যেমন করে ও আমার আস্তিন চেপে ধরল, তাতে বাধ্য হয়ে জামা বাঁচাতে আমাকে সায় দিতে হলো।
তোতলাদের একটা ইস্কুল খুলব, সবই ঠিক, তোতলাকে রাজিও করিয়েছি, কেবল একটা পছন্দসই নামের অভাবে ইস্কুলটা খুলতে পারছি না। একটা নামকরণ করে দাও না তুমি। সেইজন্যেই এলাম।
কেন, নাম তো পড়েই আছে–নিঃস্বভারতী,–চমৎকার!–মানে, বাক্য, যাদের নিঃস্ব–কিনা, থেকেও নেই, তারাই হলো গিয়ে নিঃস্বভারতী।
উঁহু ও নাম দেওয়া চলবে না। কারণ রবিঠাকুর ভাববেন বিশ্বভারতী থেকেই নামটা চুরি করেছি।
তবে একটা ইংরিজি নাম দাও–Sanatorium for faltering Tongues (স্যানাটোরিয়াম ফর ফলটারিং টাংস) বেশ হবে।
কিন্তু বড় লম্বা হলো যে।
তাতো হলোই। সেদিন দেখবে, তোমার ছাত্ররা তাদের ইস্কুলের পুরো নামটা সটান উচ্চারণ করতে পারছে, কোথাও আটকাচ্ছে না, সেদিনই বুঝবে তারা পাশ হয়ে গেছে। তখন তারা সেলাম ইকে নিতে পারে। নাম-কে নাম, কোশ্চেন পেপার-কে কোশ্চেন পেপার।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। এই নামটাই থাকল।–বলে নিরঞ্জন আর দ্বিতীয় বাক্যব্যয় না করে সবেগে বেরিয়ে পড়ল, সম্ভবত সেই মুহূর্তেই তার ইস্কুল খোলার সু-মতলবে।
মহাসমারোহে এবং মহা সোরগোল করে নিরঞ্জনের ইস্কুল চলছে। অনেকদিন এবং অনেক ধার থেকেই খবরটা কানে আসছিল। মাঝে মাঝে অদম্য ইচ্ছেও হতো একবার দেখে আসি ওর ইস্কুলটা, কিন্তু সময় পাচ্ছিলাম না মোটেই। অবশেষে গত গুড়ফ্রাইডের ছুটিটা সামনে পেতেই ভাবলাম–নাঃ এবার দেখতেই হবে ওর ইস্কুলটা। এ সুযোগ আর হাতছাড়া নয়। নিরঞ্জন ওদিকে দেশের এবং দশের উপকার করে মরছে, আর আমি ওর কাছে গিয়ে একে একটু উৎসাহ দেব, এইটুকু সময়ও হবে না আমার! ধিক আমাকে!
মার্বেলের গুলির কল্যাণে নিশ্চয়ই অনেকের তোতলামি সেরেছে এতদিন। তাছাড়া আনুষঙ্গিকভাবে আরো অনেক উপকার যেমন দাঁত শক্ত, মুখের হাঁ বড়, ক্ষুধাবৃদ্ধি–এসবও হয়েছে। এবং ডিমস্থিনিস হবার পথেও অনেকটা এগিয়েছে ছাত্ররা–অন্ততঃ ডিম পর্যন্ত তো এগিয়েছেই, এবং যেরকম কষে তা দিচ্ছে নিরঞ্জন, তাতে স্থিনিসেরও বেশি দেরি নেই হয়ে এল বলে।
ঠিকানার কাছাকাছি পৌঁছাতেই বিপর্যয় রকমের কলরব কানে এসে আঘাত করল; সেই কোলাহল অনুসরণ করে স্যানাটোরিয়াম ফর ফলটারিং টাস খুঁজে বের করা কঠিন হলো না। বিচিত্র স্বরসাধনার দ্বারা ইস্কুলটা প্রতিমুহূর্তের যেন প্রমাণ করতে উদ্যত যে, ওটা মুক-বধিরদের বিদ্যালয় নয়–কিন্তু আমার মনে হলো, তাই হলেই ভাল ছিল বরং–ওদের কষ্ট লাঘব এবং আমাদের কানের আত্মরক্ষার পক্ষে।
আমাকে দেখেই কয়েকটি ছেলে ছুটে এল–কা-কা-কা-কা-কা-কা-কা-কে চান?
