অসুখ করেছে মামার। আমি জানালাম।
অসুখ করেছে তো এখানে কি? এখানে কি? ডাক্তারখানায় নিয়ে যাও! সোজা পথ দেখলো সেঃ ঐ যে, সামনেই তো ডাক্তারখানা। চোখের সামনেই দেখচো না?
ওষুধে সারবার অসুখ নয় এ। আমি বলে–এ হোলোগে হিস্টিরিয়া। ভালোমন্দ কিছু পেটে পড়লেই সারে। দেখছেন না, হাঁ করছে কি রকম?
হাঁ করছে? কুইনিনই হচ্ছে এর একমাত্র দাবাই, আছে আমার কাছে, এক্ষুণি আমি আনছি, দাঁড়াও।
আমি তো দাঁড়িয়েই ছিলাম, কিন্তু মামা আর দাঁড়ালেন না!
কুইনিনের নাম শুনেছি তার হ বুজে এসেছিল! হাঁ-হাঁ করে তিনি উঠে পড়লেন। সেরে উঠলেন চটপট। সরে আসতেও তার দেরি হলো না। এক মিনিটও আর তিনি দাঁড়ালেন না সেখানে। তারপর আর একটু রেস্ট না নিয়ে রেস্তেরা থেকে দৌড়ে আমরা বেরিয়ে এলাম।
একটা দোকান অমনি-অমনি চলে গেল আমাদের। যাক গে, গোটা বেন্টিক ইসটিই পড়ে আছে এখনো। বহরে খাটো, দেখতে বেঁটে হলে কি হবে, চায়ের দোকানের কিছু কমতি নেই রাস্তায়! আর এই শহরেই বা কম কি? আর, সব চা-ওয়ালাই এমনি ডাক্তার নয় সবার কাছেই কিছু কুইনিন মজুত নেই।!
পরের দোকানটাতেই মামার পেটে চা-মামলেট প্রভৃতিরা এসে পড়ে।
আর পড়তে থাকে পরের পর। তারপর থেকে চলতে থাকে এমনি ধারা। একবার আমি পড়ি, মামা ওঠেন। তারপর মামা পড়েন, আমি তাঁর শুষা করি। মামার আর আমার সেবায় উঠে পড়ে লাগি–পরম্পরায়। চললো এই রকম দোকানের পর দোকান।
চৌহদ্দিটার চারধারে চক্কর মেরে চা-র চক্রান্ত চলতে থাকে আমাদের। খেয়ে খেয়ে পেট ফুলে ঢোল হয়ে উঠলো দুজনেরই। আমাদের জয়ঢাকও বলা যায়।
বেন্টিক স্ট্রিটের মোড় ঘুরে কফি-হাউসের পাশ কাটিয়ে যাই, সেখানে ঢুকতে সাহস হয় না আমাদের। কফি-হাউসের মতন অত বড় স্টেজে অভিনয় করা কি চাট্টিখানি? অগত্যা স্যান্ডউইচ, পটেটো-চিপ আর কাজুবাদামের মায়া কাটিয়ে, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ দিয়ে ফের আসি ধর্মতলার মোড়টায়। বেন্টিক স্ট্রিটের গোড়াতেই ঘুরে আসি আবার।
চা খেয়ে-খেয়ে মানুষ চাতাল হয় কি না জানি না, কিন্তু যেতে-যেতে আর খেতে-খেতে পথঘাট আর দোকানপাট কখন যে গুলিয়ে গেছল আমাদের! আবার যে আমরা ঘুরপাক খেয়ে আগের দোকানে সবরের আগেকারটায় ফিরে এসেছি তো খেয়ালই হয়নি একদম।
চমক ভাঙল যকন টনক নড়ল দোকানদারের–আরে, এরা যে আবার ফিরে এসেছে রে! ঘুরে এসেছে আবার! দ্যাখ দ্যাখ, ফের সেই সেই হিস্টিরিওয়ালারা!
