টুসি ঘুমোচ্ছিল পাশের বিছানাতেই, জেগে ওঠে সে। কি দাদু। ডাকছো আমায়?
এক্ষুণি যা একবার বামাপদ ডাক্তারের কাছে। ছুটে যাবি। বলবি যে, মরতে বসেছে দাদামশাই।
অ্যাঁ?–টুসি ধড়মড়িয়ে উঠে বসে।
বলবি যে, সেই কলিকটা–। হঠাৎ ভয়ানক–। উঃ বাবাগো।
ওঃ। সেই কলিক। অনেকটা আশ্বস্ত হয় টুসি। স্টোভে জল ফুটিয়ে বোতলে পুরে দেবো তোমায় দাদু? চেপে ধরবো তোমার পেটে?
ধুত্তোর বোতল। বোতলেই যদি কাজ হোতো, তাহলে লোকে আর ডাক্তার ডাকতো না। বোতলের কাছেই ব্যবস্থা নিত সবাই। উঃ। আঃ। ওরে বাবারে। গেলাম রে।
দাদুর আর্তনাদে বিকল হয়ে পড়ে টুসি। বামাপদবাবুকে কল দিতে যেতেই হয় । কি আর করা?
কিন্তু এই রাত্রিরে? এত রাত্তিরে আসবেন কি ডাক্তার? রাতবিরেতে রাস্তায় বেরুতে টুসি একটু ইতস্তত করে।
বেশি কি রাত হয়েছে শুনি? এই তো সবে দুটো। আর এমন কি দূর? দেরি করিসনে যা। আর্তনাদের ফাঁকে ফাঁকে উৎসাহ-বাণী বিতরণ করেন ওর দাদু।
শার্ট গায়ে, শ্লিপার পায়ে তৈরি হয় টুসি। ছোট্টো মানিব্যাগটা পড়ে যায় পকেট থেকে; যথাস্থানে তাকে আবার তুলে রাখে। ফাউন্টেনপেনটাও আঁটে বুকে। এত রাত্তিরে কে আর দেখছে তার কলম। তাহলেও—তবুও–।
ছুটতে ছুটতে যাবি। দাঁড়াবিনে কোথায়। যাবি আর আসবি। আমি খাবি খাচ্ছি। বুঝেছিস?
অতঃপর মর্মন্তুদ যত অব্যয়শব্দ-অপপ্রয়োগের পালা শুরু হয়ে এর দাদুর–মা গো বাবা গো। গেলুম গো। উঃ। আ। ইস। উঁহুহু।
ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে পড়ে টুসি। এক পলকও দাঁড়ায় না আর।
প্ৰথম খানিকটা সে সবেগেই যায় কিন্তু ক্রমশইঃ ওর গতিবেগ মন্দীভূত হয়ে আসে। খেয়ে না খেয়ে সে বেশ একটু মোটাই; তাড়াহুড়ার পক্ষে খুবই যে উপযোগী নয়, অল্পক্ষণেই সে তা বুঝতে পারে। তবু তার দাদুর যে এখন-তখন, একথা ভাবতেই টুসির মন ভারী হয়ে আসে-ভারী পা-কে তাড়িত করে দেয়। হাঁপাতে হাঁপাতেই সে ছোটে।
এমন সময় রাস্তার এক প্রাণী অযাচিতভাবে এসে টুসির গতিবৃদ্ধির সহায়তায় লাগে, যদিও সে সাহায্য না করলেও টুসির নিজের মতে–বিশেষ কোন ক্ষতিবৃদ্ধি ছিল না।
জনবিরল পথ। কোনো লোক নেই কোথাও। একটা মোটরও চলে না রাস্তায় কেবল ইঁদুররাই এই সুযোগে মহাসমারোহে রাস্তা পারাপার করছে এধারের ফুটপাথ পেরিয়ে ওদিকের অন্দরে গিয়ে সেঁধুচ্ছে। ওদিকে থেকে ছুটে আসছে এদিকে।
যথাসম্ভব তেজে চলেছে, টুসি, ইঁদুরের শোভাযাত্রার পদাঘাত না করে–সবদিক বাঁচিয়ে।
এমন সময় একটা কুকুর–
ইঁদুরদের অন্বেষণেই এতক্ষণ ব্যস্ত ছিল সে বোধহয়, কিন্তু বৃহত্তম শিকার পেয়ে ক্ষীণজীবীদের পরিত্যাগ করতে মুহূর্তের জন্যেও সে দ্বিধা করলো না। টুসির পেছনে এসে লাগলো সে।
ঘেউ—ঘোউ–ঘেউউউ।
টুসি দৌড়োয় আরো-আরো-জোরে। আরো-আরো–তীরবেগে সে ছুটতে শুরু করে।
