ও মা, মা গো! ও মামা গো!–তারস্বর বেরুতে থাকে আমার। তাড়িতে বার্তার মতই চাপা যায় না কিছুতেই।
দেখেশুনে ব্যস্ত হয়ে উঠলো দোকানদার। সেই সঙ্গে, দোকানে বসে যারা চা খাচ্ছিল তারাও–কি হয়েছে, কি হয়েছে এর?
হিস্টিরিয়া আছে ছেলেটার। জানালেন মামা।
হিস্টিরিয়া! কী সর্বনাশ!
না, ও এমন কিছু না। ভাবনার কিছু নেই। খানিক একটু হাত-পা চালবে চাঁচাবে, এই রকম। তারপর দুয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেরে যাবে আপনা থেকেই।
দু-এক-ঘন্টা! শুনেই তো আর্তনাদ করে উঠেলো দোকানদার–দু-এক ঘণ্টা কি গো?
না না, ভয়ের কিছু নেই। অজ্ঞাত হয়ে পড়বে এক্ষুণিই। তারপর ওর শিরদাঁড়া বেঁকে যাবে। ধনুষ্টঙ্কার হতে পারে, হয়তো, তবে ভাববেন না আপনারা। ঘাবড়াবেন না কিছু সাধারণতঃ ওর ধনুষ্টঙ্কার বড় একটা হয় না।
কিন্তু ছোট একটাও তো হতে পারে? কাটলেট হাতে করে একজন এগিয়ে এলো : সেও তো খুব ভাল নয়। অন্তত দেখতে শুনতে ভাল নয় নিশ্চয়ই।
দেখতে? না, দেখতে ভাল না, সেকথা ঠিক। সায় দিলেন মামা শিরদাঁড়া বেঁকে যাওয়া কি দেখতে কখনো ভাল হয়? সে ভারি বিশ্রী। সত্যিই!
চায়ের দোকানের ইতর-ভদ্র সবাই এসে ঘিরে দাঁড়ালো। মামা আরো জোরে জোরে হাওয়া করতে লাগলেন আমায়।
কি করলে সারে? ওষুধ-টষুধ কিছু নেই এর? জিগ্যেস করলেন এক ভদ্রলোক।
এর আর ওষুধ কি? এমনিতেই সারবে একটু সময় নেবে খালি, এই যা। ধাক্কাটা কেটে গেলে সামলে উঠবে আপনিই। তবে বলকর কিছু একটা ওর পেটে পড়লে তার আগেই হয়তো সামলানো যায়। দুধ-টুধ আছে? দিতে পারেন একটা গরম করে? নিদেন এক কাপ গরম চা হলেও চলে।
এক গেলাস গরম দুধ এলো চিনি মেশানো! এক পেয়ালা চাও পেলাম, চা-টা আর আমি খেলাম না, অকারণ নষ্ট হয়ে যায় কেন, তাই কষ্ট করে মামাই সেটা মারলেন। সহানুভুতিরপরবশ একজন বললেন–আহা, শুধু দুধে কি হবে? একটু পাউরুটি ফেলে দাও ওতে। কিংবা একটা মামলেট করে দাও না ছেলেটাকে! পেটে কিছু শক্ত খাবার না পড়লে কি শক্তি আসে? মামলেট পড়লেই সামলে উঠবে মনে হয়। আচ্ছা, আমি দিচ্ছি দাম, দাও ওকে একটা মামলেট।
ডবল ডিমের মামলেট। বলতে মামা লেট খেলো না একটুও। মনে মনে মামার ধন্যবাদ জানালাম। এমন না হলে মামা?
