মাথটা টনটন করেছ, দাঁত কনকন করছে, গা শিরশির করছে, তার ওপর পেট কামড়াচ্ছে আবার। জানালেন গিন্নি।
বটে? বলে রাম ডাক্তার মুখ ভার করে কী যেন ভাবলেন খানিক, তারপরে হর্ষবর্ধনকে টেনে নিয়ে বাইরে এলেন।
কেস খুব কঠিন মনে হচ্ছে আমার। গম্ভীর মুখ করে বললেন রাম ডাক্তার।
বউ আমার বাঁচাবে তো?
না না, ভয়ের কোনো কারণ নেই। এক্ষেত্রে মারাত্মক কিছু ঘটনার আশঙ্কা করিনে। তবে এসব রোগী সাধারণতঃ দশজন রোগীর ন জনাই মারা যায়। একজন মাত্র বাঁচে কেবল।
তাহলে? হর্ষবর্ধনের আতঙ্ক এবার বেড়ে আরো যেন দশগুণ বেড়ে যায়।
অ্যাঁ, বলেন কি মশাই? তবে তো বউদির বাঁচানোর আর কোনই আশা নাই। গোবরা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে। বলে কাঁদতে থাকে।
ইনি বাঁচবেন। ভরসা দেন ডাক্তারবাবু ও এর আগে এই রোগে ন জন আমার হাতে মারা গেছে। ইনিই দশম। এঁকে মারে কে!..যাক আপনারা আমায় রুগীকে দেখতে দিন তো দয় করে এবার। ভাল করে পরীক্ষা করে দেখি আগে, বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করুন আপনারা। রুগীর ঘরে আসবেন না যেন এখন। বলে আমাদের ভাগিয়ে দিয়ে তিনি ভেতরে রইলেন।
আমরা তিনজন পাশের ঘরে এসে বসলাম। হর্ষবর্ধনের মুক ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আর গোবরার মুখ শুকিয়ে হয়েছে ঠিক নারকেলের ছোবড়ার মতই।
মাথা টনটন, দাঁত কনকন, পেট চনচন–শক্ত অসুখ বই কি। আমি বলি। আবহাওয়ার গুমোটটা কাটাবার জন্যই একটা কথা বলি আমি মোটের ওপর সেই গুমোটের ওপর। এর একটা হলেই রক্ষে নেই একসঙ্গে তিনটে।
ব্যামোটা বউদির শিরা উপশিরায় ছড়িয়ে পড়েছে দাদা। গোবরা মন্তব্য করে : সারা গা শির শির করছে বলল না বৌদি?
শীরঃপীড়াই হয়েছে তো। আমিও একটু ডাক্তারি বিদ্যা ফলাই। মাতা টনটন করছে বললেন না?
রাম ডাক্তার দরজার গোড়ায় দাঁড়ালেন এসে উকো দিতে পারেন একটা আমায়? নিদেন একটা ছেনি?
হর্ষবর্ধন একটা উকো এনে দিলেন। ছেনিও।
উকো দিয়ে কি করবে দাদা? বউদির মাথায় উকুন হয়েছে নাকি? গোবরা শুধোয়ঃ উকো ঘষে ঘষে উকুনগুলো মারবে বলে বোধ হচ্ছে।
হতে পারে। আমার সায় তার কথায় ও তারাই হয়ত মাথায় কামড়াচ্ছে সেইজন্যই এই শিরঃপীড়াটা হয়েছে বোধ হয়।
হর্ষবর্ধন চুপ করে বসে রইলেন মাথায় হাত দিয়ে।
কিম্বা দাঁতের জন্যেও লাগতে পারে উকো। আমার পুনরুক্তি ও দাঁতে কেরিজ হয়ে থাকলে তাতেও দাঁতের যন্ত্রণা হয়। উকো দিয়ে ঘষেই সেই কেরিজ তুলবেন হয়ত উনি। দাঁত নেহাত ফ্যালনা জিনিস না মশাই। দাঁত ফেলবার পর তবেই দাঁতের মর্যাদা বুঝতে পারে মানুষ। খারাপ দাঁত থেকে হাজার ব্যাধি আসে। মাথা ব্যাথা, পেট ব্যথা, বকের ব্যামো, হজমের গোলমাল, এমনকি বাতের দোষও আসতে পারে ঐ দাঁতের দোষ থেকে।
রাম ডাক্তার আবার এসে উঁকি মারলেন দরজায়।
হাতুড়ি কিম্বা বাটালি জাতীয় কিছু আছে আপনাদের কাছে?
