আমার পাড়ার চা-ওয়ালারা? তুমি তাদের চেনো না মামা! এমন খুঁতখুঁতে তোক আর হয় না। এত কেপপণ তুমি সাতজন্মে দ্যাখেনি। আর, এমনি হুঁশিয়ার যে, তুমি যদি সিগ্রেট ধরাতে যাও আর দেশলায়ের বাকস চাও, না?–তারা বাকসর বদলে শুধু একটা কাঠি দেবে তোমাকে, আর খোলটা শক্ত করে ধরে রাখবে হাতের মুঠোয়। বাকসটা হাতছাড়া-ই করবে না, এক মিনিটের জন্যেও নয়, ধার দেয়া দূরে থাক। কেবল তার ধারে কাঠিটা ঘষে তোমার সিগ্রেট ধরিয়ে নাও, ব্যাস। দেশলায়ের গায়ে ঘষতে দেবে কেবল, কিন্তু দেশলায়ের কাছে ঘেঁষতে দেবে না তোমায়। এমনি মারাত্মক লোক সব।
বলিস কিরে, অ্যাঁ? এই বয়সেই সিগ্রেট খাওয়ার বিদ্যে হয়েছে? গোঁফ না গজাতেই বিড়ি ধরাতে শিখেছো? বটে? মামা ভারি খাপপা হয়ে ওঠেন।
বা রে, তা আমি কখন বলুম? এতো আমার চোখে দেখার কথাই বলচি –চোখ দেখার কথা বলেচি কি? আমি আপত্তি করি।
খাসনি? খাসনি তো? খাসনে তো? তাহলেই হলো! না খেলেই ভাল। তুই আমার একমাত্র ভাগনে নোস তা জানি, কিন্তু অদ্বিতীয় তোঃ তোর মতন মার্কামারা আরেকটা তো আমার নেই। তুইও যদি সিগ্রেট ফুকে অকালে যাদবপুর হয়ে কেটে পড়িস, অবশ্যি দুঃখে আমি যাব না, তা ঠিক কিন্তু তাই বলে টি-বি হওয়াটা কি ভাল? তুইও যদি টিবিয়ে কেঁসে যাস–সান্ত্বনা দেবার আরো ভাগনে আমার থাকবে বটে–
কিন্তু, ভাগে যে একটা কম পড়বে তাও বটে! ভয় নেই মামা, আমি তোমার ভাগবো না। জানাতে হয় আমায়।
আমার ভাগ্যি!…এখন আয়, এখানে বসে নিখরচায় চা খাবার একটা বুদ্ধি বার করি…নকুড় মামা বলেন। দুজনে মিলে তখন মাথা খাটাই আমরা। ভিখিরি হলে যেমন ভেক এসে পড়ে, ফকির হলেই তেমনি যতো ফিকির দেখা যায়।
শোন, এক কাজ করা যাক মামা বালান তুই যেন অজ্ঞান হয়ে পড়েছিস এই রকম ভাব দেখাবি। অ্যাকটিং করবি আর কি! আমি তোকে ধরে ধরে নিয়ে যাবো একটা চায়ের দোকানে, কিংবা ঢুকবো কোন একটা রেস্তোরাঁয়–
কী রকমের অ্যাকটিং? প্রথম অঙ্কের আগেই আমার প্রস্তাবনা : ভালো করে বুঝিয়ে দাও আগে।
ডালুদির হস্টিরিয়া হতে দেখেছিস তো? আমার ডালুদি, তোর ডালু মাসি রে? তুই সেই ডালুদির মত সেইরকম গা নাড়তে থাকবি হাত পা কাঁপাবি। যদি কাছে পিঠে কেউ না থাকে তো হাত-পা ছুঁড়তে শুরু করতে–
নকুড় মামা, ন কুরু, আমি সংস্কৃত করে বলি–তারপর ফের ব্যাখ্যা করে দিই সোজা বাংলায়–অমন কার্য্যটি কোরো না। কদাপি না। হিস্টিরিয়া হচ্ছে মেয়েলী ব্যাপার। ছেলেদের ওসব রোগ কি কখনো হয়? কক্ষনো না।
না, হয় না! তোকে বলেছে! ছেলেমাত্ৰই তো এক-একটি রোগ। আর ও জি উই ই। মামা সাদা বাংলায় বলে সিধে ইংরেজিতে বুঝিয়ে দ্যান ফের : শোন, ওসব আদিখ্যেতা রাখ, এখন যা বলছি তাই কর। আমি তোকে ধরাধরি করে নিয়ে যাবো চা-খানায়! এইতো গেল প্রথম দৃশ্য। তারপর আমি যা যা বলি যা যা করি দেখতেই পাবি। তুই ভান করবি আর আমি ভনিতা করবো, কিন্তু আড়চোখে দেখে রাখবি সব ভাল করে কেন না।
হিস্টিরিয়া বানিয়ে আমার লাভ? সমস্ত দৃশ্যটা মনশ্চক্ষে দেখেই এমন আমার বিসদৃশ লাগে। ঘিয়ের মত লাগতে থাকে আমার।
দেখতেই পাবি। হাতেনাতেই দেখবি, হিস্টিরিয়ার দাবাই হলো গরম দুধ, চা, টোসট, কেক, কারি, চপ, কাটলেট, পুডিং, পোচ, ডবল মামালেট, ফিস-ফ্রাই ইত্যাদি! ইত্যাদি!
