গিলে ফ্যালে? তাহলে আর তোতলামি সারবে কি করে, সত্যিই ত! তা, তুমি নিজেরটা সারিয়ে ফেল, বুঝলে? রোগের গোড়াতেই চিকিৎসা হওয়া দরকার, দেরি করা ভাল না!
হতাশভাবে মাথা নেড়ে নিরঞ্জন জবাব দেয়-আ-আমার যে ডি-ডি-ডি- ডিসপেসিয়া আছে! হ হ-হজম কোরতে পা-পারবো কেন?
ও, ডিসপেপসিয়া থাকলে তোতলামি সারে না বুঝি?
তা-তা কেন? অ-আমিও গি-গিলে ফেলি!–আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম; নিরঞ্জন বলল, আ আমার কি আর পা-পাথর হ-হজম করবার ব-ব-বয়েস আছে?
তাইত! ভারি মুশকিল ত! তোমার চলছে কি করে? ছেলেরা বেতন দেয় ত নিয়ম মত?
উহুঁ–সব-ফি-ফি-ফ্রি যে! অ-অনেক সা-সাধাসাধি করে আনতে হয়েছে!
তবে তোমার চলছে কি করে?
কে-কেন? মা মা-মা-মার্বেল বেচে? এক একজন দ-দ-দশটা-বারোটা করে খায় রোজ! ওগুলো মু-মুখে রাখা ভা-ভা-ভারি শক্ত।
বটে বিস্ময়ে অনেকক্ষণ আমি হতবাক হয়ে রইলাম, তারপর আমার মুখ দিয়ে কেবল বেরোলো–ব-ব-বল কি!
যেমনি না নিজের কণ্ঠস্বর কানে যাওয়া, অমনি আমার আত্মপুরুষ চমকে উঠল! তাঁ, আমিও তোতলা হয়ে গেলাম নাকি! নাঃ, আর একমুহূর্তও এই মারাত্মক জায়গায় নয়! তিন লাফে সিঁড়ি টপকে ঊর্ধ্বশ্বাসে বেরিয়ে পড়লাম সদর রাস্তায়।
পাতালে বছর খানেক
তখনই বারণ করেছিলাম গোরাকে সঙ্গে নিতে। ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে কোনো বড় কাজে যাওয়া আমি পছন্দ করিনে।
আর ঐ অপয়া বাইখানা। প্রেমেন মিত্তিরের পাতাল পাঁচ বছর! যখনই ওটা ওর বগলে দেখেছি, তখনই জানি যে, বেশ গলে পড়তে হবে।
বেরিয়েছি সমুদ্র যাত্রায় পাতাল যাত্রায় তো নয়! সুতরাং কী দরকার ছিল ও বই সঙ্গে নেবার? আর যদি নিতেই হয়, তবে আমার বাড়ী থেকে পালিয়ে কী দোষ করলো? যতো সব বিদঘুঁটে কাণ্ড ঐ ছেলেটার! মনে মনে আমি চটেই গেলাম।
শেষে কিন্তু ভড়কাতে হলো জাহাজে উঠেই যখন বইয়ের করামণ ও ব্যক্ত করলে। আমাকে রেলিং-এর একপাশে ডেকে এনে চোখ বড়ো করে চাপাগলায় বললে, মেজ-মামাকে বলবেন না কিন্তু। খবু ভালো হয়, যদি জাহাজটা ডুবে যায়! আমি বললাম, কি ভালোটা হয়?
সটান পাতালে চলে যাওয়া যায় এবং সেখানে–এই বলেই গোরা উৎসাহের সহিত বইখানার পাতা ওলটাতে শুরু করে গোড়ার থেকেই।
আমি ওকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম যে, নিতান্তই অকস্মাৎ প্রচণ্ড সাইক্লোন কিংবা বরফের পাহাড়ের ধাক্কা যদি না লাগে, তাহলে সে রকম সুযোগ পাওয়াই যাবে কিনা সন্দেহ। আর সেই দুরাশা পোষণ করেই যদি ঐ বই এনে থাকে, তবে তা সে খুবই ভুল করেছে, কারণ আজকালকার নিরাপদ সমুদ্রযাত্রার পাতালের ভ্রমণ-কাহিনীকে কাজে লাগানো ভারী কঠিন।
আমার কথায় সে দমে গেল। গম হয়ে থেকে অবশেষে বললে–তাহলে কি কোনই আশা নেই একেবারে?
