পরের কথা তো পরে–এখন কি করে রক্ষা পাই? যে প্রবল, গাড়ি সমেত উড়িয়ে না নিয়ে যায় তো বাঁচি। মাঝে মাঝে যা এক-একটা ঝাঁপটা দিচ্ছিল, উড়িয়ে না নিক, গাড়িকে কাত কিম্বা চিতপাৎ করার পক্ষে তাই যথেষ্ট। নিজের নিজের রুচিমত দুর্গানাম, রামনাম কিম্বা ত্রৈলঙ্গস্বামীর নাম জপতে শুরু করলাম আমরা।
সে-রাত তো কাটল কোনোরকমে, ঝড়ও থেমে গেল ভোরের দিকটায়। কিন্তু ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গে খিদেও জোর হয়ে উঠল। বর্মার হাওয়ায় খুব খিদে হয় শুনেছিলাম, প্রথম দিনেই সেটা টের পাওয়া গেল। খিদের বিশেষ অপরাধ ছিল না যে হাওয়াটা কাল আমাদের ওপর দিয়ে গেছে।
কিন্তু নাঃ, কারু টিফিন ক্যারিয়ারে কিছু নেই, যার যা কিছু কাল রাত্রের চেটে-পুটে সাবাড় করেছে। কেবল অ্যালুমিনিয়াম প্লেটগুলো পড়ে রয়েছে, আমাদের উদরের মত শোচনীয় অবস্থা–একদম ফাঁকা। সমস্ত দিন যে কি অস্বান্তিতে কাটল কি বলব! রাত্রে কষ্টকল্পিত নিদ্রার মধ্যে তবু কিছু শান্তির সন্ধান পাওয়া গেল–বড় বড় ভোজের স্বপ্ন দেখলাম।
দ্বিতীয় দিন যা অবস্থা দাঁড়াল, তার আর কর্তব্য নয়। সমস্ত সময় গল্প গুজব করে, বাজে বকে, উচ্চাঙ্গের গবেষণার ভান করে, খিদের তাড়নাটা ভুলে থাকবার চেষ্টা করলাম! গোঁফে চাড়া দিয়ে খিদের চড়াটা দমিয়ে দিতে চাইলাম,–তারপর এল তৃতীয় দিন।
সেদিন আর কথা বলারই উৎসাহ নেই কারো রেলগাড়ির চারদিকে ঘুরে, আনাচ-কানাচ লক্ষ্য করে, অসম্ভব আহার্যের অস্তিত্ব পরিকল্পনায় সেদিনটা কাটল। চতুর্থ দিন আমাদের নড়া-চড়ার স্পৃহা লোপ পেল–সবাই এক-এক কোণে বসে দারুণভাবে মাথা ঘামাতে লাগলাম।
তারপর পঞ্চম দিন। নাঃ, এবার প্রকাশ করতেই হবে কথাটা-আর চেপে রাখা চলে না। কাল সকাল থেকেই কথাটা আমাদের মনে উঁকি মারছিল, বিকেল নাগাদ কায়েম হয়ে বসেছিল এখন প্রত্যেকের জিভের গোড়ায় এসে অপেক্ষা করছে সেই মারাত্মক কথাটা–বোমার মত এই ফাটল বলে। বিবর্ণ রোগা, বিশ্রী বিশ্বনাথবাবু উঠে দাঁড়ালেন, বক্তৃতার কায়দায় শুরু করলেন–সমবেত ভদ্রমহোদয়গণ–
কি কথা যে আসছে আমরা সকলেই তা অনুমান করতে পারলাম। উনিশজোড়া চোখের ক্ষুধিত দৃষ্টি এক মুহূর্তে যেন বদলে গেল, অপূর্ব্ব সম্ভাবনার প্রত্যাশায় সবাই উদগ্রীব হয়ে নড়ে-চড়ে বসলাম।
বিশ্বনাথবাবু বলে চারজন–ভদ্রমহোদয়গণ, আর বিলম্ব করা চলে না। অহেতুক লজ্জা, সঙ্কোচ বা সৌজন্যের অবকাশ নেই। সময় খুব সংক্ষিপ্ত–আমাদের মধ্যে কোন ভাগ্যবান ব্যক্তি আজ বাকি সকলের খাদ্য জোগাবেন, এখন আমাদের তা স্থির করতে হবে।
শৈলেশবাবু উঠে বললেন, আমি ভোলানাথবাবুকে মনোনীত করলাম।
ভোলানাথবাবু বললেন, কিন্তু আমার পছন্দ অমৃতবাবুকেই।
