বছর আটেক আগের কথা, সবে ম্যাট্রিক পাশ করেছি–মামার বাড়ি যাচ্ছি বেড়াতে। রাণাঘাট পর্যন্ত যাব, তাই ফুর্তি করে যাবার মতলবে বাবার কাছে যা টাকা পেলাম তাই দিয়ে একখানা সেকেন্ড ক্লাসের টিকিট কিনে ফেললাম। বহুকাল থেকেই লোভ ছিল ফাস্ট-সেকেন্ড ক্লাসে চাপবার, এতদিনে তার সুযোগ পাওয়া গেল। লোভে পাপ পাপে মৃত্যু–কথাটা প্রায় ভুলে গেছলাম। ভুলে ভালই করেছিলাম বোধ করি, নইলে এই অদ্ভুত কাহিনী শোনার সুযোগ পেতে না তোমরা।
সমস্তক কামরাটায় একা আমি, ভাবলাম আর কেউ আসবে না তাহলে বেশ আরামে যাওয়া যাবে একলা এই পথটুকু। কিন্তু গাড়ি ছাড়বার পূর্ব্ব-মুহূর্তেই একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক এসে উঠলেন। একমাথা পাকা চুলই তাঁর বার্ধক্যের একমাত্র প্রমাণ, তা না হলে শরীরের বাঁধুনি, চলা-ফেরার উদ্যম, বেশ-বাসের ফিটফাট কায়দা থেকে ঠিক তার বয়স কত অনুমান করা কঠিন।
গাড়িতে আমরা দুজন, বয়সের পার্থক্য সত্ত্বেও অল্পক্ষণেই আমাদের আলাপ জমে উঠল। ভদ্রলোক বেশ মিশুক, প্রথম কথা পাড়লেন তিনিই। এ-কথায় সে-কথায় আমরা দমদম এসে পৌঁছলাম। হঠাৎ একটা তারস্বর আমাদের কানে এল–অজিত, এই অজিত, নেমে পড় চট করে। গাড়ি ছেড়ে দিল যে!
সহসা ভদ্রলোকের সারা মুখ চোখ অস্বাভাবিক উজ্জ্বল হয়ে উঠল। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তুরিত দৃষ্টিতে সমস্ত প্ল্যাটফর্মটা একবার তিনি দেখে নিলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন–নাঃ, সে অজিতের কাছ দিয়েও যায় না!
কিছু বুঝতে না পেরে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিলাম। ভদ্রলোক বললেন–অজিত নামটা শুনে একটা পুরোনো কথা মনে পড়ে গেল আমার। কিছু নাঃ এ–অজিত সে–অজিতের কড়ে আঙুলের যোগ্যও নয়–এমনি খাসা ছিল সে–অজিত! অমন মিষ্টি মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। শুনবে তুমি তার কথা?
আমি ঘাড় নাড়তে তিনি বললেন–গল্পের মাঝ পথে বাধা দিয়ে না কিন্তু। গল্প বলছি বটে, কিন্তু এর প্রত্যেকটা বর্ণ সত্য। শোনো তবে।–
জিভ দিয়ে ঠোঁটটা একবার চেটে নিয়ে তিনি শুরু করলেন; বছর পঞ্চাশ কি তার বেশিই হবে, তখন উত্তর–বর্মায় যাওয়া খুব বিপদের ছিল। চারিধারে জঙ্গল আর পাহাড়। জঙ্গল কেটে তখন সবে নতুন রেললাইন খুলেছে সেই অঞ্চলে অনেকখানি জায়গা জুড়ে মাঝে মাঝে এমন ধ্বসে যেত যে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যেত একেবারে। তার ওপরে পাহাড়ে-ঝড়, অরণ্য-দাবানল হলে তো কথাই না। রেঙ্গুন থেকে সাহায্য এসে পৌঁছতে লাগত অনেকদিন–এর মধ্যে যাত্রীদের যে কি দুরবস্থা হতো তা কেবল কল্পনাই যেতে পারে।
তখনকার উত্তর-বর্মা ছিল এখনকার চেয়ে বেশি ঠাণ্ডা, রীতিমত বরফ পড়ত–সময়ে সময়ে চারিধারে সাদা বরফের স্তূপ জমে যেত। এখন তো মগের মুলুকের প্রকৃতি অনেক নম্র হয়ে এসেছে, তার ব্যবহারও এখন ঢের ভদ্র। সেই সময়কার ব্রহ্মদেশের মেজাজ ভাবলে শরীর শিউরে ওঠে।
