আচ্ছা দাদু, এক কাজ করলে হয় না–?
কি কাজ?
আমতা আমতা করে কোনরকমে বলে ফেলে টুসি–নতুন একটা বুদ্ধি খেলেছে ওর মাথায়–সেই যে এক রাত্তিরে তোমার কলিকের জন্যে ডাক্তার ডাকতে বেরিয়েছিলাম, রাস্তায় দেখেছিলাম কি, বড়ো রাস্তাতেই দেখেছিলাম, ফুটপাথের ওপর সারা ফুটপাথ জুড়ে কত লোক যে শুয়ে আছে, একফুট পথও বাদ রাখেনি। আর তারা শুয়ে আছে দিব্যি আরামে, বালিশের বদলে মাথায় কেবল একখানা করে ইঁট দিয়ে। অক্লেশে ঘুম দিচ্ছে–খাসা ঘুমোচ্ছে তারা–কুকুর-ফুকুর কারু কোনো তোরাক্কা না করেই–
ফুটপাথে গিয়ে আমি শুতে পারবো না বাপু। তা তুমি যাই বলো। তা ছাই আমার ঘুম হোক, আর নাই হোক–
না-না ফুটপাথে কেন, আমার মনে হয় কি জানো দাদু ফুটপাথ নয়, ঐ হাঁটের সাথেই ঘুমের কোন যোগাযোগ আছে। একটা শক্ত জিনিসে মাথা রাখলে ঘুম না হয়েই পারে না-জানো দাদু, ইস্কুলের ডেক্সওয়ালা বেঞ্চে বসে বইয়ের গাদায় মাথা রেখে ছেলেরা কেমন তোফা ঘুমোয় মাস্টার ক্লাসে এলেও টের পায় না। তখনো তাদের নাক ডাকতে থাকে, মাস্টারের হাঁক-ডাকেও ঘুম ভাঙে না। জানো?
দাদু ভুরু কুঁচকে ব্যবস্থাপত্রটা ভেবে দেখেন।
টুসি উৎসাহ পায় বুঝেছ–দাদু, ঐ বালিশের জন্যেই ঘুম হচ্ছে না তোমার। যা নরম। যখন আমার মাথায় তলায় বালিশ থাকে না, চৌকির তলায় চলে যায়, তখনই আমি দেখছি–আমার ঘুম সবেচেয়ে ঘন হয়ে ওঠে–বুঝেছো দাদু।
যা তবে, নিয়ায় ইঁট! ঢালাও হুকুম দিয়ে দেন ওর দাদু। রাস্তার থেকেই আনবি তো? ভাল দেখে আনিসি কিন্তু। দেখে-শুনে ভাল করে বাজিয়ে–বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখে–বুঝলি? হাঃ, রাস্তার ইঁট আবার ভাল হবে! কিন্তু কি আর করা, উপায় তো নেই!
মনোহারি দোকানে তো কিনতে পাওয়া যায় না ইঁট। টুসির অনুযোগ।
তবে যা, তাই নিয়ে আয়গে–সাবান দিয়ে সাফ করে নিলেই হবে। যা।
বলতে না বলতেই দৌড়ান টুসি। একখানা আঠারো ইঞ্চি, একটুকরো কার্বলিক–সোপ আর তিনখানা চন্দন-সাবান আর পামোলিভ নিয়ে আসে সেই সঙ্গে। প্রথমে কার্বলিকটা দিয়ে হঁটের যত জীবাণু-ছাড়ানো, তারপরে পামোলিভ ঘসে ঘসে কার্বলিকের গন্ধ–তাড়ানো! সবশেষে চন্দন সুরভিত করা। তার সৌরভ বাড়ানো।
দেখছো দাদু! সাবান-টাবান মাখিয়ে কিরকম করে ফেলেছি ইঁটখানাকে?
দাদু শুঁকে দেখেন একবার–হুম! বেশ উপাদেয় হয়েছে বটে।
রাজভোগ্য ইঁট-মাথায় সারারাত কেটে যায় দাদুর–কিন্তু ঘুমোবার ভাগ্য আর হয় না। একপলের জন্যেও চোখের পলক পড়ে না তার।
সকালে উঠেই তার গজগজানি শুনতে হয় টুসিকে–হ্যাঃ ইঁট না ছাই! ইঁট মাথায় দিয়ে শুয়ে আছে সবাই! দিব্যি আরামে ঘুমোচ্ছে তারা! কি দেখতে কি দেখছেন, তার নেই ঠিক। মাঝখানে থেকে আমার–উঃ! সেই তখন থেকেই মাথাটা টাটিয়ে আছে! বলে মাথার বদলে ঘাড়েই হাত বুলোতে থাকেন তিনি।
উঃ কী মাথাটাই না ধরেছে!…ক্যাফিয়াস্পিরিন? ক্যাফিয়াস্পিরিনে কি হবে আমার? ক্যাফিয়াস্পিরিন কে কিনে আনতে বললো তোকে? একি তোের সেই আধকপালে? বলছেন মাথা ধরেছে? সমস্ত মাখাটাই এই ঘাড়ের এখান থেকে ও-ঘাড় পর্যন্ত। ক্যাফিয়াস্পিরিনে কি করবে এর? ঘাড় ধরা কি সারে ওতে? অ্যাস্পিরিন-ট্যাস্পিরিনের কম্মো নয় বাপু!
