অগত্যা দুজনের নাম একসঙ্গে দুবারব্যালটে দেওয়া হলো–আবার দু জনেই সমান সমান ভোট পেলেন। অর্ধেক লোক পরিপুষ্টতার পক্ষপাতী, বাকি অর্ধেকের মত হচ্ছে, যৌবনে দাও রাজটীকা।
এরূপ ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান সভাপতির ওপর নির্ভর করে; আমার ভোটটা অমৃতবাবুর তরফে দিয়ে অশোভন নির্বাচন প্রতিযোগিতার অবসান করলাম। বাহুল্য, এতদিনের একাদশীর পর অমৃতে আমার বিশেষ আরুচি ছিল না।
ভোলানাথবাবু পরাজয়ে তাঁর বন্ধুদের মধ্যে বিশেষ অসন্তোষ দেখা গেল, তারা নতুন ব্যালট দাবি করে বসলেন। কিন্তু রান্নাবান্না যোগাড়ের জন্য মহাসমারোহে সভাভঙ্গ হয়ে যাওয়ায়, ভোলানাথবাবুকে বাধ্য হয়ে স্থগিত রাখতে হলো। তাঁর পৃষ্ঠপোষকরা নোটিশ দিয়ে রাখলেন, পরদিনের নির্বাচনে তারা পুনরায় ভোলানাথবাবুর নাম তুলবেন। কালও যদি যোগ্যতম ব্যক্তির অগ্রাহ্য করা হয়, তাহলে তাঁরা সবাই একযোগে হাঙ্গার স্ট্রাইক করবেন বলে শাসালেন।
কয়েক মুহূর্তেই কি পরিবর্তন। পাঁচদিন নিরাহারের পর চমৎকার ভোজের প্রত্যাশায় প্রত্যেকের জিভই তখন লালায়িত হয়ে উঠেছে। এক ঘন্টায় মধ্যে আমরা যেমন আশ্চর্য রকম বদলে গেলাম–কিছুক্ষণ আগে আমরা ছিলাম আশাহীন, ভাষাহীন, খিদের তাড়নায় উন্মাদ–অর্ধমৃত; আর তখন আমাদের মনে আশা, চোখে দীপ্তি, অন্তরে এই কথাটা তুলতে যদি চলে তো তুলবেন না, ভালবাসা–এমন প্রগাঢ় প্রেম, যা মানুষের প্রতি মানুষ কদাচই অনুভব করে! এমন একটা অপূর্ব্ব পুলক, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অর্ধ-মুমূর্ষুতা থেকে একেবারে নতুন জীবন। শপথ করে বলতে পারি তেমন অনির্বচনীয় অনুভূমির আস্বাদ জীবনে আমি পাইনি।
অমৃতকে আমি আন্তরিক পছন্দ করেছিলাম। সত্যিই ভাল লেগেছিল ওকে আমার। স্কুল মাংসল বপু, যদিও কিছু অতিরিক্ত রোমশ (শৈলেশবাবু ভালুক বলে বেশি ভুল করেননি), তবু ওঁকে দেখলেই চিত্ত আশ্বস্ত হয়, মন কেমন খুশি হয়ে ওঠে। ভোলানাথও মন্দ নন অবশ্য; যদিও একটু রোগা, তবু উঁচুদরের জিনিস তাতে সন্দেহ নেই। তবে পুষ্টিকারিতা এবং উপকারিতার দিক থেকে বিবেচনা করলে অমৃতর দাবি সর্ব প্রথম। অবশ্য ভোলানাথের উৎকৃষ্টতার সপক্ষেও অনেক কিছু বলবার আছে, তা আমি অস্বীকার করবার চেষ্টা করব না। তবু মধ্যাহ্নভোজনের পাতায় পড়বার যোগ্যতা ওঁর ছিল না, বড়-জোর বিকেলের জলখাবার হিসেবে ওঁকে ধরা যেতে পারে।