অমৃতবাবু উঠলেন–অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যে তিনি লজ্জিত কি মর্মাহত বোঝা গেল না, নিজের সুস্পষ্ট দেহকেই আজ সবচেয়ে বড় শত্রু বলে তার বিবেচনা হলো। আমতা আমতা করে তিনি বললেন, বিশ্বনাথবাবু আমাদের মধ্যে প্রবীণ এবং শ্রদ্ধেয়, তা ছাড়া তিনি একজন বড় বক্তাও বটেন। আমার মতে প্রাথমিক সম্মানটা তাকেই দেওয়া উচিত, অতএব তার সপক্ষে আমি নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করছি।
কমল দত্ত বললেন, যদি কারুর আপত্তি না থাকে তাহলে অমৃতবাবুর অভিলাষ গ্রাহ্য করা হবে।
সুধাংশুবাবু আপত্তি করাতে অমৃতবাবুর পদত্যাগ অগ্রাহ্য হলো, এই একই কারণে ভোলানাথবাবুর রেজিগনেশনও গৃহীত হলো না।
শঙ্করবাবু বললেন, ভোলানাথবাবু এবং অমৃতবাবু–এঁদের মধ্যে কার আবেদন গ্রাহ্য করা হবে, অতঃপর ভোটের দ্বারা তা স্থির করা যাক।
আমি এই সুযোগ গ্রহণ করলাম–ভোটাভুটির ব্যাপারে একজন চেয়ারম্যান দরকার, নইলে ভোট গুনবে কে? অতএব আমি নিজেকে চেয়ারম্যান মনোনীত করলাম।
ওদের মধ্যে আমিই দূরদর্শী, সাহায্য এসে না পৌঁছানো তক নিত্যকার ভোটায়নের জন্যে চেয়ারম্যানকেই কষ্ট করে টিকে থাকতে হবে, শেষ পর্যন্ত, এটা আমি সূত্রপাতেই বুঝতে পেরেছিলাম। অমৃতবাবুর দিকেই সকলের দৃষ্টি নিবন্ধ থাকতে, আমি সকলের বিনা অসম্মতিক্রমে নির্বাচিত হয়ে গেলাম।
অতঃপর প্রভাসবাবু বললেন, আজকের দুপুরবেলার জন্যে দুজনের কাকে বেছে নেওয়া হবে, সেটা এবার সভাপতিমশাই ব্যালটের দ্বারা স্থির করুন।
নাদুবাবু বললেন–আমার মত ভোলানাথবাবু নির্বাচনের গৌরব লাভের অযোগ্য। যদিও তিনি কচি এবং কাঁচা, সেইসঙ্গে তিনি অত্যন্ত রোগা ও সিঁড়িঙ্গে। অমৃতবাবুর পরিধিকে এই দুঃসময়ে, আমরা অবজ্ঞা করতে পারি না!
শৈলেশবাবু বললেন, অমৃতবাবুর মধ্যে কি আছে? কেবল মোটা হাড় আর ছিবড়ে। তাছাড়া পাকা মাংস আমার অপছন্দ, অত চর্বিও আমার ধাতে সয় না। সেই তুলনায় ভোলানাথবাবু হচ্ছে ভালুকের কাছে পাঠা। ভালুকের ওজন বেশি হতে পারে–কিন্তু ভোজনের বেলায় পাঠাতেই আমাদের রুচি।
নাদুবাবু বাধা দিয়ে বললেন, অমৃতবাবুর রীতমত মানহানি হয়েছে, তাকে ভালুক বলা হয়েছে–অমৃতবাবুর ভয়ানক রেগে যাওয়া উচিত আর প্রতিবাদ করা উচিত–
অমৃতবাবু বললেন, শৈলেশবাবু ঠিকই বলেছেন, এত বড় খাঁটি কথা কেউ বলেনি আমার সম্বন্ধে। আমি যথার্থই একটা ভালুক।
অমৃতবাবুর মত কূটতার্কিক যে এত সহজে পরের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন, আশা করতে পারিনি। বুঝতে পারলাম, তার আত্মগ্লানির মূলে রয়েছে stuggle for existence। যাক, ব্যালট নেওয়া হলো। কেবল ভোলানাথবাবুর নিজের ছাড়া আর সকলের ভোট তার সপক্ষে গেল। অমৃতবাবুর বেলাও তাই, একমাত্র অমৃতবাবু স্বয়ং নিজের বিপক্ষে ভোট দিলেন।
