আর মামা? মামাও বেরিয়ে আসেন–তবে কিনা, একটু দেরি করে, আর মেডিক্যাল কলেজ হয়ে। মাসতিনেক বাদে।
আর, তার পরেই–সেই মাথার ফাঁড়ায়– সব চুল উঠে গেল মামার, টাক পড়ে গেল তাঁর। হবেই, জানা কথা। গরম জল চুলের বেজায় ক্ষতিকর। তাতে চুল উঠে যায়; পড়েছিলাম হাইজিনে। কথাটা মিথ্যে নয়। ট্যাকসো না দিয়ে চা খেতে গেলে যা হয়, বিনে পয়সায় ঐ টাক–Show!
পরোপকারের বিপদ
আমার বন্ধু নিরঞ্জন ছোটবেলা থেকেই বিশ্বহিতৈষী–ইংরেজীতে যাবে বলে ফিলানথ্রপিস্ট। এক সঙ্গে ইস্কুলে পড়তে ওর ফিলানথ্রিপিজমের অনেক ধাক্কা আমাদের সইতে হয়েছে। নানা সুযোগে দুর্য্যোগে আমাদের হিত করবেই, একেবারে বদ্ধপরিকর–আমরাও কিছুতেই দেব না ওকে হিত করতে। অবশেষে অনেক ধব্বস্তাধ্বস্তি করে, অনেক কষ্টে, হয়ত ওর হিতৈষিতার হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে পেরেছি।
হয়ত ফুটবল ম্যাচ জিতেছি, সামনে এক ঝুড়ি লেমনেড, দারুন তেষ্টাও এদিকে–ও কিন্তু কিছুতেই দেবে না জল খেতে, বলেছে, এত পরিশ্রমের পর জল খেলে হার্টফেল করবে।
আমরা বলেছি, করে করুক, তোমার তাতে কি?
জল না খেলেও যে মারা যাব, দেখছ না?
সে গম্ভীর মুখে উত্তর দিয়েছে–সেই ভাল।
তখন ইচ্ছে হয়েছে আরেকবার ম্যাচ খেলা শুরু করি–নিরঞ্জনকেই ফুটবল বানিয়ে। কিম্বা ওকে ক্রিকেটের বল ভেবে নিয়ে লেমনেডের বোতলগুলোকে ব্যাটের মত ব্যবহার করা যাক।
পরের উপকার করবার বাতিকে নিজের উপকার করার সময় পেত না ও। নিজের উপকারের দিকটা দেখতেই পেত বা বুঝি। এক দারুণ গ্রীষ্মের শনিবারের হাফ-স্কুলের পর মাঠের ধায় দিয়ে বাড়ি ফিরছি, নিরঞ্জন বলে উঠল–দেখছ হিরণ্যাক্ষ দেখতে পাচ্ছ?
কী আবার দেখব? সামনে ধূ ধূ করছে মাঠ, একটা রাখাল গরু চরাচ্ছে, দু-একটা কাকা-চিল এদিকে ওদিকে উড়ছে হয়ত এ ছাড়া আর কোনো দ্রষ্টব্য পৃথিবীতে দেখতে পেলাম না। ভাল করে আকাশটা লক্ষ্য করে নিয়ে বললাম–হ্যাঁ দেখেছি, এক ফোঁটা ও মেঘ নেই কোথাও। শিগগির যে বৃষ্টি নামবে সে ভরসা করি না।
ধুত্তোর মেঘ! আমি কি মেঘ দেখতে বলেছি তোমায়? ঐ যে রাখালটা গরু চরাচ্ছে দেখছ না!
নিশ্চয়ই! এই দুপুর রোদে ঘুরলে বেচারাদের মাথা ধরবে না? গরু বলে মাথাই নয় ওদের। মানুষ নয় ওরা? বাড়ি নিয়ে যাক বলে আসি রাখালটাকে সকাল-বিকেলে এক-আধটু হাওয়া খাওয়ালে কি হয় না? সেই হলো গে বেড়ানোর সময়–এই কাটফাটা রোদ্দুরে এখন এ কি?
কিন্তু রাখাল বাড়ি ফিরতে রাজি হয় না–গরুদের অপকার করতে সে বদ্ধপরিকর।
নিরঞ্জন হতাশ হয়ে ফিরে হা-হুঁতাশ করে–দেখছ হিরণ্যাক্ষ, ব্যাটা নিজেও হয়ত মারা যাবে এই গরমে, কিন্তু দুনিয়ার লোকগুলোই এই রকম! পরের অপকারের সুযোগ পেলে আর কিছু চায় না, পরের অপকারের জন্যে নিজের প্রাণষ দিতেও প্রস্তুত!
