আরো এই যে, এখানেও আবার!-–টুসি ভাই! যেখানেই থাক, ফিরিয়া আইস। আর তোমাকে ডাক্তার ডাকিতে হইবে না। তোমার দাদু আর মৃত্যুশয্যায় নেই, এখন জীবন্ত-শয্যায়। সুতরাং আর কোন ভয় নেই তোমার। কতো টাকা চাই তোমার, লিখিও। লিখিলেই পাঠাইয়া দিব।
আবার এই যে-পুনশ্চ! প্রিয় টুসি, তুমি ফিরিয়া আসিলে ভারী খুশি হইব। এবার তোমার জন্মদিনে তোমাকে একটা টু সীটার কিনিয়া দিব। যেখানে যে- অবস্থায় থাকো, লিখিয়া জানাইও। মনিঅর্ডার করিয়া পাঠাইব। ইতি তোমার দাদু।
তাঁদের একজন খবর দিতে ছোটেন টুসির দাদুকে। বাকি সবাই টুসিকে ঘিরে আগলাতে থাকেন। কি জানি, যদি পালিয়ে যায় হঠাৎ! জেগে উঠেই টেনে দৌড় মারে যদি! হাওড়া গিয়ে ট্রেনে দৌড় মেরে হাওয়া হয়ে যায়। ওঁরা খুব সন্তর্পণেই ওকে ঘিরে দাঁড়ান, ঘুণাক্ষরেও শব্দ হয় না–নিঃশ্বাস ফেলার শব্দও না!
একজন মন্তব্য করছিলেন–ঘুমোবার কায়দাটা দেখুন! শোবার জায়গাটিও বেছে নিয়েছে বেশ–ফাঁকা-মাঠে-খোলা হাওয়ায়-তোফা আরামে-মজা করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছোঁড়ার ফুর্তি দেখুন এককার?
অমনি আর সবাই তার মুখে চাপ দিয়েছে–চুপ! চুপ! করছেন কি? জেগে উঠবে যে! জেগে উঠলে পালাতে কতক্ষণ! আমরা কি তখন ধরতে পারবো দৌড়ে? ওর বাবার বাবাই পারেনি যেখানে…।
ধরা শক্ত বলেই ত পুরস্কার দিয়েছে ধরবার জন্যে-কোন রকমে একবার ধরিতে পারিলে–দেখছেন না?
টুসির দাদু এসে পড়েন ট্যাক্সিতে।
নাতিকে দেখে তার আপাদমস্তক জ্বলে ওঠে। বলে–আমি মরছি কলিকের জ্বালায় আর উনি কিনা এখানে এসে মজা করে–আয়েস করে ঘুমোচ্ছেন!
এক থাপ্পড় কসিয়ে দেন তিনি টুসির গালে।
আহাহা! মারবেন না, মারবেন না! সবাই হাঁ হাঁ হাঁ করে ওঠেন।
না, মারব না! মারব না বইকি! মশাই, সেই দেড়টার সময় বেরিয়েছে ডাক্তার ডাকতে, দেড়টা গেল, দুটো গেল, আড়াইটা গেল, তিনটেও যায় যায়। পাত্তাই নেই বাবুর! কলিক উঠে গেল আমার মাথায়! জানেন মশাই, পঞ্চাশ টাকার ট্যাক্সিভাড়া বরবাদ গেছে একরাত্রে আমার? কলিক পেটে নিয়েই সেই রাত্রেই দৌড় কি দৌড়! এ-থানায়, সে-থানায় কোন থানাতেই নেই উনি! এ হাসপাতাল, ও-হাসপাতাল–কোথাও নেই হতাহত হয়ে! হাত-পা কেটে পড়ে থাকলেও ত বাঁচতুম! কিন্তু তাও নেই। কি বিপদ ভাবুন ত। কি করি! গেলুম তখন খবরের-কাগজের আপিসে। সেই রাত্রেই। রাত আর কোথায় তখন, ভোর চারটে! নাইট এডিটারের হাতে-পায়ে ধরে মেশিন থামিয়ে স্টপ প্রেস করে একমুঠো টাকা গচ্ছা দিয়ে তবে এই বিজ্ঞাপনটা ছাপিয়ে বের করেছি জানেন?