সেই সময় একবার এক ভয়ানক বিপাকে আমি পড়েছিলাম–আমি এবং আরও আঠারো জন। আমরা উত্তর-বর্মায় যাচ্ছিলাম-আমরা উনিশনই ছিলাম সমস্ত গাড়ির যাত্রী। উনিশজনই বাঙালি প্রথম রেললাইন খুলেছিল, কিন্তু দুর্ঘটনার ভয়ে সেখানকার অধিবাসীরা কেউ রেলগাড়ি চাপত না। ভয় ভাঙাবার জন্যে রেল কোম্পানি প্রথম প্রথম বিনা-টিকিটে গাড়ি চাপবার লোভ দেখাতেন। বিনা পয়সার লোভে নয় অ্যাডভেঞ্চারের লোভে রেঙ্গুনের উনিশজন বাঙালি আমরা তো বেরিয়ে পড়লাম।
সহযাত্রী মোটে এই কজন–কাজেই আমাদের পরস্পরের মধ্যে আলাপ-পরিচয় হতে দেরি হলো না। কোনখানে যে সেই ভয়াবহ পাহাড়ের ঝড় নামল, আমার ঠিক মনে পড়ে না এখন, তবে রেলপথের প্রায় প্রান্ত সীমায় এসে পড়েছি। ওঃ সে কী ঝড় সেই দুর্দান্ত ঝড় ঠেলে একটু একটু করে এগুচ্ছিল আমাদের গাড়ি–অবশেষে একেবারেই থেমে গেল। সামনের রেললাইন ছোট বড় পাথরের টুকরোয় ছেয়ে গেছে –সেই সব চাঙর না সরিয়ে গাড়ি চালানোই অসম্ভব। এতএব পিছননা ছাড়া উপায় ছিল না।
অনেকক্ষণ ধরে এক মাইল আমরা পিছোলাম। এত আস্তে গাড়ি চলছিল, চলছিল আর থামছিল যে মানুষ হেঁটে গেলে তার চেয়ে বেশি যায়। কিছু পিছিয়েই কি রেহাই আছে? একটু পরেই জানা গেল যে পেছনে অনেকখানি জায়গা জুড়ে ধ্বস নেমেছে। ঘণ্টাখানেক আগে যে রেলপথ কাঁপিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটেছে, এখন কোথাও তার চিহ্নই নেই।
অতএব আবার এগুতে হলো। যেখানে যেখানে পাথরের টুকরো জমেছে, আমার সব নেমে লাইল পরিষ্কার করব ঠিক হলো। তা ছাড়া আর কি উপায় বলো? কিন্তু সেদিকেও ছিল অদৃষ্টের পরিহাস। কিছুদুর এগিয়েই ঝড়ের প্রবল ঝাঁপটায় ট্রেন ডিরেলড হয়ে গেল। লাইন থেকে পাথর তোল আরেক কথা। পাঁচ দশজন মিলে অনেক ধরাধরি করলে এক-আধটা পাথরের চাঙড় যে না সরানো যায় তা নয়, কিন্তু সবাই মিলে বহুৎ ধ্বস্তাধস্তি করলেও গাড়িকে লাইনে তোলা দূরে থাক এক ইঞ্চিত নড়ানো যায় না। এমন কি আমরা ঊনিশজন মিলেও যদি কোমর বেঁধে লাগি, তাহলেও তার একটা কামরাও লাইনে তুলতে পারব কিনা সন্দেহ! তারপরে ঐ লম্বা চওড়া ইঞ্জিন-ওকে তুলতে হলেই তো চক্ষুস্থির! ওটা কত মণ কে জানে। আমরা ইঞ্জিনের দিকে একবার দৃকপাত করে হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিলাম।
পেছনের অবস্থা তো দেখেই আসা গেল, সামনেও যদি তাই ঘটে থাকে, তাহলেই তো চক্ষুস্থির! কেন না যেদিক থেকেই হোক, রেলপথ তৈরি করে সাহায্য এসে পৌঁছিতে কদিন লাগবে কে জানে। চারিধারে শুধু পাহাড় আর জঙ্গল, একশো মাইলের ভেতরে মানুষের বাসভূমি আছে কিনা সন্দেহ! ইতিমধ্যে আমাদের সঙ্গের যা খাবার-দাবার তা তো এক নিঃশ্বাসেই নিঃশেষ হবে তারপর? যদি আরো দুদিন এইভাবে থাকতে হয়? আরো দু-সপ্তাহ? কিম্বা আরো দু-মাস? ভাবতেও বুকের রক্ত জমে যায়।
