রুদ্ধ নিঃশ্বাসে আমি ভদ্রলোকের কাহিনী, শুনছিলাম, এতক্ষণে আমার বাক্যস্ফুর্তি হলো–তাহলে রিলিফ এসেছিল শেষে?
হ্যাঁ, কবির ভাষায়, একদাসুপ্রভাতে, সুন্দর সূর্যালোকে, নির্বাচনও সদ্য শেষ হয়েছে, আরও রিলিফ ট্রেনও এসে পৌঁছেছিল, তা নইলে আজ আমাকে দেখবার সৌভাগ্য হত না তোমার।…এই যে বারাকপুর এসে পড়ল, এখানেই নামব। বারাকপুরেই আমি থাকি গঙ্গার ধারে, যদি কখনো সুবিধে হয়, দু একদিনের জন্যে বেড়াতে এসো আমার ওখানে। ভারী খুশি হব তাহলে। তোমাকে দেখে আমার কেমন বাৎসল্য–ভাব জাগছে। বেশ বাল লাগল তোমাকে, এমন কি অজিতকে যথটা ভাল লেগেছিল, প্রায় ততখানিই, একথা বললে মিথ্যা বলা হয় না। তুমিও খাসা ছেলে,–আচ্ছা আসি তাহলে।
ভদ্রলোক বিদায় হলেন। এমন বিমূঢ়, বিভ্রান্ত আর বিপর্যস্ত আমি কখনো হইনি। বৃদ্ধ চলে যাবার পর আমার আত্মাপুরুষ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তাঁর কণ্ঠস্বর মৃদু- মধুর, চালচলন অত্যন্ত ভদ্র–কিন্তু হলে কি হবে, যখনই তিনি আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন, আমার হাড়-পাঁজরা পর্যন্ত কেঁপে উঠছিল। কি রকম যেন ক্ষুধিত দৃষ্টি তাঁর চোখে–বাবাঃ। তারপর তার বিদায়-বাণীতে যখন জানালেন যে তার মারাত্মক স্নেহ-দৃষ্টি লাভের সৌভাগ্য আমার হয়েছে, এমন কি তাঁর মতে আমি অজিতের চেয়ে কোনো অংশেই ন্যূন নই,–তেমনি খাসা বোধকরি তেমনি উপাদেয়–তখন আমার বুকের কাঁপুনি পর্যন্ত বন্ধ হবার মত হয়েছিল।
তিনি যাবার আগে মাত্র একটি প্রশ্ন তাঁকে করতে পেরেছিলাম–শেষ পর্যন্ত আপনাকেও ওরা নির্বাচন করেছিল? আপনি তো সভাপতি ছিলেন, তবে কি করে এটা হল?
শেষ পর্যন্ত আমিই বাকি ছিলাম কিনা। আগের দিন ভ্যাগাবণ্ডটার পালা গেছল; আমি একাই সমস্তটা ওকে সাবাড় করেছিলাম। বলব কি, পাহাড়ের যেমন আমার খিদে হতো, তেমনি হজম করবার ক্ষমতাও খুব বেড়ে গেছল। হতভাগা লোফারটা শেষ পর্যন্ত টিকেই ছিল, তার কারণ অখাদ্য লোক বলে তাকে খাদ্য করতে সবার আপত্তি ছিল। কিন্তু খাবার জিনিসে অত গোঁড়ামি নেই আমার–উদয়ের ব্যাপারে আমি খুব উদার। তাছাড়া এতদিনেও নির্বাচিত হবার সুযোগ না পেয়ে নিশ্চয়ই অত্যন্ত মনোক্ষোভ জেগেছিল ওর; আমার আত্মমর্যাদা লাভ করে সে যে কৃতার্থ হয়েছে এতে আমার সন্দেহ নেই।
হ্যাঁ, তুমি কি জানতে চাচ্ছিলে কি করে আমার পালা হলো? পরদিন আবার নির্বাচনের সময় এল। কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করায়, আমি যথারীতি নির্বাচিত হয়ে গেলাম বিনা বাধায়। তারপর কারু আপত্তি না থাকায়, আমি তৎক্ষণাৎ সেই সম্মানার্য পদ থেকে পদত্যাগ করলাম। আপত্তি করবার কেউ ছিল না তখন। ভাগ্যিস ঠিক সময়ে এসে পৌঁছেছিল ট্রেনটা–দুরূহ কর্তব্যের দায় থেকে রেহাই পেলাম আমি–নিজেকে আর গলাধঃকরণ করতে হলো না আমায়!