কুকুর সশব্দে দৌড়ায়। টুসির পেছনে-পেছনেই।
হাঁপ ফেলার ফাঁক নেই টুসির প্রাণপণে সে দৌড়াচ্ছে–। ফিরে তাকাবার ফুসরৎ নেই তার। না ফিরেই সে উদ্ধত আওয়াজ শোনে, উদ্যত নখদন্ত নিজের মনশ্চক্ষেই দেখে নেয়। আরো জোরে সে ছুটতে থাকে।
ছুটতে-ছুটতে তার মনে হয়, দৌড়োচ্ছে সে এমন আর মন্দ কি। মোটা বলে ইস্কুলের ছেলেরা দৌড়ের-স্পোর্টসে নামাবার জন্যে প্রায়ই ওকে ওসকায়; কিন্তু এরকম একটা কুকুরের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে প্রথম পুরস্কারই মেরে দিতে পারে সে একছুটেই–হ্যাঁ।
কিন্তু দরকারের সময় কোথায় তখন কুকুর? এখন-যখন তেমন তাড়া নেই, কুকুরের তাড়নায় ছুটতে হচ্ছে ওকে।
ছুটবার মুখে টুসির সম্মুখে এসে পড়ে একটা পার্ক লোহার সরু করগেট, শিকের রেলিং দিয়ে ঘেরা। পার্কের মধ্যে ঢুকে পড়ে হাঁপ ছাড়ে টুসি। কুকরটা বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিরীক্ষণ করতে থাকে। বড় আর একটা উচ্চবাচ্য করে না সে-কি হবে অকারণে ঘেউৎকারে গলা ফাটিয়ে? নিরাপদ বেষ্টনীর মধ্যে শিকার এখন। শিকের রেলিং ডিঙিয়ে, কি তার কায়দায় দরজা খুলে ভেজিয়ে ভেতরে ঢোকার কৌশল তো ওর জানা নেই। বাইরে দাঁড়িয়ে নিতান্তই জিহ্বা-আস্ফালন এবং ল্যাজ-নাড়া ছাড়া আর উপায় কি?
পার্কের ওধারে একটা গ্যাসে বাতি খারাপ হয়ে দপদপ করছিল। প্রায় নিভবার মুখেই আর কি। বাতির অবস্থা দেখে দাদুর অবস্থা ওর মনে পড়ে। তার জীবন-প্রদীপও হয়তো ওই বাতির মতোই–ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে টুসি।
পার্কের ওধারের গেটটা পেরিয়ে বড় রাস্তা দিয়ে খানিকটা গেলেই বামাপদবাবুর বাড়ি।
টুসি পার্কের অন্যধারে যায়। গেটটা আবার কিছুটা দূরেই–অতটা ঘুরে যেতে অনেক দেরী হয়ে যাবে। সামনেই রেলিং এর একটা শিক বেশ ফাঁক করা দেখতে পায় সে। ছেলেফিলেদের যাতায়াতের সুবিধার জন্যেই বিধাতার সাহায় নিশ্চয়ই এই ফাঁকের সৃষ্টি। ফাঁকের নেপথ্য দিয়ে –ফাঁকি দিয়ে গলে যাবার সোজা রাস্তা নেয় সে।
কিন্তু টুসির হিসেবে ভুল ছিল ঈষত্মাত্র। ছেলের মধ্যে ধরলেও পিলের মধ্যে কিছুতেই গণ্য করা যায় না ভুল ছিল ঈষত্মাত্র। ছেলের মধ্যে ধরলেও পিলের মধ্যে কিছুতেই গণ্য করা যায় না তাকে, বরং পিপের সঙ্গেই তার উপমা ঠিক মেলে। কাজেই মধ্যপথেই সে আটকে যায়–ঠিক তার দেহের মধ্যপথে। এগুতেও পারে না, পেছিয়ে আসাও অসম্ভব।
বহুক্ষণ রেলিং এর সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তি করে–করগেট শিকের বাহুপাশ কিন্তু একচুলও শিথিল হয় না। অবশেষে হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয় সে। কি মুশকিলেই সে পড়লো বলো তো। কোথায় বিছানায় আরামে না কোথায় রেলিং-এর ব্যাড়া মে। কান্না পেতে থাকে তার।