আর বোলো না, বোলো না! বলতে না বলতেই আমি চলকে উঠি, রাজি হয়ে যাই তৎক্ষণাত।–-কিন্তু মামা, সে তো হলো আমার খাওয়া। তারপর? তোমার দশা কি হবে তারপর?
আরে, সেই কথাই তো বলছি রে। আমি যা-যা করি বলি দেখেশুনে মনের মধ্যে টুকে রাখবি ভাল করে। বলছি কি তবে? আরে, তার পরের দোকানটাতেই তো আমার পালা। তখন হবে হিস্টিরিয়া, আর তোকে করতে হবে আমার তদারক। বুঝেছিস রে হাঁদা?
জলের মতন। বলেই আমি একগাল হাসি। হেসেই হাঁটা বুজিয়ে ফেলি তক্ষুণি। অমন হাঁ, করে মামার ব্যাখ্যানা শুনছিলাম বলেই-ই ঐ হাঁদা–অপবাদ শুনতে হলো আমায়।–ধন্য মামা, ধন্য! এমন না হলে মাথা! মুক্তকণ্ঠে মামার প্রশংসাপত্র বিলাই–অ্যাতো বুদ্ধি ধরে তোমার ধড়ে, অ্যাঁ?
আরে, এ আর তুই কি দেখলি আমার মাথার? মাথা নাড়ে মামা, তো নয়, যেন সার জন মাথাই। বুদ্ধির একটি আটচালা এটি! আট রকমের চাল খেলছে এখানে! সব সময়েই বুঝেছিস?
তারপর আমাদের মামা-ভাগনের অভিযান শুরু হলো। অভিনয়ের দায় পড়লো আমার। প্রাথমিক শুশ্রষার ভার নিলেন মামা। বেন্টিক স্ট্রীট ধরে প্যারাডাইজ সিনেমার ধার দিয়ে আরম্ভ হলো আমাদের অভিযান।
আমার হাত পা কাঁপতে থাকলো, ডালু-মাসির মতই যতো ডালপালা নড়তে লাগলো আমার। দাঁতে দাঁতে লেগে গেল, চোখ বুজে এলো দেখতে না দেখতেই।
নকুড় মামা, আমাকে সযত্নে ধরাধরি করে এক চায়ের দোকানে এনে বসালেন।
চেয়ারটায় বসতেই আমি এলিয়ে পড়লাম।
নকুড় মামা, যাতে আমি গড়িয়ে মাটিতে না পড়ি, লক্ষ্য রাখবেন সেদিকে। আর জামার গলার দিকে বোতামগুলো খুলে দিলেন আমার। দোকানের টেবিলে সেদিনের সে খবরকাগজ পড়েছিলো, কাউকে একটিও কথা না বলে নকুড় মামা তাই দিয়ে সজোরে হাওয়া করতে লাগলেন আমায়। আমিও উঃ! আঃ! ইঃ! ঈঃ! এঃ! ওঃ! ঐঃ! ঔঃ! স্বরবর্ণের থেকে এইরকম এক একটা বিচ্ছিরি আওয়াজ বার করতে লাগলাম যে বলবার নয়।