নিখরচায় জলযোগ
সেই থেকে নকুড় মামার মাথায় টাক। ফাঁস করছি সেকথা অ্যান্দিনে….
চালবাজি করতে গিয়ে চালের ফাঁকিতে বানচাল হয়ে–মাথার আটচালায় ঐ ফাঁক! সেদিন যে হাল হয়েছিল যা নাজেহাল হতে হয়েছিল আমাদের….কী আর বলব!
সাড়ে-এগারোটা থেকে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে, ভিড় ঠেলে, ঘোড়ার ধাক্কা সয়ে কতো তপস্যার পর তো ঢুকলাম খেলার গ্রাউন্ডে! ভিড়ের ঠেলায় পকেট ছিঁড়ে যা ছিল সব গড়িয়ে গেছে গড়ের মাঠে। মানে, মামার পকেটের যা কিছু ছিল। আমার পকেট তো এমনিতেই গড়ের মাঠ!
ছিন্ন হয়ে ক্যালকাটা গ্রাউন্ডে ঢুকেছিলাম, ভিন্ন হয়ে বেরুলাম খেলার শেষে। ঐ ভিড়ের ঠেলাতেই।
ভাগ্যিস মামা ছিলেন হুশিয়ার! খাড়া ছিলেন গেটের গোড়ায়, তাই একটু না আগাতেই দেখা মিলল, নইলে এই গোলের মধ্যে (মোহনবাগানের এত গোলের পর) আবার যদি মামাকে ফের খুঁজতে হতো তা হলেই আমার হয়েছিল! আমার হাঁকডাকে কতো জনার সাড়া মিলতো, কতো জনার কতো মামাই যে অযাচিত এসে দেখা দিতেন কে জানে! এই জন-সমুদ্রে আমি নিজেই হারিয়ে যেতাম কিনা তাই কে বলবে! আমার নিজেই খেই হারিয়ে গেলেই তো হয়েছিল।
মামা বললেন, একটু চা না হলে তো বাঁচিনে রে, যা তেষ্টা পেয়েছে, বাপস! গলা শুকিয়ে যেন কাঠ মেরে গেছে জিভ-টিভ সব সুখতলা।
আমারো তেষ্টা লেগেছে মামা–আমি বলি ও তবে চা যদি নেহাত নাই মেলে, শরবত হলেও আমার হয়।
হ্যাঁ, শরবত! বলে চায়েরই পয়সা জুটছে না, তো শরবত! নকুড় মামা চাচান : দু-আনা পয়সা হলে এক কাপ চা কিনে দুভাগ করে খাওয়া যায়। গলাটা একটু ভিজিয়ে বাঁচি–দুজনেই বাঁচি। আছে কি তোর কাছে দু-আনা?
না মামা।
একটা দুয়ানিও নেই? একদম না? দেখেছিস ভাল করে? তা দুয়ানি না থাক– দুটো আনি? দুটো আনি হলেও তো হয়।
অ্যাঁ! তাও না? একটা আনি আর দুটো ডবল পয়সা? নেইকো? যাকগে, তবে চারটে ডবল পয়সা–তাই দে? তাও পারবিনে? তাহলে ডবল আর বে- ডবলে মিলিয়ে বার কর। মোটের ওপর যে করেই আটটা পয়সা হলেই হয়ে যায়। তবুও ঘাড় নাড়ছিস? তাও নেই? তাহলে ফুটো পয়সাই সই–তাই বার কর দেখি আটটা–তাহলেই চালিয়ে নেব কোন রকমে।
না মামা। আমার পুনঃপুনরুক্তি।
আহা, প্রাণে যেন আমার চিমটে কেটে দিলেন? কেতাখ হলুম। মামা আমায়–ন্যা ম্যা ম্যা।
কার্জন পার্কের কোণ অবদি মামা চুপচাপ আসেন, আধমড়ার মতন। তারপর চৌরঙ্গীর মোড়ে পৌঁছাতেই যেন চমকে আবার।চ তোদের পাড়ায় যাই, সেখানকার চায়ের দোকানে নিশ্চয় তোকে ধার দেবে। তোর চেনাশোনা লোক সব-ভাবসাব আছেই! তাই চল্ ।….চা না পেলে আজ আমি বাঁচবো না। পঞ্চত্ব লাভ করবো। দেখিস তুই।
