কিন্তু হর্ষবর্ধন আর চুপ করে ব েথাকতে পারেন না, লাফিয়ে ওঠেন হঠাৎ আমার চোখের সামনে বউটাকে করাতচেরা করবে আর আমি বসে বসে তাই দেখব। লোকটা পেয়েছে কি? বলে তিনি ঝড়ের বেগে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেন। গোবর্ধনও সাথে সাথে যায়। চকরবরতি আমি তাদের পশ্চাদ্বর্তী হই।
কি পেয়েছেন আপনি? ঝাঁঝিয়ে ওঠেন তিনি ডাক্তারের ওপর : করাত দিয়ে আমার বউকে কাঠবেন যে? কেটে দু-কুটরো করবেন আপনি? কেন? কেন? যতই কাঠের ব্যবসা করি মশাই, এতটা আকাট হইনি এখনো কেন, কি হয়েছে আমার বউয়ের যে করাত দিতে তার
কিসের বউ! বাধা দেন ডাক্তার ও আমি পড়েছি আমার ব্যাগ নিয়ে। বউকে আপনার দেখলাম কোথায়। হতভাগা ব্যাগটা একেক সময় এমন বিঘড়ে যায়। হাতুড়ি পিটে, ছেনি দিয়ে উকো ঘষে কিছুতেই এটাকে খুলতে পারছি না। করাত দিয়ে কাটতে লেগেছি এবার। এর মধ্যেই তো আমার যন্তরপাতি, ওষুধপত্র, এমনকি থার্মোমিটারটি পর্যন্ত। আগে এসব বার করলে তবে তো দেখব আপনার বউকে। রাজ্যের রোগ সারাই আমি কিন্তু নিজের ব্যাগ সারাতে পারি না। এই ব্যাগটাই হয়েছে আমার ব্যায়াম।
দাদুর চিকিৎসা সোজা নয়
টুসির দাদুকে ধরেছে এবার এক অদ্ভুত ব্যারামে–এক আধ দিন নয়, প্রায় মাসখানেক থেকে কিছুতেই ঘুম হচ্ছে না ওঁর; কত ডাক্তার, কবিরাজ, হাকিম, বৈদ্য, হোমিওপ্যাথ ও হাতুড়ে–নামজাদা আর বদনামজাদা, নানারকমের চিকিৎসা করে হদ্দ হয়ে গেল–কিন্তু অসুখ–সারার নামটি নেই আর। এই একমাসে এ ডিসপেনসারি ঔষুধই গিলে ফেললেন তিনি, কিন্তু অসুখ একেবারে অটল–যেমনকে তেমন।
ঘুম তার হয় না আর। রাত্রে তো নয়ই, দিনের বেলায়, দুপুর কিংবা বিকেলের দিকে–তাও না! ভোরবেলায়, কি সকালে ঘুম ভাঙবার পর, কিংবা রাত্রে খাবারের ডাক আসবার আগে–যেসব অধোদয়যোগে টুসির এবং সব স্বাভাবিক মানুষেরই স্বভাবতই ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে, প্রগাঢ় নিদ্রা আপনা থেকেই এসে জমে, তিনি আপাদমস্তক চেষ্টা করে দেখেছেন, কিন্তু না, সে-সব মাহেন্দ্রক্ষণেও ঘুম তার পায় না, এমন কি, টুসির পড়ার টেবিলে বসেও দেখেছেন, টুসির পরামর্শ মতই, কিন্তু সব প্রাণপণ প্রয়াসই ব্যর্থ হয়েছে তার। অবশেষে তিনি সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়েছেন–
যখন হাকিমি দাবাই-ই দাবাতে পারলো না, তখন এ রোগ আর–
বাক্যটার তিনি আর উপসংহার করেননি, নিজেকে দিয়েই তা করতে হবে হয়তো, এইরকমই তার আশঙ্কা।
ডাক্তারিতেই বা কি হবে? বলে, পুরো একটা ডিসপেনসারিই সরিয়ে ফেললাম–হ্যাঁ!
কোথায় সরালে দাদু? কই আমি জানি না, তো! বিস্মিত হয়ে জিগগেস করে টুসি–দাদুর এবং বিধ কার্য্যকলাপের সে তো ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি কখনো।
কোথায় আবার! আমার এই পেটেই–পেটের মধ্যেই!
