আজকাল সকাল থেকেই শুরু হয় তাঁর উপক্রমণিকা-পাঠ, এরকম নিত্যক্রিয়ার মধ্যে; আর বিকেলে টুসি ইস্কুল থেকে ফিরলে পরে টেনিস-পর্ব– সেটাকে নৃত্য ক্রীড়া বলা যেতে পারে। আর রাত্রে? সারারাত তার চোখে ঘুম ত নেইই, টুসিরও ঘুমের দফা রফা।
কোন গোলটা তাঁকে নিতান্ত অন্যায় করে দেওয়া হয়েছে, কোনটাকে আর একটু হলেই নির্ঘাৎ বাঁচানো গিয়েছিল, কোন গোলটার পায়ের ফাঁকের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়ার অপরাধ কিছুতেই তিনি মার্জনা করতে পারেন না, এমনি না জানিয়ে সুড়ুৎ করে চলে গেল যে হঠাৎ! কোন অবশ্যম্ভাবী গোলকে তিনি অকস্মাৎ দুপা জুড়ে দিয়ে গলে যেতে দেননি, সোজাসুজি গোল দেবার কি-কি নতুন কায়দা তিনি আবিষ্কার করেছেন, কোনটাকে তিনি কৃপা করে ছেড়ে দিয়েছেন বলের প্রতি নয়, টুসির প্রতি কৃপাবশেই, কোন গোলটা তিনি নিজেই, হ্যাঁ, তিনি নিজেই ত-আর একটু হলেই প্রায় দিয়ে ফেলেছিলেন আর কি বিছানায় শুয়ে-শুয়ে সেইসব কূটকচালে আলোচনায় টুসিকে যোগ দিতে হয় তাঁর সঙ্গে।
আচ্ছা ফুটবলেও ত গোল দ্যায় বলে শোনা যায়? দ্যায় না? টেনিসেও দ্যায়। স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। ফুটবলের গোলে আর টেনিসবলের গোলে তাহলে প্রভেদ কোথায়? দুটোর আকারে আর ওজনে তফাত আছে অবশ্যি, তা ঠিক! যদিও দুটোই গোলাকার তাহলেও ভারি গোলমাল ঠেকে ওর দাদুর। দুটো খেলাতেই যখন গোল দেবার প্রথা এক, কোন প্রকারভেদ নেই, তখন আলাদা নামকরণ কেন? বলের আকারভেদের জন্যেই কি তাহলে?
দাদুর জিজ্ঞাসুতার কি জবাব দেবে টুসি? শুনতে শুনতে নাজেহাল হয়ে পড়ে সে।
প্রহরের পর প্রহর চলে যায়–অফুরন্ত বাক্যলাপ আর ফুরোয় না। হঠাৎ ওর দাদু মোড় ঘোরেন তদ্ধিত-প্রত্যয় জানিস? জানিস কি? জানিস। আচ্ছা, বল ত তাহলে লকারার্থ নির্ণয় কাকে বলে?
খেলার ঠেলা তবুও ভাল উপক্রমণিকার উপক্রমেই গলা শুকিয়ে আসে টুসির। ক্ষীণস্বরে সে জানায়–উঁহু! এ বিষয়ে তার নিজের প্রতি একটুও প্রত্যয় আছে বলে মনে হয় না।
বটবৃক্ষ সন্ধিবিচ্ছেদ করত। করতে পারিস? খেলার থেকে ব্যাকরণে নেমেছেন ওর দাদু! দেখেছিস করে?
ভাল করেই দেখে টুসি। বটবৃক্ষের শাখা-প্রশাখাগুড়ির থেকে শুরু করে মায় গাছের ডগা অব্দি, পাতার থেকে মাথা পর্যন্ত কোথাও বাদ রাখে না, কিন্তু কোথাও কোন বিচ্ছেদের আভাসমাত্রও তার নজরে পড়ে না।
পারলিনে ত? বট ছিল বৃক্ষ, হলো গিয়ে বটবৃক্ষ–দেখলি?
ওর দাদু জোর দিয়েই জানতে চান যে, এটা হলো গিয়ে স্বরসন্ধি এবং নিশ্চয়ই এর কোন ভুল নেই কিন্তু মানতে কিছুতেই রাজি হয় না টুসি। অদৃশ্য সন্ধিতে সে ঘোরতর অবিশ্বাসী। ওর মতে যদি হতেই হয়, তবে নিছক এটা দাদুর একটা অভিসন্ধি কেবল।
সেও পাল্টা প্রশ্ন করে বসে দাদুকে–আচ্ছা, Buchanan সন্ধিবিচ্ছেদ কর ত তুমি!