দেখছি না তো! নিস্পৃহকণ্ঠে আমি জবাব দিই–তাছাড়া, তুমি ব্যতীত জাহাজের এতগুলি প্রাণীর মধ্যে কারো ভুলে পাতালে যাবার শখ আছে বলেও আমার মনে হয় না!
বলেন কি? গোরা যেন আকাশ থেকে পড়ল–তা কখনো হয়? আপনিও কি যেতে চান না পাতালে?
আমি প্রবলবেগে ঘাড় নাড়লাম–পাতাল দূরে থাক,হাসপাতালেও না। মুখ ফাঁক করলাম আমার–কেউ কি মরতে যায় ওসব জায়গায়?
আপনি মিথ্যা বলছেন। গোরা অবিশ্বাসের হাসি হাসল, পাতালে যাবার ইচ্ছা আবার হয় না মানুষের!
আমার হয় না। আমাকে জানো না তুমি। আমি জানালাম, আমার পাতালে যাবার ইচ্ছে হয় না, মোটর চাপা পড়বার ইচ্ছা হয় না, রেলে কাটা যাবারও ইচ্ছা করে না। আমি যেন কিরকম!
আমি সঙ্গে থাকব, ভয় কি আপনার! ও আমাকে উৎসাহ দেয়– মেজমামাকে দেখে আসি, আপনি ততক্ষণ পড়ুন বইখানা।
বইটা হাতে নিয়ে ভাবলাম এটাকে এখনই, আমাদের আগেই পাতালে পাঠিয়ে দিলে কেমন হয়। সিঙ্গাপুরে যাচ্ছি, সিঙ্গা ফুঁকতে তো যাচ্ছিনে, আকাশ-পাতালের বৃত্তান্ত আমার কি কাজে লাগবে? তারপর কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বইটা পড়তে শুরু করি শেষের দিক থেকে। গোড়ার দিক থেকে পড়বে না বলেই শেষের দিকটাই ধরি আগে।
শেষপৃষ্ঠা থেকে আরম্ভ করে একশ চৌত্রিশ পাতা পর্যন্ত এগিয়েছি–কিংবা পিছিয়েছি–এমন সময়ে কর্ণবিদারী এক আওয়াজ এলো। সেই মুহূর্তেই আমার হাত থেকে খসে পড়ল বইটা এবং খসে পড়লাম চেয়ার থেকে। অত বড় জাহাজটা থর থর করে কাঁপতে লাগল মুহূর্মুহূ।
উঠব কিংবা অমনি করে পড়েই থাকব, অর্থাৎ উঠবার আদৌ আবশ্যক হবে কিনা, ইত্যাকার চিন্তা করছি, এমন সময় গোরার মেজমামা হন্দদন্ত হয়ে ছুটে আসেন।
এই যে, বেঁচে আছো? বেঁচেই আছো তাহলে। হার্টফেল কররানি এখনো?
উঁহু! সংক্ষেপে সারি।
আমার তো পিলে ফাটার উপক্রম। জানান গোরার মামা।
ব্যাপার কি? কি হয়েছে? এঞ্জিন বা করলো নাকি।
উঁহু আরেকখানা জাহাজ। জাহাজে জাহাজে ঠোকাঠুকি।
কী সর্বনাশ।
মনে হচ্ছে কোনো চারা জাহাজ। চোরাই মালের জাহাজ টাহাজ হবে বোধ হয়। ধাক্কা মেরেই ছুটেছে। ঐ দ্যখো না!
ঐ অবস্থাতেই ঘাড় উঁচু করে তাকালাম, আরেকখানা জাহাজের মতই দেখতে, সুদূর দিকচক্রবালের দিকে নক্ষত্ৰবেগে পালাচ্ছে। আমাদের শ্রীমান ততক্ষণে কাঁপুনি থামিয়ে স্তব্ধ হয় দাঁড়িয়েছেন স্তম্ভিত হয়ে।
দুধারেই এনতার ফাঁকা, দুশো জাহাজ যাবার মতন চওড়া পথ, তবু যে এরা কি করে মুখোমুখি আসে, মারামারি করে, আমি তো ভেবে পাই না। আমি বিরক্তি প্রকাশ করি।
