমার মতের অপেক্ষা করে গোরা। সমুদ্রটা তলিয়ে দেখতে সে অস্থির।
পাতাল যেরকম জায়গা, সেখানে পুরো পাঁচমিনিটও থাকা যাবে কিনা এই রকম একটা সংশয় আমার বহুদিন থেকেই ছিল, পাতাল কাহিনীর একশ চৌত্রিশ পাতা পর্যন্ত পড়েও সে সন্দেহ আমার টলেনি, কিন্তু আমার অবিশ্বাস ব্যক্ত করে ওকে আর ক্ষুণ্ণ করতে চাই না।
হঠাৎ সে সচকিত হয়ে ওঠে–বইটা? সেই বইখানা?
ডেকেই পড়ে রয়েছে। আমি বলি।
ডেকে ফেলে এসেছেন? কী সর্বনাশ!–কত কাজে লাগবে এখন ঐ বইটা। কেউ যদি নেয়– সরিয়ে ফ্যালে? বলে গোরা বইয়ের খোঁজে দৌড়োয়।
কি রকম বুঝছ গতিকটা? মেজমামা এগিয়ে আসেন।
স্বয়ং জাহাজ তাঁর কথার জবাব দেয়। তার একটা ধার ক্রমশ কাত হতে থাকে, ডেকের সেই ধারটা পাহাড়ের গায়ের মতো চালু হয়ে নেমে যায়। সে ধারটা দিয়ে জলাঞ্জলি যাওয়া খুবই সোজা বলে মনেহয়। বসে বসেই সুড়ুৎ করে নেমে গেলেই হল। অ্যালার্ম বেল আরো জোর জোর বাজাতে থাকে। কাণ্ডেন লাইফবেটিগুলো নামাবার হুকুম দ্যান। জাহাজ পরিত্যাগের জন্য যাত্রীদের প্রস্তুত হতে বলেন।
লাইফবোট নামানোর জন্য তেমন হাঙ্গামা পোহাতে হলো। জাহাজ তো কাত হয়েই ছিল, সেই ধার দিয়ে দড়ায় বেঁধে ওগুলো ছেড়ে দিতেই সটান জলে গিয়ে, দাঁড়াল। আরোহীরাও লাইফবোটের অনুসরণে প্রস্তত হলেন। সাবধানতা এইজন্য যে একটু পা ফসকালেই একেবারে লাইফ আর লাইফবোটের বাইরে–সমুদ্রগর্ভেই সটান!
গোরার মেজমামা এবং আমি-আমাদেরও বিশেষ দেরি ছিল না। যেমন ছিলাম, তেমনি বোটে যাবার জন্যে তৈরি হলাম। এমন দুঃসময়ে লাগেজ, হোন্ড-অল বা সুটকেসের ভাবনা কে ভাবে? সন্দেহের বাক্সের কথাই কি কেউ মনে রাখে? কেই-বা সঙ্গে নিতে চায় সেসব?
কিন্তু গোরা? গোরা? কোথায় গেল সে এই সংকট মুহূর্তে? আমি গলা ফাটাই এবং মেজমামা আকাশ ফাটান–গোরার, কিন্তু কোনো সাড়াই পাওয়া যায় না।
কে জানে হয়তো কেবিন বই পড়ছে! আমার প্রকাশ পায়।
এই কি পড়বার সময়? মেজমামা খাপ্পা হয়ে ওঠেন–পড়াশুনা করার সময় কি এই?
ওর কি সময়-অসময়–জ্ঞান আছে? আমি বলি, যা ওর পড়ার ঝোঁক!
দুজনে আমরা কেবিনের দিকে দৌড়োই, নাঃ, কেবিন তো নেই, তখন এদিকে-ওদিকে, দিগবিদিকে ছোটছুটি শুরু করি কিন্তু গোরা! অবশেষে আমাদের জন্য সবুর না করে শেষে বোটখানাও ছেড়ে দেয়।
সবগুলি বোটকেই দিকচক্রান্তে একে একে অন্তর্হিত হতে দেখে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে মেজমামা বসে পড়ে। আমি পড়ি শুয়ে। সেই পরিত্যক্ত জাহাজের প্রান্তসীমায় তখন কেবলি আমরা দুজন। গোরা অথবা লাইফবোট–কার বিরহ আমাদের বেশি কাতর করে বলা তখন শক্ত।
খট করে হঠাৎ একটা শব্দ হতেই চমকে উঠি। দেখি শ্রীমান গৌরাঙ্গ হাসতে হাসতে অবতীর্ণ হচ্ছেন। সমুন্নত ডেকের চুড়ায় গিয়ে তিনি উঠেছিলেন।
কোথায় ছিলিরে এতক্ষণ? গোরাকে দেখতে পাবামাত্র সেখানে বসেই মেজমামা যেন কামান দাগেন।
কতক্ষণে বোটগুলো ছাড়ে, দেখছিলাম। গোরার উত্তর আসে, সবগুলো চলে যাবার পর তবে আমি নেবেছি।
কৃতার্থ করেছে। মনে মনে আমি কই।
মেজমামার দিক থেকে সহানুভূতির আশা কম দেখে ছেলেটা আমার গা ঘেঁসে দাঁড়ায়। কানে কানে বলে, পাতালে যাবার এমন সুযোগ কি ছাড়তে আছে মশাই? আপনিই বলুন না।
আমি চুপ করে থাকি। কী আর বলবো? আশঙ্কা হয় এমন কথা বলতে গেলেই হয়ত তা কান্নার মত শোনাবে। নিশ্চিত মৃত্যুর সম্মুখে কান্নাকাটি করে লাভ!
ঘাবড়াবেন না, ওর চাপা গলার সান্ত্বনা পাই। ফিরে এসে আপনিও প্রেমেনবাবুর মতো অমনি একখানা বইয়ের মত বই লিখতে পারবেন।
আমি শুধু বলি–হ্যাঁ, ফিরে এসে; ফিরে আসতে পারি যদি! মুখ ফুটে এর বেশি বলতে পারি না, মুখের ফুটো বুজে আসছিল আমার।
