জয়োস্তু! আপনার দৌহিত্রের আত্নানেই আসা। তার পত্রে আনুপূর্বিক সমসস্তই প্রণিধান করেছি। অত না লিখলেও হতো–যোগবলেই সব।
কি? হয়েছে কি? দাদু একটু ভীতই হন।
আপনার দুঃসাধ্য ব্যাধি–তবে আমি সারিয়ে দেবো। যোগবলে সবই সম্ভব। শুরু যোগবলেই সম্ভব।
কিছু তো বুঝতে পারছি না মশাই! থমমত খান উনি।
সন্ত্রস্ত হবে না। তখন স্বামীজিই সমস্ত বুঝিয়ে দেন সাবলীল ব্যাখ্যায়–এই যে নিদ্রাহীনতা, এ সামান্য ব্যাধি নয়, আশু না সারালে এতেই গতাসু হবার ধাক্কা! যোগের দ্বারাও নিদ্রা আনানো যায়, যাকে বলে যোগনিদ্রা, নিদ্রাযোগের সঙ্গে অবশ্যই তার অগাধ পার্থক্য; যোগবলে মানুষকে এমন কি, চিরনিদ্রায় পর্যন্ত অভিভূত করে দেওয়া যায়, যদিও বলযোগেও সেটা সম্ভব, কিন্তু দুইয়ের ফারাক বহুৎ। উনি ইচ্ছা করলে টুসির দাদুকে এই মুহূর্তেই নিদ্রালু করে দিতে পারেন।
কিন্তু সন্ত্রস্ত হতেই হলো এঁকে–কি আলু? আলুত্বে পরিণতির ভয়াবহ আমঙ্কায় তাঁর চোখ-মুখ তখন বেগুনের মত নীল হয়ে গেছে।
নিদ্রালু। এক্ষুণি হঠযোগের সাহায্যে আপনার ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারি আমি। সহজ করে বলেন স্বামীজি।
কি যোগ বললেন?
হঠযোগ।
ওতে কিসসু হবে না। হতাশভাবে ঘাড় নাড়ের টুসির দাদু। ইঁটযোগ করে দেখা হয়েছে মশাই, কিসসু হয়নি।
ইটযোগ বলতে স্বামীজি কি প্রণিধান করলেন, স্বমীজিই জানেন, কিন্তু তারপরই তিনি ইঁটযোগ আর হঠযোগের পার্থক্য, প্রথমোক্তের চেয়ে শেষোক্তের শ্রেষ্ঠতা, যোগের পরম্পরা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মরূপে বোঝাতে অগ্রসর হন। টুসির দাদুর প্রথমে সংশয়, তারপরে সন্দেহ, তারপরে বিজাতীয় রাগ হতে থাকে। অবশেষে স্বামীজি যখন টাকাকড়ির প্রস্তাবে আসেন, যোগ থেকে একবারে বিয়োগের ব্যাপারে-হঠযোগের ক্রিয়াকলাপে কি কি এবং কত কত খরচ তখন আত্মসংবরণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না।
কী? জোচ্চুরির আর জায়গা পাওনি? বোকা পেয়ে ঠকাতে এসেছ আমায়? বটে? বোমার মতন ফাটেন তিনি–নিয়ায় তো টুসি, সেই হঁটখানা। ইঁটযোগ কাকে বলে, একবার বুঝিয়ে দিই লোকটাকে।
আপমান-সূচক কথা বলবেন না বলছি। স্বামীজিও চটে যান।–তাহলে আমি রাগান্বিত হয়ে এই মুহূর্তেই হয়তো আপনাকে ভস–ভস্মীভূত করার আগেই ফস করে তাঁকে থামতে হয় হঠাৎ। সেই মুহূর্তে ইঁট হস্তে টুসির প্রবেশ ঘটে।
আহা ক্রোধ-পরবশ হচ্ছেন কেন। ক্রোধ-পরবশ–বলতে বলতে কয়েক–পা পিছিয়ে যান স্বামীজি এবং পরমুহূর্তেই সুপরিকল্পিত এক পশ্চাৎ লাফে অদৃশ্য হন, বোধকরি যোগবলেই।
টুসির দাদু শুধু বলেন–ছ্যাঃ!
