কুকুরটাও এতক্ষণে গোটা পার্কটা ঘুরে-ফিরে তাঁর কাছাকাছি এসে পৌঁছেছিল। টুসির মুখের ওপরেই সে লাফাতে-ঝাপাতে শুরু করে এবার।
অসহায় হয়ে হাত পা ছুঁড়ে টুসি কী আর করবে? তাও একখানা হাত, আধখানা পা-তার বেশি আর নয়। পালিয়ে বাঁচবার উপায়ও তার নেই। আগেই সে-পথ সে বন্ধ করেছে।
ওকে ছেড়ে ওর কোঁচা ধরে টানতে থাকে কুকুরটা। অ্যাঁ! মুক্তকচ্ছ করে দেবে নাকি! মতলব তো ভাল নয় ওর! দুহাতে প্রাণপণে কাপড় চেপে ধরে টুসি–গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে। এক কামড়ে কোচার খানিকা ছিঁড়ে নিয়ে বিরক্ত হয়ে চলে যায় কুকুরটা। হ্যাঁ, বিরক্ত হয়েই বেশ। হুটোপাটি নেই, দৌড়ঝাঁপ নেই এরকম ঠায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রেলিং-এর গায় লেগে থাকা খেলা ভাল লাগে না ওর। ইঁদুরের খোঁজেই সে চলে যায় আবার।
কুকুরটা ওকে বর্জন করে গেলে কিছুটা স্বস্তি পায় সে। খানিক বাদে একটা লোক যায় পাশ দিয়ে–টুসি তার দিকে ডাক ছাড়ে।
ও মশাই! মশাই গো!
কে? লোকটা চমকে ওঠে। কি? কি হয়েছে তোমার? টুসির কাছে এসে জিগ্যেস করে সে।
আমাকে এখান থেকে বের করে দিন না মশাই! টুসির কণ্ঠস্বর অতিশয় করুণ। ভারি মুশকিলে পড়েছি আমি।
ওর অবস্থা দেখে হাসতে শুরু করে দ্যায় লোকটা–বাঃ! বেড়ে তো! কার অঞ্চলের নিধি এসে এখানে আটকে পড়োছো চাঁদ! আছে নাকি কিছু তাঁকে?
টুসির পকেটে হাতড়ে মানিব্যাগটা সে হাতিয়ে নেয়। দাদুর দেওয়া ইস্কুলের মাইনে আর বায়োস্কোক দেখার পয়সা–সবই যে রয়েছে ঐ ব্যাগে। টুসির যথাসর্বস্ব! সবটা বাগিয়ে নিয়ে লোকটা সত্যিই চলে যায় যে-! বাঃ! বেশ মজার তো!
টুসি চেঁচাতে শুরু করে–পিক-পকেট! পকেটমার! পুলিশ। ও পুলিশ! চোর, ডাকাত, খুনে পালাচ্ছে পুলিশ! ও পুলিশ।
লোকটা ফিরে আসে ফের–অমন করে চাচাচ্ছো কেন যাদু? এই নিশুতি-রাতে শুনবে কে? কে জেগে বসে আছে সারারাত তোমার জন্যে হারানিধি? এই যে, বাঃ। ফাউন্টেনপেনও একটা আছে দেখছি! দেখি বাঃ বেশ পেনটি তো। পার্কার? কিছু মনে কোরো না লক্ষ্মী ভাইটি।
অতঃপর কলমটি হস্তগত করে ওর মাথায় আদর করে একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে যায় লোকটা। টুসি আর চাঁচায় না এবার।
কতক্ষণ যে এভাবে কাটে, জানে না সে-হঠাৎ ভারী একটা সোরগোল শুনতে পায় টুসি।
চোর-চার! পাকড়ো! পাকড়ো উধর ভাগা-উস তরফ।
হ্যাঁ, সেই পকেট-কাটা হতভাগাই। ছুটতে ছুটতে সে এসে টুসির পাশের রেলিং টপকে পার্কের গেট দিয়ে উধাও হয়।
কয়েক মুহূর্ত পরেই এক পাহারাওয়ালা এসে টুসিকেই জাপটে ধরে–পাকড় গয়ি! এই ভাইয়া! নিজের উচ্চকণ্ঠ ছেড়ে দেয় সে–এবার ফুর্তি ওর দ্যাখে কে!
আরেকজন পাহারাওয়ালা এসে যোগ দেয় তার সঙ্গে–এই! বাহার আও। নিকলো জলদি! টুসিকে এক ঘুসি লাগায় সে কষে–চোট্টা কাঁহাকা?
