আমার তরফে বাক্যস্ফুর্তি হতে বিলম্ব হয়, স্বভাবতই একটু সময় লাগে। একি! চেপে গেলেন যে একেবারে? অন্য তরফে সম্ভাষণের দ্বিতীয় পালা শুরু হয়েছে ততক্ষণে : বেশ ভদ্রলোক আপনি! দালালির টাকাটা তো অক্লেশে মেরে দিয়ে যেতে পারলেন, কিন্তু এই পচা বাড়িতে কোনো মানুষ বাস করে? এঁদো, ড্যাম্পো, মশার আড্ডায়, কাঁকড়া বিছের সঙ্গে থাকতে পারে কেউ? এরকম বাড়ি আমাদের ভাড়া গছিয়ে এভাবে ঠকিয়ে কি লাভ হল আপনার শুনি? তিনি জবাবদিহি চান।
কী জবাব দেব? এবার আমাকেই কানেকশন কাট আপ করতে হলো, সম্ভব বজায় রাখা আর সম্ভব হলো না। দফায় দফায় করো রাহাজানি চললে তার সঙ্গে রফা করে নিজের দফা রফা করা আমার মত সুরাহাবাদীর রপ্ত নয়। কাজেই বিদায় সম্ভাষণ না করেই সাদর সম্ভাষণ স্থগিত রাখতে হল বাধ্য হয়েই–কী করব?
এবার চতুর্থ ব্যক্তির উদ্দেশে ডাক ছাড়লাম। এবং তাকে কাছাকাছি পাবা মাত্রই আর অন্য কথা পাড়তে দিই না, সর্বপ্রথমেই আমার কাজ সেরে নিই ।
শ্ৰীযুত চক্রবর্তী! আপনাকে আমার সাদর সম্ভাষন জানাই। নববর্ষের সাদর সম্ভাষণ!…
কাঁদো কাঁদো গলায় জবাব আসে; তা জানাবে বৈকি! তা না হলে বন্ধু? তা না জানাবে কেন? আজ তো তোমাদেরই সুখের দিন হে, তোমাদেরই স্ফুর্তি। এতদিনে আমার সর্বনাশ হয়েছে, পরশু মামলায় হেরেছি, শুশুরমশাই আত্মহত্যা করেছেন, আর আজ সকাল থেকে যত কাবলেওয়ায় ছেকে ধরেছে, আগামীকার আমায় দেউলে খাতায় নাম লেখাতে হবে, আজই তো তোমাদের মত হিতৈষীদের দহরমের সময় গোয় আনন্দ উথলে ওঠবার দিন তো। আমার সর্বনাশ না হলে আর তোমাদের পৌষমাস ফলাও হবে কি করে?
টেলিফোনের অপর প্রান্তে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে আর্তনাদ উচ্ছাসিত হতে থাকে।
এই ব্যক্তিকেও, এই চক্রবর্তীটিকেও, বরখাস্ত করে দিই তৎক্ষণাত। যে রকম বুঝছি, সব দিক থেকেই আমার সাদর সম্ভাষণের একদম অযোগ্য বলেই একে বোধ হচ্ছে। নববর্ষের জন্য একেবারেই ইনি প্রস্তুত নন। অতএব, পঞ্চম চক্রবর্তীকে বেশ একটু ভয়ে ভয়েই ডাকতে হয়।
সাড়া দিতে না দিতেই সদ্যলদ্ধ চক্রবর্তীমশাই আরম্ভ করেন–বুঝেছি আর বলতে হবে না গলা পেতেই চিনেছি। তা, সুদটা দিচ্ছেন কবে শুনি? আসল দেবার তো নামই নেই। কত জমে গেল খেয়াল আছে? অ্যাঁ? একেবারেই উচ্চবাচ্চই নেই যে! ঢের ঢের লোক দেখেছি বাবা, কিন্তু তোমার মতন এক নম্বরের এমন জোচ্চোর আর একটাও চোখে পড়ল না। একবার যদি সামনে পেতাম মেরে পসতা ওড়াতাম তোমার। পসতালেন তিনি।
আর বেশি শোনবার আমার সাহস হল না। পস্তায়মান এই ধারদাতার ধাক্কায় আমি আঁধার দেখলাম। তা ছাড়া সামান্য সাধারণ একজন, এক নামমাত্র চক্রবর্তী কেই আমি ডাকতে চেয়েছিলাম, এহেন কোন রাজচক্রবর্তীকে না!