যখন শুনলাম সেই নিরঞ্জন বড়লোকের মেয়ে বিয়ে করে শুশুরের টাকায় ব্যারিস্টারী পড়তে বিলেতে যাচ্ছে, তখন আমি রীতিমত অবাক হয়ে গেলাম। যাক, এতদিনে তাহলে ও নিজেকে পর বিবেচনা করতে পেরেছে, তা না হলে নিজেকে ব্যারিস্টরী পড়তে পাঠাচ্ছে কি করে? নিজেকে পর না ভাবতে পারলে নিজের প্রতি এতখানি পরোপকার করা কি নিরঞ্জনের পক্ষে সম্ভব?
অকস্মাৎ একদিন নিরঞ্জন আমার বাড়ি এসে হাজির। বোধ হয় বিলেত যাবার আগে বন্ধুদের কাছে বিদায় নিতেই বেরিয়েছিল। অভিমানভরে বললাম- চুপি-চুপি বিয়েটা সারলে হে, একবার খবরও দিলে না বন্ধুদেব? জানি, আমাদের ভালর জন্যই খবর দাওনি, অনেক কিছু ভালমন্দ খেয়ে পাছে কলেরা ধরে, সেই কারণেই কাউকে জানাওনি, কিন্তু না হয় না-ই খেতাম আমরা, কেবল বিয়েটাই দেখতাম। বউ দেখলে কানা হয়ে যেতাম না ত!
কি যে বলো তুমি! বিয়েই হলো না ত বিয়ের নেমন্তন্ন! নিজের উপকার করব তুমি তাই ভেবেছ। আমাকে? পাগল! ভাবছি তোতলাদের জন্যে একটা ইস্কুল খুলব। মুক-বধিরদের বিদ্যালয় আছে, কিন্তু তোতলাদের নেই। অথচ কি পসিবিলিটিই না আছে তোতলাদের!
কি রকম?–আমি অবাক হবার চেষ্টা করি।
জানো? প্রসিদ্ধ বাগ্মী ডিমস্থিনিস আসলে কি ছিলেন? একজন তোতলা মাত্র। মুখে মার্বেলের গুলি রাখার প্র্যাকটিস করে তোতলামি সারিয়ে ফেললেন। অবশেষে, এত বড় বক্তা হলেন যে অমন বক্তা পৃথিবীতে আর কখনো হয়নি। সেটা মার্বেলের গুলির কল্যাণে কিম্বা তোতলা ছিলেন বলেই হলো, তা অবশ্য বলতে পারিনা।
বোধহয় ওই দুটোর জন্যই–আমি যোগ দিলাম।
নিরঞ্জন খুব উৎসাহিত হয়ে উঠল–আমারো তাই মনে হয়। আমিও স্থির করেছি বাংলাদেশের তোতলাদের সব ডিমস্থিনিস তৈরি করব। তোতলা তো তারা আছেই, এখন দরকার শুধু মার্বেলের গুলির। তাহলেই ডিমস্থিনিস হবার আর বাকি কি রইল?
আমি সভয়ে বললাম–কিন্তু ডিমস্থিনিসের কি খুব প্রয়োজন আছে এদেশে?
সে যেন জ্বলে উঠল–নেই আবার! বক্তার অভাবেই দেশের এত দুর্গতি, লোককে কাজে প্রেরণা জাগে না। কেন, বক্তৃতা ভাল লাগে না তোমার?
থামলে ভারি ভাল লেগে যায় হঠাৎ, কিন্তু যখন চলতে থাকে তখন মনে হয় কালারাই পৃথিবীতে সুখী।
আমার কথায় কান না দিয়া নিরঞ্জন বলে চলল–তাহলেই দ্যখো, দেশের জন্যে চাই বক্তা, আর বক্তার জন্যে চাই তোতলা। কেননা ডিমস্থিনিসের মতো বক্তা কেবল তোতলাদের পক্ষেই হওয়া সম্ভব, যেহেতু ডিমস্থিনিস নিজে তোতলা ছিলেন। অতএব ভেবে দয়াখো, তোতলারাই হলো আমাদের ভাবী আশাভরসা, আমাদের দেশের ভবিষয়ৎ।