টুসি ভেউ ভেউ করে কাঁদতে শুরু করে।
আরে! ই তো রোনে লগি! বহুৎ বাচ্চা বা!
বাচ্চা হোই চায় সাচ্চা হই, লেকিন একঠো কো তো থানামে লে-যানা পড়ি।
অপর পাহারাওয়ালাটা বলে–এই! চলো থানাতে।
থানাতেই তো যেতে চাচ্ছি আমি। টুসি কাঁদতে কাঁদতে জানায়–আমায় নিয়ে যাও না থানায় ধরে-বেঁধে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাও না আমাকে। ভারী করুণ কণ্ঠ ওর।
যদি চুরির দায়ে পড়েও মুক্তির সম্ভাবনা আসন্ন হয় এই লৌহ-শৃঙ্খলের কবল থেকে–টুসি তাতেও রাজি এখন। বেশ প্রসন্নমনেই রাজি।
দেহের সমস্ত বল দিয়ে দুই পাহারাওয়ালার দ্বন্দ্ব যুদ্ধ শুরু হয় তখন–কিন্তু দারুণ টানাটানিতেও বিন্দুমাত্রও ধসকানো যায় না টুসিকে। একচুলও এদিকে ওদিকে করতে পারে না ওরা।
দুজনের থমকে গিয়ে হাপাতে থাকে। টুসিও।
বড়ি জোরসে সাটল বা! ই-তো এইসা নিকলবে না! একজন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে!
অন্যজন কপালের ঘাম মোছে–লোহা তোড়না লগি। মিস্তির চাহি ভাইয়া!
অতঃপর দুজনের মধ্যে কি যেন পরামর্শ হয়। কানাকানি ফুরোলে দুজনেই ওরা মুখ ব্যাজার করে–ছোড় দে ভাইয়া! ই-চোরসে হামলোগোঁকা কাম নহি!
এই বলে—’স্থানত্যাগেন দুর্জনাৎ’ চাণক্যের এই নীতি-বাক্য মেনে নিয়ে সরে পড়ে তারা তৎক্ষণাৎ।
চোর তো ছেড়েই গেছে, এখন পুলিশেও ছেড়ে চলে গেল, তাহলে পরিত্রাণের ভরসা সেই এতক্ষণে বুঝতে পারে টুসি। কুকুর, পকেটমার, পাহারাওয়ালা একে-একে সবাই ওকে ছেড়ে গেল!
সকলের পরিত্যাক্ত হয়ে একা সে দাঁড়িয়ে থাকে নির্জ্জন পার্কের একধারে রেলিং-এর সঙ্গে একাকার হয়ে একটা আলোর দিকে তাকিয়ে–
বাতিটা দপদপ করছে তখন থেকেই—
তার দাদুও বোধহয়….
ভোর হয়ে আসে। দু-একজন করে লোক এসে দেখা দেয় পার্কে। বৃদ্ধ ভদ্রলোক সব আসেন–খবরের কাগজ তাঁদের হাতে।
টুসি ঐ তটস্থ অবস্থাতেই নিজের ঘাড়ের ওপর মাথা রেখে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে তখন। একজন ভদ্রলোক ব্যাপারটা দেখতে যান ইশারায় তিনি ডাকেন অপর সবাইকে।
ফিস ফিস করে আলোচনা শুরু হয় তাঁদের—
সেই ছেলেটিই না? যার নিরুদ্দেশের খবর বেরিয়েছে আজকের কাগজে?
তাই তো মনে হচ্ছে।
এই যে লিখেছে–ছেলেটি শ্যামবর্ণ, দোহারা চেহারা, দোহারা বলিলে হয়তো কমিয়েই বলা হয় বরং বেশ হৃষ্টপুষ্টই বলিতে হইবে। যেমন হৃষ্ট, তেমনই পুষ্ট! অদ্য রাত্রি প্রায় দেড় ঘটিকার সময় ডাক্তার ডাকিবার অজুহাতে বাড়ি হইতে বাহির হইয়া নিরুদ্দিষ্ট হইয়াছে। যদি কেহ উক্ত শ্রীমানকে দেখিতে পান দয়া করিয়া শ্ৰীমানের খোঁজ দেন, তাহা হইলে চিরকৃতজ্ঞ থাকিব। কোনোরকমে একবার ধরিতে পারিলে নগদ পাঁচশত পুরস্কার।