ও তাই বলো। পেটের খবর সে টের পাবে কি করে?
তবুও সারলো না অসুখ।
দাদুর খেদোক্তিতে টুসির মন কেমন করে। তাই এবার সে নিজেই দাদুর চিকিৎসার ভার নেবে, এইরকমই সে স্থির করেছে। তখন থেকেই দস্তুরমতো মাথা ঘামাতে লেগেছে। স্কুলের টাস্ক, মার্বেল খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, এমন কি সুযোগ পেলেই একটু ঘুমিয়ে নেওয়া ইত্যাদি সব জরুরি কাজ ছেড়ে দিয়ে কেবল ওর দাদুকে ভাল করার কথাই সে ভাবছে এখন। কতকগুলো উপায় মনেও যে আসেনি তার, তা নয়। কোন সম্রাট অসুস্থ ছেলের বিছানার চারদিকে ঘুরপাক খেয়ে ছেলেকে আরাম করে এনেছিলেন–সেই ঐতিহাসিক চিকিৎসা পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখলে কেমন হয়? অসুখ সারাবার এইটেই তো সবচেয়ে সহজ ও শ্রেষ্ঠ উপায়, তার মনে হতে থাকে। এক্ষুনি– আজ রাত্রেই বা যে কোনো সময়ে দাদু খানিকক্ষণের জন্যে একটু চোখ বুজোলেই এই চিকিৎসা শুরু করে দিতে পারে–
কিন্তু দাদু যে চোখই বোজয় না ছাই। এক মিনিটের জন্যেও না।
তখন মরীয়া হয়ে আর কোনো উপায় না দেখে সে সজাগ দাদামশায়ের চারদিকেই প্রদক্ষিণ লাগিয়ে দেয়, কিন্তু দাদুর চোখও ঘুরতে থাকে তার সাথে সাথে।
এই। এই। ওকি হচ্ছে? ঘুরণি লেগে পড়ে যাবি যে-আমার ঘাড়েই পড়বি ঘুরে থাম থাম।
বাধা পেয়ে সে বসে পড়ে লজ্জিত হয়ে–থামের মতই বসে যায়। ঘুরপাকের রহস্য দাদুকে জানাবার তার আর উৎসাহ হয় না। কে জানে, কি ভাববে দাদু?
আচ্ছা, সেই রেলিং চিকিৎসাটা কেমন? হঠাৎ তার মনে পড়ে এখন। এক গভীর রাত্রে দাদুর জন্যে ডাক্তার ডাকতে বেরিয়ে বেরসিক এক কুকুরের পাল্লায় পড়ে হন্তদন্ত হয়ে পার্ক ভেদ করে যাবার মুখে রেলিংয়ের ফাঁকে আটকে গেছল সে-না পারে রেলিংকে বাড়াতে, না পারে নিজেকে ছাড়াতে। কিন্তু সেই অবস্থায় সটান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই কি তোফা ঘুমটাই না দিয়েছিলো সে। তেমন ঘুম তার আর কোনদিনই হয়নি। কখন কোন ফাঁকে যে ভোর হয়েছে, টেরই পায়নি টুসি, কিন্তু–
হতাশভাবে যে ঘাড় নাড়ে। নাঃ, এ-চিকিৎসায় রাজি করানো যাবে না দাদুকে। দাঁড়াবার জন্যে ততটা নয়, কেন না, বলতে গেলে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই আমরা ঘুমুই, যদিও সে হচ্ছে পৃথিবীর সঙ্গে সমান্তরালভাবে দাঁড়ানো, কিন্তু টুসি ভেবে দেখে, রেলিং-এর কবলে ঐভাবে আটকে থাকাটা একবারেই পছন্দ করবেন না দাদামশাই। ওর নিজেরই তো পছন্দ হয়নি প্রথমটায়।
তবে? আর কি কোন উপায় নেই? ভয়ানকভাবে ভাবতে থাকে টুসি। ডাক্তারেরা হাল ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু সে তো ছাড়তে পারে না যেহেতু দাদুর যা হাল, তাতে হাল ছেড়ে দেওয়া মানে– দাদুকেই ছেড়ে দেওয়া। দাদুকে ছাড়ার কথা মনে হলেই দেদার কান্না পরতে থাকে।