ঐ অব্যায়–শব্দে টুসির কি প্রণিধান হয় কে জানে; সে লজ্জায় ঘাড় হেঁট করে থাকে।
ওর বিষণ্ণ-মুখ দেখে মায়া হয় দাদুর!–যাক, তাতে আর কি হয়েছে? তুই তো ভালই চেয়েছিলি–যাকগে, ভালই হয়েছে। পরশু আছে শিবরাত্রি। ছোটবেলা থেকে ভেবে আসছি যে, শিবরাত্রি করবে; কিন্তু করা আর হয় না! হয় খেয়ে ফেলি, নয় ঘুমিয়ে পড়ি। এবার তো আর ঘুমোনোর ভয় নেই, কেবল খাওয়াটা বাদ দিতে পারলেই হয়। তাহলে হলো। পুণ্যটা করে ফেলা যাক এই ফাঁকে। কি বলিস?
টুসি এতক্ষণে খুশি হয়–আমিও দাদু করবো তাহলে!
তখন দুজনে মিলে প্ল্যান আঁটেন–না-খাওয়ার, না-ঘুমোনোর প্ল্যান। দীর্ঘ এক ফিরিস্তি বেরোয়–কখন কি কি না করতে হবে তার। টুসি কি না খেয়ে থাকতে পারবে, বিশেষ করে না ঘুমিয়ে? যা ঘুম পায় ওর। আর যেমন বিটকেল খিদে। দিনরাত খালি খাই-খাই। আর সারাদিন না হয় টেনিস খেলেই গেল, কিন্তু রাত্রে? রাত্রে টেনিস খেলা তো সম্ভব নয়, আর রাত্রে তো ঘুম পাবেই টুসির। এ বিষয়ে টুসির দাদুর বিশ্বাস সুদৃঢ়; টুসির নিজেরও যে একেবারে সন্দেহ নেই, তা নয়।
টুসি প্রস্তাব করে–সরারাত সিনেমা দেখা যাক না কেন? তাহলে কিছুতেই ওর ঘুম পাবে না, শিবের দিব্যি গেলে সে বলতে পারে। কত ভাল-ভাল বাংলা বই আর বিলিতি সিরিয়াল হোলনাইট শো রয়েছে সব হাউসেই।
বায়স্কোপে দাদুকে রাজি করাতে বেশী বেগ পায় না সে। আর তখন থেকেই লাফানো শুরু হয়ে যায় তার।
শিবরাত্রির সকাল থেকেই উপবাস শুরু হয় টুসির। প্রথমে রাস্তায় বেরিয়েই এক বন্ধুর আমন্ত্রণে রেস্তোরাঁয় বসে অন্যমনস্কতার বশে এককাপ চা একখানা মামলেট; তারপরে ঘন্টা-দুয়েক বাদ আর এক বন্ধুর পাল্লায় পড়ে মনের ভুলে ফের চিনেবাদাম আর ডালমুটের সদ্ব্যবহার; তারপরে আরেজনার খপ্পরে পড়ে আবার শোন পাপড়ি আর চন্দ্রপুলি, সেও অবিশ্যি ভুলক্রমেই; তারপরে বিকেলে যোগেশদার আহ্বানে অনিচ্ছাসত্ত্বেই একপ্লেট মটনকারি আর খানকয়েক টোস্ট তারপর সন্ধ্যের মুখে ওদের ক্লাসের সেকেন্ড বয় সমীরের বাড়ি হানা দিয়ে এবং সে না সাধতেই–তাকে সতর্কতার অবকাশ না দিয়েই তার পাত থেকে পাঁচখানা পরোটা আর গোটা-আলুর দম–এইভাবে সারাদিন দারুন উপবাস চালিয়ে শ্রান্ত, ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত টুসি রাত নটার দাদুর সঙ্গে যায় নামজাদা এক সিনেমায়।
দাদুর ব্যারাম সোজা নয়
মাঝরাতে টুসির দাদুর পেট-ব্যাথাটা খুব-জোর চাগাড় দিয়ে উঠলো। দুহাতে পেট আঁকড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লে তিনি–এই কলিক। এতেই প্রাণ তার লিক করে বুঝি এক্ষুনিই। তার মর্মান্তিক হাঁকডাক শুরু হয়–টুসি টুসি।