হর্ষবর্ধন হাতুড়ি এনে ডাক্তারের হাতে তুলে দেন।
হাতুড়ি নিয়ে কি করবে দাদা? আঁতকে ওঠে গোবরাঃ দাঁতের গোড়ায় ঠুকবে নাকি গো? দাঁতের ব্যথা সারতে দাঁতগুলোই সব না তুলে না ফ্যালে বউদির?
কি জানি ভাই? দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেন দাদা?
লোকে রাম ডাক্তারকে কেন হাতুড়ে বলে থাকে কে জানে।
তার মানে তো পাওয়া যাচ্ছে হাতে হাতেই গোবরা হাতুড়ির সঙ্গে হাতুড়ের একটা যোগসূত্র স্থাপন করতে চায়।
দাঁত না হয়ে মাথাতেও পিটতে পারে হাতুড়ি…বাধা দিয়ে আমি বলি ও শকট্রিটমেন্ট বলে একটা জিনিস আছে না?
দাদার শক যেমন। আপনার মতন হাতুড়ে লেখকের পরামর্শ শুনে হাতুড়ে ডাক্তার এনে নিজের শখ মেটান উনি এবার। গোবরা আমার কথার ওপর কথা কয় : বউদির মধুর হাসি আর দেখতে হচ্ছে না দাদাকে এ জন্মে নয়। হায় হায়, এই ফোকলা বউদি ছিল আমার বরাতে শেষটায় কি করব তার। সে হায় হায় করতে থাকে।
মাথায় হাতুড়ি ঠুকলে শিরঃপীড়া সারে বলে শুনেছি। তবুও আমি ভরসা দিয়ে বলতে যাই।
মাথা না থাকলে তো মাথা ব্যথাই থাকে না মশাই। হর্ষবর্ধন বলেন : শকট্রিটমেন্ট মানে হচ্ছে হঠাৎ একটা ঘা মেরে শক দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে রোগ সারিয়ে দেওয়া। শক্ত রোগ যা তা নাকি।
তাতেই সেরে যায়। আমার বক্তব্য রাখি : রাম ডাক্তারের কোন কসুর নেই মশাই। যথাশক্তি করেছে বেচারা। তা যদি হয় তো আমার বলার কিছু নেই। হাল ছেড়ে দেন হর্ষবর্ধন। যথাসাধ্য করতে দিন ডাক্তারকে বাধা দেবেন না আপনারা। আমার কথাটর শেষে পুনশ্চ যোগ করি।
একটা করাত দিতে পারেন আমায়? ছোটখাট হলেও চলবে। দরজার সামনে আবার রাম ডাক্তারের আবির্ভার। হর্ষবর্ধনের কাঠ চেরাই করাতী কারখানায় করাতের অভাব ছিল না। এনে দিলেন একখানা। তারপরে মাথায় হাত দিয়ে বসলেন তিনি? কি সর্বনাশ হবে কে জানে।
বউদির পেট কেটে ছেলেটাকে বার করবে বোধ হচ্ছে। গোবর্ধন পরিস্কার বলে?
বউদি কাটা পড়বে আর ছেলেটা মারা পড়বে, ডাক্তারের করাতে আমাদের বরাতে এই ছিল, যা বুঝতে পারছি।
বেঁচে যাবে আপনার বউ। আমি তাকে ভরসা দিই ও বড়ো বড়ো যাদুকর দেখেননি, করাত দিয়ে একটা মেয়েকে দু আধখানা করে কেটে ফ্যালে, তারপর সঙ্গে সঙ্গে জুড়ে দেয় আবার দ্যাখেননি কি? কেন, আমাদের পি সি সরকারের ম্যাজিকেই তো তা দেখা যায়। তেমনি ভেলকি দেখাতে পারেন বড় বড় ডাক্তাররাও তারাও কেটে জোড়া দিতে পারেন।
