তাহলে কী যে হতো আজ, তা অবিশ্যি তিনি আন্দাজ করতে পারেন না। সকালে উঠে টুসি, দাদুকে নিদ্রিত না দেখুক, কিন্তু খুশি দেখেছে। পুলকিত না দেখতে পাক, অন্তত তিতবিরক্ত দেখতে হয়নি।
উপক্রমণিকা মুখস্থ করেও যখন বিনিদ্রার ব্যতিক্রম দেখা গেল না, তখন অন্য প্রস্তাব পাড়ে টুসি। খেলাধুলো করলে কেমন হয়? ফুটবল কি টেনিস বা ঐরকমের একটা কিছু? ফুটবল খেলে ফিরলে কেমন গা ঝিম ঝিম করে। আপনার থেকেই চোখের পাতা জড়িয়ে আসে টুসির। সেইজন্যেই তো সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসেই যে সে চেতনা হারায়, রাত্রে খাবার সময় অমন ষাড়ের ডাকাডাকিতেও সহজে তার সাড়া মেলে না।
মাঠে গিয়ে তোমার মতো বল পিটতে পারব না বাপু! ওসব গোঁয়ারদের খ্যালা। যতো সব গুণ্ডারাই খ্যালে! তারপর ল্যাং মেরে ফেলে দিক আমায়! ফেলে আমার ঠ্যাং ভেঙে দিক আর কি! দাদু মুখ বেঁকান।
মাঠে কেন, ছাদে? আমাদের বাড়ির ছাদেই তো। টুসি তাঁকে আশ্বস্ত করে। আর কেউ না, কেবল তুমি আর আমি।
হ্যাঁ, তাহলে হয় বটে! কিন্তু দয়াখো বাপু, কেয়ারি করতে পাবে না, ফাউল টাউল করা চলবে না তা বলে। আর দাদু শেষ পর্যন্ত খোলসা করেই কন–আর আমাকেও কিন্তু বল মারতে দিতে হবে–মাঝে-মাঝেই।
বাঃ, তুমিই তো মারবে তোমারই তো দরকার একসারসাইজের! টুসি বিশদ করে দেয়–ভয় সেই, আমি একলা-একলা খেলবো না।
আমি গোল দেবো কিন্তু! আমাকেও গোল মারতে দিতে হবে! হা!
বেশ তো, তুমিই খালি গোল দিয়ে। আমি একটাও গোল দেব না তোমায়। গোড়াতেই অভয় দিয়ে টুসি গোলযোগ থামাল।
তারপরে পাড়ার এক টেনিসক্লাব থেকে বহু ব্যবহৃত ও বহিস্কৃত একটা ডিউস বল যোগাড় করে হাজির হয় টুসি।
অ্যাঁ! এত ছোট?; দাদু অবাক হন–ফুটবল এত ছোট কেনরে?
ফুটবল না তো। টুসি জানায়, ছাদে কি অত বড়ো ফুটবল চলে কখনো? আমার এক শটে তাহলে তো কোথায় উড়ে যাবে, তার ঠিক নেই। তাই টেনিসের বল নিয়ে এলাম। টেনিসই বা মন্দ কি দাদু?
তা মন্দ কি! তিনিও সায় দেন–তবে টেনিসই হোক,ক্ষতি কি তাতে? ফুটবল সম্পর্কে ব্যাটবল, ব্যাটবল আর টেনিস, টেনিস আর ক্রিকেট, ক্রিকেট আর হকি–তাদের তারতম্য বিশেষত্ব কেবল নামমাত্র নয়, ভালোভাবেই দাদুর জানা; ওদের ভেদাভেদের সব খবর তাবৎ রহস্য কিছুই তার অবিদিত নেই আর।
তারপর থেকে দুপদাপ, ধুপধাপ–পাড়ার লোক সচকিত হতে থাকে প্রত্যহ। বাড়িওয়ালা এসে বলেন–ছাদ ভেঙে ফেলবেন দেখছি। কি হয় আপনাদের ফুটবল খেলা?
ফুটবল? না তো। দাদুর চোখ কপালে ওঠে–ফুটবল! রামমাঃ! ফুটবল আবার খ্যালে মানুষে? ওতো গোঁয়ারদের খ্যালা মশাই! আমরা, টেনিস খেলি। আসবেন, আপনিও আসবেন–তিনজনেই খালা যাবে না হয়।
বাড়িওয়ালাকে আমন্ত্রণ করে তো বসেন, কিন্তু সন্দিগ্ধভাবে একটা থেকেই যায় তাঁর। আপনমনেই বলেন তিনি আসবেন তো খেলতে, তবে টুসির সঙ্গে পেরে উঠলে হয়! আমি যে আমি–-আমাকেই গলদঘর্ম করে দিচ্ছে!