দীর্ঘ উপবাসের পর প্রথম দিনের আহারটা একটু গুরুতরই হয়ে গেল। অমৃত এতটা গুরুপাক হবে আমরা ভাবিনি–বাইরে থাকতে যিনি আমাদের হৃদয়ে এতটা আবেগ সঞ্চার করেছিলেন, ভিতরে গিয়ে যথেষ্টই বেগ দিলেন। সমস্ত দিন আমরা অমৃতের সেঁকুর তুললাম। সকলেরই পেট (এবং সঙ্গে মন খারাপ থাকায়, পরদিন লঘু পথ্যের ব্যবস্থাই সঙ্গত স্থির হলো–অতএব কচি ও কাঁচা ভোলানাথবাবুকে জলযোগ করেই সেদিন নিরস্ত হলাম। তারপর দিন আমরা অজিতকে নির্বাচিত করলাম। ওরকম সুস্বাদু কিছু আর কখনো আমরা খাইনি জীবনে। সত্যিই ভারী উপাদেয়, তার বউকে পরে চিঠি লিখে আমি সে-কথা জানিয়েছি। এক মুখে তার প্রশংসা করে শেষ করা যায় না–চিরদিন ওকে আমার মনে থাকবে। দেখতেও যেমন সুশ্রী, তেমনি মার্জিত রুচি, তেমনি চারটে ভাষায় ওর দখল ছিল। বাংলা তো বলতে পারতই। তা ছাড়া ইংরাজি, হিন্দি এবং উড়েতেও অনর্গল তার খই ফুটত। হিন্দি একটু ভুলই বলত, তা বলুকগে; তেমনি এক-আধটুকু ফ্রেঞ্চ আর জামার্নও ওর জানা ছিল, তাতেই ক্ষতিপূরণ হয়ে গেছল। ক্যারিকেচার করতেও জানত, সুর ভাঁজতেও পারত,–বেশ মজলিসী ওস্তাদ লোক এক কথায় অমন সরেশ জিনিশ আর কখনো ভদ্রলোকের পাতে পড়েনি। খুব বেশি ছিবড়েও ছিল না, খুব চর্বিও নয় ওর ঝোলটাও ভারি খাসা হয়েছিল। এখনো যেন সে আমার জিভে লেগে রয়েছে।
তার পরদিন বিশ্বনাথবাবুকে আমরা আত্মসাৎ করলাম–বুড়োটা যেমন ভূতের মত কালো তেমনি ফাঁকিবাজ, কিছু তার গায়ে রাখেনি, যাকে বলে আমড়া-আঁটি আর চামড়া। পাতে বসেই আমি ঘোষণা করতে বাধ্য হলাম, বন্ধুগণ, আপনাদের যা খুশি করতে পারেন, আবার নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আমি হাত গুটোলাম। শৈলেশবাবু আমার পথে এলেন, বললেন–আমারো ঐ মত। ততক্ষণ আমিও অপেক্ষা করব।
অজিতকে সেবা করার পর থেকে আমাদের অন্তর যে আত্মপ্রসাদের ফাল্গুধারা আগোচরে বইছিল, তাকে ক্ষুণ্ণ করতে ইচ্ছে ছিল না। কাজেই আবার ভোট নেওয়া শুরু হলো-এবার সৌভাগ্যক্রমে শৈলেশবাবুই নির্বাচিত হলেন। তার এবং আমাদের উভয়েররই সৌভাগ্য বলতে হবে; কেন না, কেবল রসিক লোক বলেই তাকে জানতাম সরস লোক বলেও জানলাম তাঁকে। তোমাদের বিশ্বকবির ভাষায় বলতে গেলে, তার যে-পরিচয় আমাদের কাছে অজ্ঞাত ছিল; সেই নতুন পরিচয়ে তিনি আমাদের অন্তলঙ্গ হলেন।
তারপর? তারপর–একে একে ব্যোমকেশ, নিরঞ্জন, কেদারনাথ, গঙ্গাগোবিন্দ– গঙ্গগোবিন্দ নির্বাচনে খুব গোলমাল হয়েছিল, কেন না ও ছিল যেমন রোগা তেমনি বেঁটে তারপর নিতাই থোকদার-থোকদারের এক পা ছিল কাঠের সেটা থোখ ক্ষতি, সুস্বাদুতার দিক থেকে সে মন্দ ছিল না, নেহাত–অবশেষে এক ব্যাটা ভাগ্যবৎ, সঙ্গী হিসাবে সে মোটেই বাঞ্ছনীয় ছিল না, খাদ্য হিসেবেও তাই। তবে রিলিফ এসে পৌঁছবার আগে যে তাকে খতম করতে পারা গেছল এইটাই সুখের বিষয়। নিতান্তই একটা আপদ–চুকানো দায় কার কি।