বুচানন? এ আর এমন শক্তটা কি? বুচা ছিল আনন, হলো গিয়ে বুচানন–যেমন পঞ্চানন আর কি! আবার সমাসও হয় বুচা আনন যাহার, সেই বুচানন; কিন্তু কি সমাস, কে জানে! দ্বন্দ্ব না বহুব্রীহি? ওঁর নিজেরই কেমন খটকা লাগে। মধ্যপদলোপী কর্মধারায়ও হতে পারে বা। সমাস-প্রকরণটায় এখন উনি তেমন পাকা হতে পারেননি, অকালপক্ক এখন টুসির মতই! ভাল করে পোক্ত হতে কমাস লাগে, কে জানে!
হঠাৎ ওঁর প্রাণে সন্দেহ জাগে–আমাদের পাড়ার সেই ফিরিঙ্গিটা নয়ত রে? বুচানন সাহেব? সাবধান, ওর সঙ্গে যেন কোন সন্ধি বাধাতে যাস না। মারখুনে মানুষ—কাণ্ডজ্ঞানহীন–কখন কি করে বসে তার ঠিক নেই তো!
নাতিকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপ তিনি সাবধান করে দেন।
আচ্ছা উপসর্গ কয় প্রকার বল ত দেখি?
পর-পর তিনবার একটা বেজে গেছে ঘড়িতে–সাড়ে বারোটার, একটার এবং দেড়টা ঘণ্টা–সেও হয়ে গেল কতোক্ষণ! ঘুমে সারাদেহ জড়িয়ে আসছে টুসির–এখন উপসর্গে কেন–সোজা স্বর্গে যেতে বললেও সে রাজি নয়, শক্তিও নেই তার।
আচ্ছা আমি বলে যাচ্ছি, তুই গুণে যা। প্র, পরা অপ, সং–
ঘুমের ঘোরেই শুনতে থাকে টুসি। কটা হলো উপসর্গ সবশুদ্? দশটা না না দুশোটা? ওর নিজেকে নিয়ে? দাদুকে ধরে, না বাদ দিয়ে? আর বুচানন? সেও তো দেখতে অনেকটা সঙের মতোই! সঙও তো একটা উপসর্গ? বুচানন তাহলে উপসর্গ। আর বটবৃক্ষ? বটগাছের তদ্ধিত হয়? বুচাননের?–
–উৎ পরি, প্রতি, অভি, অতি, উপ, আ! কিরে? গুণলি? কটা হলো? আরে মোলো যা, এ যে নাক ডাকতে লেগেছে!
দেখতে না দেখতে আরেক উপসর্গ দেখা দিয়েছে টুসির। নাঃ ভারী ঘুম কাতুরে হয়েছে ছেলেটা! এই কথা বলছে–বলতে-বলতে–এই ঘুম? দিনরাতই ঘুমুচ্ছে! আশ্চয্যি! ঘুমিয়ে কি সুখ পায় এরা? ঘুমিয়ে হয়টা কি, অ্যাঁ? নাক-ডাকানো নাহক সময়ের অপব্যয়! নাঃ ঘুমিয়েই ফতুর– মানুষ আর হলো না ছোঁড়াটা। কড়িকাঠের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়তে থাকে দাদুর।
সকালে টেবিলে বসে মলিনমুখে দৈনিক কাগজের পাতা ওলটায় টুসি। এত বড়ো আনন্দবাজার সামনে, তবু সে নিরানন্দ। দাদুর অসুখ সারাতে গিয়ে নিজের সুখও তার গেছে। হঠাৎ বিজ্ঞাপনের এক জায়গায় তার চোখ গিয়ে আটকায়–স্বামীজির অদ্ভুত যোগবল! পড়ে উৎপুল্ল হয়ে দাদুকে লুকিয়ে সেই ঠিকানায় একটা চিঠি লিখে ছেড়ে দেয় তক্ষুনি।
পরদিন প্রাতঃকালেই নধর-দর্শন স্বামীজির প্রাদুর্ভাব হয় তাদের বাড়িতে। কি চাই আপনার?