বাড়িওয়ালা আসেন বিকেলে, ঈষৎ আপ্যায়িত হাসিমুখ নিয়েই–হ্যাঁ! বাড়রি ছাদ আমার বেশ বড়োই, টেনিস খ্যালা যায় বটে। তবে আপনারাই খেলুন, আমি দেখি। এই স্কুলদেহ নিয়ে এ-বয়সে আর ঐসব খ্যালাধুলোর হুলস্থুল আমার পোর না মশাই!
টেনিসের বল পড়ে ছাদে। বলটাকে রাখা হয় সেন্টারে নাতি আর দাদু দুজনেই মুখোমুখি হন–নাতি বৃহৎ কুরুক্ষেত্রের সম্মুখে।
নেট? নেট আবার কি? নেট কে? নেটে কি হবে? কিসের নেট? দাদুও কম বিস্মিত নন।
কেন টেনিস নেট? বাড়িওয়ালা বলেন। বলই তো দেখছি কেবল–তাও তো কুল্লে একটাই। র্যাকেটই বা কোথায়?
ততক্ষণে খেলা শুরু হয়ে যায় ওঁদের। খেলতে-খেলতেই বলেন দাদু-বলের সঙ্গে ই তার গলা চলেও, ব্যাটের কথা বলছেন? আমাদের তো এ ব্যাটবল-খেলা নয় মশাই! ভুল করছেন আপনি–খ্যালার কোনো খবর তো রাখেন না! আর কি করেই বা রাখবেন–এসব খ্যালাধুলো তো আর ছিল না আমাদের কালে! তাই এসব খ্যালার নাম-ধাম জানার কথাও নয় আপনার। আরে মশাই–আমরা টেনিস খেলছি যে। ওই যাঃ! দেখুন তো গোল দিয়ে দিলে বকতে বকতে সামলাই বা কখন ছাই!
আর বৃথা বাক্যব্যয় না করে গোলের মুখে গিয়ে তটস্থ হয়ে দাঁড়া তিনি। দুড়দাড় করে বল পিটিয়ে আনছে টুসি, কোন ফাঁকে যে গোল দিয়ে বসে কিসের ফাঁকতালে যে ফের আবার গোলযোগ ঘটায়, ঠিক নেই কিছু। তর্ক মাথায় রেখে এখন রেখে এখন সতর্ক হয়ে থাকতে হয় তাঁকে।
বাড়িওয়ালা চটেই যান, তাঁর নিজের বাড়ির ওপর একটা বাড়াবাড়ি তার বরদাস্ত হয় না। বাড়ির মায়ার জন্যে ততটা নয়; যেরকম খেলার দাপট, তাতে এর ইহকাল, পরকাল-সমস্তই ঝরঝরে! এবাড়ির ভবিষয়তের আশা তিনি ছেড়েই দিয়েছেন–খেলোয়াড়দের স-বলতার জন্যই ছাড়তে হয়েছে; কিন্তু তাহলেও টেনিস-বলের প্রতি ফুটবলের ন্যায় এই দুর্ব্যবহার তার সহ্য হয় না– এইটেই সবচেয়ে তাঁর প্রাণে লাগে। বিশেষ রকম ব্যথা দেয়।
ঘুম না হোক, খেলার ফল অবিশ্যি একটা দেখা যায়–সেটাকে হয়তো সুফলই বলা যেতে পারে।
টুসির দাদু আর অভিযোগ করেন না, নিদ্রাহানির জন্যে কোন ক্ষোভের বাণী তার মুখে শোনা যায় না আর।–নাই হোকগে–ঘুম না হয় নাই হোলো, না হোলো তো বয়েই গ্যালো আমার! ঘুমের দরকারটাই বা কি? ঘুমিয়ে কে কবে বড়লোক হয়েছে? দুরদুর–ঘুমোয় আবার মানুষ! যতো গরু, ভ্যাড়া, ছাগল, গাধারই খালি ঘুমিয়ে সময় বাজে নষ্ট করে। এবংবিধ সব বাক্যই বরং তাঁর মুখে এখন।