একখানা আনন্দবাজার পকেটের ভেতর থেকে টানাটানি করে বের করেন তিনি।
তবেই এই বিজ্ঞাপন বেরোয় আজকের কাগজে! আর আপনি বলছেন কিনা, মারবেন না! তিনি আরো বেশি অগ্নিশর্মা হন। মারবো না? তবে কি আদর করবো নাকি ওই বাঁদরকে?
চড়ের চাপটেই চটকা ভেঙে গেছল টুসির কিন্তু সবই ওর কেমন যেন গোল- মাল ঠেকছিল; মাথায় ঢুকছিল না কিছুই। কিন্তু এখন চোখের সামনেই স্বয়ং দাদু এবং তাঁর বিরাশী সিক্কার একত্র যোগাযোগ দেখে তার ফলাফল অচিরেই কতদূর মারাত্মক হতে পারে, মালুম করতে বিলম্ব হয় না টুসির।
এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে যায় টুসি-লৌহ-বেষ্টনীর আলিঙ্গন পাশ থেকে মুক্ত হবার অন্তিম-প্রয়াসে!
আশ্চয্যি! শিকের বগল থেকে সে গলে আসে আপনার থেকেই–অনায়াসেই! চেষ্টা না করতেই একেবারে সুড়ুৎ করে চলে আসে! এক রাত্রেই চুপসে আধখানা হয়ে এসেছে বেচারা– কাজেই আলগা হয়ে বেরিয়ে আসতে দেরি হয় না তার!
আর, দাদুর ঘুষি টুসির কাছাকাছি পৌঁছবার আগেই সে সরেছে। সরেছে উদ্দামগতিতে।
চোখের পলক পড়তে না পড়তে টুসি পার্কের অন্য পারে! রেলিং টপকাবার আমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করে, সন্নিহিত আরেকটা শিকের উন্মুক্ত আহ্বান উপেক্ষা করে, এমন কি আরেকটা ছেলেপিলের যাতায়াতের ফাঁসের প্রলোভন সংবরণ করেই টুসি এবার সদর-গেট দিয়েই বেরিয়ে গেছে সটান।
বেরিয়েই ছুট কি ছুট! ডাইনে না, বায়ে না, সোজা বামাপদবাবুর বাড়ির দিকে।
ওর দাদু এদিকে গজগজ করতে থাকেন-বাবু এখন বাড়ি গেলেন ত গেলেন। না গেলের ত ওঁরই একদিন কি আমারই একদিন।
একজন এগিয়ে গিয়ে বলতে সাহস করে–আপনার নাতি যে আবার নিরুদ্দেশ হয়ে গেল মশাই!
উনি গর্জ্জন করেন–নিরুদ্দেশ হয়ে গেল বলেই ত বেঁচে গেল এ-যাত্রা। নইলে কি আর আস্ত থাকত? দেখেছেন ত সেই চড়খানা? সেই নাতিবৃহৎ চড়? তার পরেও কি কোন নাতির-যতই সে বৃহৎ হোক না! উদ্দেশ পাওয়া যেত এতক্ষণ?
গুম হয়ে ট্যাক্সিতে গিয়ে বসেন তিনি।
ও মশাই, পুরস্কার?–পুরস্কার?
দু-চারজন দৌড়ায় ওঁর পেছনে–পেছনে। ছাড়বার মুখে ট্যাক্সিটা ভর-ভরর-ভরর ভরর-র র র র–ভরাট গলায় এক আওয়াজ ছাড়ে, আর সেই সাথে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে যায় ও দের মুখে।
নববর্ষের সাদর সম্ভাষণ
সেদিন পয়লা বোশেখ! কমল নিয়ে বসে কি লিখি কি লিখি করছিলাম। কিছুই আসছিল না কলমে।
অবশেষে বিরক্ত হয়ে কলম ফেলে টেলিফোনের রিসিভারটা তুলে নিলাম। সামনেই পড়েছিল রিসিভারটা, আমার টেবিলের এক কোণে।
কিন্তু এখন কাকে ফোন করি? টেলিফোনের রিসিভারটা হাতে নিয়ে ভাবছিলাম। আজ সম্বচ্ছরের প্রথম দিন–কাউকে ডেকে নতুন বছরের সাদর সম্ভাষণ জানালে কেমন হয়?