ঘাড়ের দুধারই ধরে গেছে তোমার, বলছো কি দাদু? ।
ধরবে না? ইঁটখানা কি একটুখানি? দাদু ঘাড় নাড়েন।
আমূল-মস্তকের সর্বত্রই ধরেছে, কিন্তু যার ধরবার ছিল–নিদ্রাদেবী, যদি-বা তিনি আসতেন, কিন্তু ইটের বহর দেখে ত্রিসীমানার মধ্যেও আর ঘেঁস দ্যাননি তিনি–ইত্যাকার নিজের মতামত প্রবলভাবে ব্যক্ত করতে থাকেন ওর দাদু!
টুসি? টুসি আর কি করবে? চুপ করে শুনতে থাকে। এঁটের আপরাধ অম্লানবদনে নিজের ঘাড় পেতেই নেয় সে।
কয়েকদিন পরে একরাত্রে দাদু অনিদ্রার আতিশয্যে ছটফট করছেন, পাশের বিছানায় শুয়ে ওর নিজের চোখেও ঘুম নেই–ভয়ে-ভয়ে একটা কথা বলে ফেলে টুসি–
আচ্ছা দাদু তুমি উপক্রমণিকা পড়ে দেখেছো কখনো? সত্যি-সমসকৃত পড়তে বসলেই এমন ঘুম পায়, অ্যাতো ঘুম পায় আমার, যে কী বলবো!
কথাটা মনে ধরে ওর দাদুর। টুসির দিদিমা বই হাতে নিয়ে দিবানিদ্রা শুরু করতেন, স্মরণ হয় ওঁর। প্রত্যহই প্রথম থেকে হরিদাসের গুপ্তকথা তাঁর আরম্ভ হতো, কিন্তু কোনোদিনই আড়াই পাতার বেশি এগুতে পারতে না; বলতেন–আঃ কী ঘুমটাই না আছে ঐ বইটাতে! অবশেসে গুপ্তকথা অজ্ঞাত রেখেই একদা ওঁকেই ভবলীলা সাঙ্গ করতে হয়েছে, কোন এক গুপ্ততর জগতে চলে যেতে হয়েছে, ভেবে অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে দাদুর চোখ। একদিন বইখানা খুঁজে পাওয়া যায়নি, সেদিন দুপুরে, কী আশ্চয্যি, ঘুম তো হলোই না বৌয়ের, উপরন্তু তার বদলে তার সঙ্গে বকাবকি করে অম্বল হয়ে গেল।
যা, নিয়ায় তো! উপক্রমণিকাকেই দেখব আজ।
টুসি কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু ওর দাদু মাথার কাছে আলো জ্বেলে উল্টে যাচ্ছেন পাতার পর পাতা–উপক্রমণিকাও শেষ আর রাতও কাবার! বাস্তবিক, কী চমৎকার বই এই উপক্রমণিকা, ঘুম না হোক, দুঃখ নেই কিন্তু কী ভালই লেগেছে যে দাদুর! সন্ধি বিধি ও যত্ন-ণত্তের অনুক্রম থেকে শুরু করে দ্বন্দ্ব ও মধ্যপদলোপী আর যাবতীয় সমাসকে অবহেলায় অতিক্রম করে, নরঃ-নরৌ-নরাঃ এবং লট-লোট-লঙ-বিধিলিঙের বৃহভেদ করে বীরবিক্রমে এগিয়েছেন তিনি, তুদাদি ধাতু থেকে, তদ্ধিত প্রত্যয় পর্যন্ত পার হয়ে গেছে তার, সহজেই হয়ে গেছে; ণিজন্ত প্রকরণ ও পরস্মৈপদীয় ব্যাপারটাও বেশ হাড়ে-হাড়েই বুঝেছেন, অবশেষে কর্মবাচ্য ও কর্তৃবাচ্য থেকে ভাববাচ্যে এসে ঠেকেছেন এন। আগাগোড়া সবই তিনি পড়েছেন সাগ্রহে। পড়েছেন আর ভেবেছেন। ভেবেছেন আর অবাক হয়েছেন। কত সত্য, কত তত্ত্ব, কত রহস্য, কী গভীরত্বের পরিচয়ই না নিহিত আছে ওর পাতায় পাতায়? ওর বিধি-বিধানে জীবনের কত জটিল সমস্যা সমাধানই না খুঁজে পেলেন। বাস্তবিক, ওকে ব্যাকরণ না বলে ব্যাকরণদর্শনই বলা চলে, এর জন্যে যদি ষড়দর্শনের তালিকায় আরেকটা সংখ্যা বাড়াতে হয়–বাড়িয়ে সপ্তম দ্রষ্টব্যেরও আমদানি করতে হয়–তবুও। আহা! অবহেলা না করে ছেলেবেলায় এই সদগ্রন্থ মন দিয়ে পড়তেন যদি!–