দ্বিতীয়টি তাকে বাধা দিয়ে বলতে গেল–মা-মা-মা-মা–কিন্তু মা-মার বেশি আর কিছুই তার মুখ দিয়ে বরোলে না।
তখন প্রথম ছাত্রটি দ্বিতীয়ের বাক্যকে সম্পূর্ণ করল–মাস্টার বাবা-বা- বা-আমি বললাম কাকাকে, মামাকে কি বাবাকে কাউকে আমি চাই না। নিরঞ্জন আছে?
ছেলেরা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চায়ি করতে লাগল। সে কি, নিরঞ্জনকে এরা চেনে না? এদের প্রতিষ্ঠাতা নিরঞ্জন, তাকেই চেনে না! কিম্বা যার যার নাম উচ্চারণ–সীমার বাইরে, তাকে না চেনাই এরা নিরাপদ মনে করেছে?
একজন আধ্যবয়সী ভদ্রলোক যাচ্ছিলেন ঐখান দিয়ে, মনে হলো এই ইস্কুলের ক্লার্ক, তাঁকে ডেকে নিরঞ্জনের খবর জিজ্ঞাসা করতে তিনি বললেন–ও মাস্টারবাবু? এই পর্যন্ত তিনি বললেন, বাকিটা হাতের ইশারা দিয়ে জানালেন যে তিনি ওপরে আছেন। এই জ্বলোকও ভোলা নাকি?
আমাকে দেখেই নিরঞ্জন চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠল–এই যে অ- অনেকদিন পরে! খ-খবর ভাল?
অ্যাঁ? নিরঞ্জনও তেতলা হয়ে গেল নাকি? না ঠাট্টা করছে আমার সঙ্গে? বললাম–তা মন্দ কি! কিন্তু তোমার খবর তো ভাল মনে হচ্ছে না? তোতলামি অ্যাকটিস করছ কবে থেকে?
প্যা-প্যা-পর্যাক-এ্যাকটিস করব কে-কেন? তো-তো-তোতলামি আবার কে-কেউ প্রকটিস করে?
তবে তোতলামিতে প্রমোশন পেয়েছ বলো!
ভাই হি-হি-হিরান্না-ন্না-ন্না-ন্না-ন্না বলতে বলতে নিরঞ্জনের দম আটকে যাবার যোগাড় হলো। অমি তাড়াতাড়ি বললাম–হিরণ্যাক্ষ বলতে যদি তোমার কষ্ট হয়, না হয় তুমি আমাকে হিরণ্যকশিপুই বোলো। কশিপুর মধ্যে দ্বিতীয় ভাগ নেই।
স্বাস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিরঞ্জন বলল–ভাই-হি-হিরণ্যকশিপু, আমার এই স্যাটো টো-টো টো-টো।
এবার ওর চোখ কপালে উঠল দেখে আমি ভয় খেয়ে গেলাম। ইস্কুলের লম্বা নামটা সংক্ষিপ্ত ও সহজ করার অভিপ্রায়ে বললাম–হ্যাঁ, বুঝেছি, তোমার এই স্যানাটোজেন, তারপর?
নিরঞ্জন রীতিমত চটে গেল–স্যানাটোজেন? আমার ইস্কুল হো-হো- হলো গিয়ে স্যা স্যানাটোজেন? স্যানটোজেন তো এ-একটা ও-ও-ওষুধ!
আহা ধরেই নাও না কেন! তোমার ইস্কুলও তো একটা ওষুধ বিশেষ! তোতলামি সারানোর একটা ওষুধ নয় কি?
অতঃপর নিরঞ্জন খুশি হয়ে একটু হাসল। ভরসা পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম–তা, তোমার ছাত্ররা কদ্দুর ডিমস্থিনিস হলো?
ডি-ডিম হলো!
অর্ধেক যখন হয়েছে, তখন পুরো হতে আর বাকি কি! আমি ওকে উৎসাহ দিলাম।
নিরঞ্জন বিষণ্ণভাবে ঘাড় নাড়ে অ-আর হবে না! মা-মা-মার্বেলেই মুখে রাখতে পা-পারে না তো কি-কি-কি-করে হবে?
মুখে রাখতে পারে না? কেন?
স-স-সব গি-গিলে ফ্যালে!