খালি দোকানদারই নয়, আগের চাপায়ীদের যারা তখন সেই দোকানে ছিল, তারাও বেশ অবাক হলো আমাদের আবিভার্বে।
বেয়ারিং চিঠির মতন ফের আমাদের ফেরত আসতে দেখে চাওয়ালাকে মোটেই খুশি দেখা গেল না। বেয়ারিং ডাক মানেই তো বেয়াড়া এক ডাকাতি। গাঁটের পয়সা খসিয়ে তাকে খালাস কর? আমাদের মতো অখদ্যে যত অখদ্দেরকে খাইয়ে খাইয়ে লাস কর! তাতে কার লালসা হয়?
কিন্তু ভেবে দেখলে, এতে এমন অবাক হবার কি ছিল? হিস্টিরি যখন রিপিট করে, তখন হিস্টিরিয়া কি রিপিট করতে পারে না? অবশ্যি, একটা খুঁত হয়েছিল বটে, সামান্যই সেই একটুই যা গলদ এক জায়গায়! মামার পালা পড়েছিল এবার! আমার হিস্টিরিয়া মামার জিওগ্রাফিতে রিপিট করেছিল এইটুকুই যা! হিস্টিরি আর জিওগ্রাফিতে গোল বেধেছিল শুধু এইখানেই ইতিহাস আর ভূগোল পালটে ছিল এই একটুখানিই। এমন কিছু ইতরবিশেষ নয়।
আমাদের অজ্ঞাতসারে, আমার হিস্টিরিয়া, মামার মানচিত্রে কম্পমান হয়ে দেখা দিয়েছিলো।
একটুকুই যা খুঁত। নামমাত্রই। এছাড়া, আর সবই আমরা ঠিক করেছি। জামার বোম খোলা, খবরের কাগজের হাওয়া লাগান বিলকুল! আমার দিক থেকে কোন ত্রুটি হয়নি। মামার অভিনয়ও যদ্দুর নিখুঁত হয়। কিন্তু হলে কি হবে, দোকানদাররা তবুও কেমন খুঁতখুঁত করে।
অ্যাঁ? এরকমটা হোলে যে? এ-রকম কেন? সেবারে দেখলাম বাচ্চাটার, এবারে দেখছি ধাড়ীটাকে ধরেছে। অ্যাঁ, এ কিরকমের ব্যায়রাম? খালি আওড়ান।
ভারী শক্ত ব্যায়রাম। আমি বললাম–ছোঁয়াচে ব্যায়রাম কি না! এপি ডেমিক তো একেই বলে। আমার থেকে মামার হয়েছে। মড়ক হলে যেমন হয়ে থাকে। যাই হোক, এ হচ্ছে হিস্টিরিয়া, এর ওষুধ হচ্ছে মামলেট। ডবল মামলেট। নিদেন একখানা মোগলাই পরোটা হলেও হয়।
কুছ পরোয়া নেই। সারাচ্ছি আমি এই ছোঁয়াচে। এই দণ্ডেই। এই! নিয়ায় তো গরম জলের কেটলিটা। হাঁকলো সেই চা-ওয়ালা।চায়ের দরকার নেই। পারেটারও পরোয়া করে না। সুষ্ঠু গরম জলেই সারবে এই রোগ।
টগবগে ফুটন্ত জলের কেটলিটা এসে পড়লো। চায়ের জল গরম হচ্ছিল যেটায়।
উপুর কর। দে উপুর করে পুরো কেটলিটা এই লোকটার উপর। হ্যাঁ তার আগে এই ছোঁড়াটার মাথাতেও ছটাকখানেক ছাড়।
শুনতে না–শুনতেই আমি ছটকে আসি–-বারে। আমি কেন? আমাকে কেন? আমার মাথায় কিসের জন্যে? আমার তো হিস্টিরিয়া হয়নি?
হয়নি, কিন্তু হতে কতক্ষণ? প্রিভেনসন ইজ বেটার দ্যান কিওর, পড়োনি বইয়ে? ব্যায়রাম হবার আগেই তো সারাতে হয়। কে জানে, তোমার হয়তো ফের জিওগ্রাফিয়া হতে পারে, সে আরো শক্ত অসুখ! আরো বেশি ছোঁয়াচে। তার আগেই আরাম করা যাক তোমায়।
আরামের কথা পাড়তেই আমি লাফ মারি। এক রাম লাফ। রামরাজ্যসুলভ লাভ! আর সেই এক লাফেহ সারা ধড়ামতলা পেরিয়ে আসি।