মামলেট খেয়ে সামলালাম সত্যিই। কিন্তু একটুখানি, ওতে কি এই প্রচণ্ড ক্ষিদে মেটে? ফের আমার উপসর্গগুলি ফিরে আসতে লাগলো। আবার আমি অজ্ঞান হবার মত হলাম, এলিয়ে পড়লাম চেয়ারে। হাত-পা খিচুনি শুরু হলো আবার।
একটু ঘোলের শরবত করে দিতে পারনে? এ-ব্যারামে ঘোলটা খুব উপকারী।
মামার বললেন যেন একটু নিরুপায় হয়েই–অবশ্যি, অভাবে মাংসের জুস কি মুর্গির সুরুয়া হলেও হয়।
চায়ের দোকানে আর ঘোল-টোল কোথায়? অভাবে, মাংসের ঝোলই এলো কয়েক টুকরো মাংসও এলো সেই সঙ্গে। দু-তিন পীস রুটিও এসে গেল তার সাথে। এলোচা। খেয়ে-টেয়ে সত্যিই এবার আমি চাঙ্গা হলাম। পায়ে জোর এলো, গায়ে জোয়ার। এতক্ষণে আমার হিস্টিরিয়া ছাড়লো। উঠে দাঁড়ালাম আমি, ছাড়লাম সেই দোকান। পাড়ি দিলাম আমরা আরেকটায়।
পরেরটা একটা রেস্তোরাঁ। এবার ছিলো মামার অসুখের পালা। আমার সমস্ত দুর্লক্ষণ তখন দেখা দিলো মামার। আর আমি তার হেফাজতে রইলাম।
রেস্তারার এক কোণে মামাকে বসিয়ে গলার বোতামগুলো খুলে দিলাম পটাপট। খবরের কাগজের অভাবে নিজের শার্ট খুলেই হাওয়া করতে লাগলাম। নার্সিং-এর আমার মেডইজি–এই শার্ট-কাট।
অনে লোক ছিলো দোকানটায়, কিন্তু কেউ আমাদের দিকে লক্ষ্যটাই করল না। মামা, তোমার উঃ আঃ গুলো তেমন জোরে হচ্ছে না, শুনতেই পাচ্ছে না কেউ। ফিসফিস করলাম মামার কানে কানে।
তুই কি লাগিয়েছিস বলতো? শার্ট দিয়ে পিটোচ্ছিস খালি আমায়? এই কি তোর হাওয়া করা নাকি? ফিসফিসিয়েই জবাব দিলেন মামা, যা মার লাগিয়েছিস বাপু তোর জামার! আমি তো মারা গেলাম। বলে ওরই এক ফাঁকে চট করে নিজের নাকে একটু হাত বুলিয়ে নিলেন।
হাত-পা খেচুনির আগেই মামার দাঁত-মুখের খিচুনি দেখা গেল। দেখতে হলে আমাকেই।
বা রে! আমারো রাগ হয়ে যায়, সত্যিই! হাওয়া করতে গিয়ে তার চোটে যে জামার এতগুলো বোম উড়ে গেল আমার, তার কোনো কথাই নাই! আমার এই স্বার্থত্যাগটা যেন কিছুই না! মামার
এই সেলফিশনেস আমার ভারি খারাপ লাগে।
চেয়ারে তুমি কাত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তোমার কাতরানি বাপু মোটেই ঠিকমতো হচ্ছে না একেবারেই। দোকানের মালিকের কানে না গেলে কি করে হবে?
তারপর মামা সত্যিই সত্যিই ছাড়লেন একটা যা! রাতবিরেতে ছাতের ওপর বেড়ালছানা যেমন ছাড়ে সেইরকম একখানা আওয়াজ। পটাপট আরো গোটাকতক বোম ছিঁড়ে গেল। আমার ছিড়লো আমার হাওয়ার ঠেলাতেই। কিন্তু আমি গ্রাহ্যই করলাম না! ( কারো অসুখ-বিসুখে নিজের লাভ-ক্ষতির দিকে থাকালে চলে না। তাই আমি জামার দিকে তাকালাম না, মামার দিকেও নয়। মামা নাক মুখ সিটকালেন, কিন্তু কি করবো? শক্ত রোগীকে কি কখনো জামাই-আদর করা যায়?
চিঁ চি গলায় শুরু কর মামা হাউ মাউ করে উঠলেন শেষটা—
মিঁ-মিঁ-মিঁ- মিঁয়াও!…
অমন করে ডাকলে স্বয়ং মা জগদম্বাই এসে দেখা দেন, আর, মিঞা না এসে পারে? এগিয়ে এল দোকানদার–
এ কি? এসব কি হচ্ছে এখানে? এটা কি তোমার ওস্তাদির আখড়া পেয়েছে নাকি? গলা ভাঁজবার আর জায়গা পাওনি? গানের কসরতের জায়গা এ নয়। বললেন লেকটা।