রিসিভার নামিয়ে অনেকক্ষণ কাহিল হয়ে থাকি।
তারপর বিস্তর ইতস্তত করে যষ্ঠ ব্যক্তির জন্য রিসিভার তুলি। কথায় বলে, বার বার তিনবার। আবার তিনে শত্রুতাও হয়, বলে থাকে। এতএব, কার্য্যত, তিনবারের ডবল করে, নয় ছয় করে তবেই ছাড়া উচিত।
হ্যালো, আপনি কি শ্ৰীযুত চক্রবর্তী? ও, আপনি? নমস্কার! আমি? আমিও একজন চক্রবর্তী আপনারই সগোত্র নগণ্য এক নরাধম। হ্যাঁ, নমস্কার! আজ নববর্ষের প্রথম দিনটিতেই আপনাকে আমার সাদর সম্ভাষণ জানাচ্ছি। সাদর সম্ভাষণ–আজ্ঞে হ্যাঁ!
অন্য তরফ থেকে অন্যতর চক্রবর্তীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল বেশ গদগদ স্বরে। মোলায়েম তার মিহি হয়ে। এ চক্রবর্তীটিকে অন্যান্য চক্রবর্তীর থেকে একটু স্বতন্ত্র বলেই মনে হয়! বঙ্কিমবাবুর কথাটা রকমফের, হয়ে এঁরও যেন জানা আছে মনে হচ্ছে।
তিনি বলতে থাকেন–ধন্যবাদ! হ্যাঁ, কি বললেন? নামটা তো বললেন, কিন্তু আপনার ঠিকানাটা, একশো চৌত্রিশ নম্বর, বেশ বেশ! রাস্তার নাম? বাঃ। নাম ঠিকানায় কবিতা মিলিয়ে হরিহরাত্ম হয়ে আছেন দেখছি, বাঃ বাঃ! এই তো চাই। ছেলেপিলে কটি? একটি। আপনিই একমাত্র? তার মানে? ও, এখনো বিয়েই হয় নি? হবার আর আশঙ্কাও নেই? তা না থাক! মানুষ আশাতেই, এমন কি, আমঙ্কা নিয়েও বেঁচে থাকে। বয়েসটা কত বললেন? আন্দাজ করা একটু কঠিন? আটাশ থেকে আটাশীর মধ্যে? তাহলেই চলবে। এত কথা জিজ্ঞেস করছি কেন? এক্ষুনি জানতে পারবেন, আমি যাচ্ছি আপনার কাছে। না না, কোন ঘটকালি নয়। তবে আপনি যেমন আমাকে সাদর সম্ভাষণ দ্বারা আপ্যায়িত করলেন, তেমনি আজ নববর্ষের প্রথম দিনে একটা ভাল কাজ আপনার জন্যও আমি করতে চাই। আপনার জীবনবীমাটা আজই করে ফেলুন। শুভস্য শীঘ্রম। জীবন-বীমার দ্বারাই জীবনের সীমা বাড়ানো যায়। এতএব শুভকাজ দিয়েই বছরের প্রথম শুভদিনটা আরম্ভ হোক। কেমন?… দাঁড়ান, এই দণ্ডেই আমি যাচ্ছি।
এই প্রত্যুত্তর লাভের পর বলা বাহুল্য আমি আর দাঁড়াইনি। সেই দণ্ডেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলাম।
নরখাদকের কবলে
শিরোনাম দেখেই বুঝতে পারছ, এটা ভীষণ অ্যাডভেঞ্চারের গল্প। যথার্থই তাই, সত্যিই ভারি রোমাঞ্চকর ঘটনা–নিতান্তই একবার আমি এক ভয়ঙ্কর নরখাদকের পাল্লায় পড়েছিলাম।
আফ্রিকার জঙ্গলে কি কোনো অজ্ঞাত উপদ্বীপের উপকূলে নয়–এই বাংলাদেশের বুকেই, একদিন ট্রেনে যেতে যেতে। সেই অভাবনীয় সাক্ষাতের কথা স্মরণ করলে এখনো আমার হৃঙ্কম্প হয়।
